আজ বিশ্ব দর্শন দিবস। জ্ঞানের মূল ও ধ্রুপদী বিষয় হিসেবে দর্শনচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান বিশ্বের প্রাসঙ্গিকতার উপলব্ধি থেকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো ২০০২ সালে বিশ্ব দর্শন দিবসের ঘোষণা দেয়। এরপর ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর নভেম্বরের তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিভিন্ন দেশে বিশ্ব দর্শন দিবস পালন হয়ে আসছে। এ বছর বিশ্ব দর্শন দিবসের থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ভবিষ্যতের মানুষ। দিবসটি পালন উপলক্ষে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক আদ্রে আজুলে বলেছেন, শব্দ কখনো কখনো বিশ্বের জটিলতা এবং এর উত্থানকে আঁকড়ে ধরতে পারে না। তাই মহান দার্শনিক ইবনে খালদুনের ভাষ্যে বলতে হয়, চিন্তার প্রবাহ ছাড়া ভাষা শুধু একটি অনুর্বর ভূমি হিসেবে গণ্য হয়। এর প্রতিষেধক হিসেবে ইউনেস্কো প্রতিনিয়ত দর্শন নিয়ে কাজ করছে। দর্শন বৈশ্বিক চিন্তার ভাষা হিসেবে গণ্য হয়, সব সংকটের প্রভাব চিহ্নিত করে এবং মানবতার সর্বজনীন পথ উন্মুক্ত করতে ইউনেস্কো এটিকে সেবায় পরিণত করেছে।

ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটের ভাষ্যমতে, পৃথিবীর সর্বত্র যারা দর্শন নিয়ে চিন্তা করে এ দিবস তাদের জন্য। ইউনেস্কো দিবসটি পালনে নেতৃত্ব দেয়, কিন্তু দিবসটিকে নিজের বলে দাবি করে না।

মূলত দর্শনের সৌন্দর্য এটাই, দর্শন মুক্তমনা সমাজকে সমর্থন করে। যেখানে সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। কেউ কারো মতের বিরুদ্ধে যুক্তিতে পরাজিত হলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না, বরং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে মনুষ্যত্বকে মুল্যায়ন করবে, এটিই দর্শনের বৈশিষ্ট্য। এমন জ্ঞানভিত্তিক সর্বজনীন সমাজ গঠনের দায় কিন্তু মানুষেরই। তাই তো এবারের বিশ্ব দর্শন দিবসে ভবিষ্যতের মানুষকে মূল উপজীব্য বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত সংস্থাটির হেড কোয়ার্টারে দিবসটি পালন উপলক্ষে ‘প্রযুক্তি কি মানুষকে সেকেলে করে তুলছে?’ শিরোনামে ১৬ নভেম্বর ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মূলত ভবিষ্যতের মানুষ থিমকে উপজীব্য করে বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বর্তমানে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উত্কর্ষ বিরাজ করছে। এরই মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মানুষের শ্রমশক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। যার ফলে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন অদূর ভবিষ্যতে কীভাবে কোনো মানুষ ছাড়াই শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে একটি অফিসকে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে অগ্রসর হতে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, চীনের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য চায়না সায়েন্স ডেইলি’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বেশির ভাগ সংবাদ তৈরির কাজ করছে।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য যেমন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, তেমনি মারাত্মক হুমকিও হয়ে উঠতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বহুদিন আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গুগলের সাবেক চেয়ারম্যান এরিক স্মিড সম্প্রতি সে কথাগুলোই আবার নতুন করে শুনিয়েছেন। গুগলের মূল প্রতিষ্ঠানের নাম অ্যালফাবেট। এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে এরিক স্মিড আশাবাদী মানুষ। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, এর ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। এটি একদিকে যেমন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কার করে লাখ লাখ জীবন বাঁচাতে পারে তেমনি এটি মন্দ লোকের খপ্পরে গেলে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তবে অনেকে বলেন, রোবট বিশ্ব দখল করতে চলেছে। কিন্তু তা মানুষকে শিগগিরই ছাড়িয়ে যেতে পারছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি সত্যিই ভয়ংকর হয়ে ওঠে তবে তার আগেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। এর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতেই রাখতে হবে।

এটিই মোদ্দাকথা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষেরই আবিষ্কার এবং এটি নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্বও মানুষের। কারণ যন্ত্রকে নিজের মতো করে চলতে দিলে সে অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে। আর মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের পার্থক্য তো এটিই। মানুষের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় চিন্তা করার সক্ষমতা আছে, যন্ত্রের তো সেটি নেই। তাই যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতেই রাখতে হয়। এজন্যই বিশ্ব দর্শন দিবসের উপজীব্য বিষয় হিসেবে ভবিষ্যতের মানুষকে নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে রোবট ২০৫০ সালের মধ্যে সব মানবিক কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পারবে রোবট। শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে নানা ব্যবসায়িক কাজে এর ব্যবহার বাড়ছে। এর বাইরে বেশি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হচ্ছে প্রতিরক্ষা। বিভিন্ন দেশ তাদের প্রতিরক্ষাকাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছে। আমরা আগেই আধা স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের (চালকবিহীন বিমান) ব্যবহার দেখেছি। এখন এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করে তোলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার নাম সবার আগে আসবে।

উদ্বেগের জায়গাটা এখানেই, গুগলের সাবেক চেয়ারম্যান স্মিড বলেছেন, প্রতিরক্ষার পাশাপাশি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানোর ঘটনা ঘটছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, যা অনেক বেশি উদ্বেগের। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাছ থেকে শিখতে পারে। ভাবুন, এটি যদি ভুল কিছু শেখে এবং ভুল সুপারিশ করে তবে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বে বড় দুশ্চিন্তার নাম ডিপফেক। এতে কম্পিউটারে কারসাজি করা ছবিতে এক ব্যক্তির সাদৃশ্য অন্যের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের জন্য ব্যবহূত হয়। আশঙ্কার কথা, ছবি বা ভিডিওকে বিকৃত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিখুঁতভাবে তৈরি করে হুবহু প্রকৃত ছবি বা ভিডিওর মতো বলে প্রচার করা হচ্ছে। ডিপফেক তৈরির টুল অনলাইনে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে এটি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। স্মিড বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ভিডিও এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যা বিশ্বাসযোগ্য করে ফলাও হচ্ছে। নকল ভিডিও তৈরি করার পর তা যদি মানুষের সামনে তুলে আনা হয়, এমনকি তা কৃত্রিম বলে প্রচার করা হয় তার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ তা বিশ্বাস করে বসে।

বিশ্বজুড়ে এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত ‘ঘাতক রোবট’ নিয়ে তাই উত্কণ্ঠা বেড়েই চলেছে। কারণ রোবট স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। তাই রোবট তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিনৈতিকতা নির্ধারণ করা নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। এ আলোচনা জাতিসংঘ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক একটি চুক্তির কথাবার্তাও হচ্ছে। তবে ঘাতক রোবট নিয়ে উত্কণ্ঠা বাড়লেও রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ এ ধরনের রোবট নির্মাতা দেশগুলো এমন চুক্তি নিয়ে আলোচনার বিরোধিতা করছে।

বর্তমানে ড্রোনের মতো আধা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলো নানা কাজে ব্যবহার হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর ব্যবহার এরই মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। তবে ড্রোনের মতো যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে থাকে। সে তুলনায় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে (ঘাতক রোবট) মানুষের হাতে কোনো ‘কিল সুইচ’ বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে না। এর পরিবর্তে যন্ত্রটি নিজেই তার সেন্সর, সফটওয়্যার ও কারিগরি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এক্ষেত্রে তাই মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ২০২১ সালের মার্চে জাতিসংঘের একটি প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে এ শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি হওয়ার বিষয় সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম স্বয়ংক্রিয় ড্রোন হামলার ঘটনা লিবিয়ায় ঘটেছিল।

গত বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস কনভেনশন অন সারটেইন কনভেনশনাল উইপনস (সিসিডব্লিউ) সম্মেলনে ১২৫টি দেশকে নতুন নীতিমালা তৈরিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তবে সম্মেলনে লেথাল অটোনোমাস উইপন সিস্টেমস (এলএডব্লিউএস) তৈরি ও এর ব্যবহার ঠেকানো নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। জেনেভায় পাঁচদিনের সম্মেলনে উপস্থিত এলএডব্লিউএসের নির্মাতা দেশগুলো অনেক শর্ত দিয়ে তাদের অসম্মতি জানিয়েছে। বিশেষ করে যন্ত্রচালিত অস্ত্রের ক্ষেত্রে তারা এ অসম্মতি জানায়। রাশিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এলএডব্লিউএস চুক্তির বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি এসেছে। তবে ৬৮টি রাষ্ট্র জাতিসংঘে এ বিষয়ে আইন করার আহ্বান জানিয়েছে।

বস্তুত এমন একসময়ে বিশ্ব দর্শন দিবস পালন হচ্ছে যখন রাশিয়া ইউক্রেনে ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে আমরা কি ক্রমে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি? পৃথিবীতে যদি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর মনুষ্যত্বের বহিঃপ্রকাশই না থাকে, তাহলে কী লাভ মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে? আর দর্শন প্রশ্নের মাধ্যমে এ বিষয়ই মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে।

তাই প্রতি বছর বিশ্ব দর্শন দিবস মানুষের চিন্তার অবস্থানকে মনে করিয়ে দিতে চায়। কারণ মানুষই সমাজের গোড়াপত্তন করেছে এবং শুধু মানুষই পারবে সমাজের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে। এজন্য মনুষ্যত্বের ধ্যানধারণা এবং পারস্পরিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক মানবসমাজ গঠনে মানবিকতার চর্চা হোক সর্বত্র, এবারের বিশ্ব দর্শন দিবসে আমরা সে প্রত্যাশাই করি।

 

তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক