(গতকালের পর)

২৫ মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানের কী হয়েছে সে সম্পর্কে গোটা পৃথিবীই অবহিত। জনগণের দেয়া রায় অস্বীকার করে জনগণের ওপর, বাংলাদেশের মানুষের ওপর সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে নিপীড়ন চালিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে নিজেই দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন।

জনগণের রায়কে সম্মান জানানো শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাচিত একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে মেনে না নিয়ে পাকিস্তান সরকার একটি সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালিয়েছে যার নজির এ কালে কোথাও দেখা যায়নি। শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিচারের প্রহসন মানবাধিকারের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন, যা সমগ্র পৃথিবীর কাছে নিন্দিত হওয়ার মতো।

শেখ মুজিবুর রহমান এবং গৃহে বা কারাগারে অন্তরীণ তার পরিবারের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে আমরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছি। আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা বিভিন্ন বিদেশী সরকারকে জানিয়েছি এবং পাকিস্তান সরকারের ওপর তাদের প্রভাব প্রয়োগ করার অনুরোধ জানিয়েছি। যদি শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা তার পরিবারের সদস্য বা সহকর্মী জীবনের ওপর কোনো বিপদ নেমে আসে বাংলাদেশের পরিস্থিতির অপরিমেয় অবনতি ঘটবে, যা পরিণতির জন্য কেবল পাকিস্তানের বর্তমান শাসকরাই এককভাবে দায়ী হবেন। আমাদের লোকসভার ৫০০ সদস্যের উদ্বেগ আমরা তাদের জানিয়েছি। আমরা মানুষের বিবেকের কাছে আপিল জানাই যাতে তারা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে স্বর উঁচিয়ে কথা বলেন। আমরা পাকিস্তান সরকারের কার্যক্রমে নিন্দা জ্ঞাপন করছি এবং যে ভয়ংকর পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের সতর্ক বার্তা জানিয়েছি।

‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অপরাধে শেখ মুজিবুর রহমানের কোর্ট মার্শাল শুরু হয়েছে’—১১ আগস্ট, ১৯৭১ ভারতীয় লোকসভায় ইয়াহিয়ার হুমকি নিয়ে পুনরায় আলোচনায় পররাষ্ট্র দপ্তরের উপমন্ত্রী সর্দার শরণ সিংয়ের বক্তব্যটিই আবার পেশ করেন। ভারতীয় লোকসভার বাজেট অধিবেশন চলছিল। তারিখ ২০ জুলাই, ১৯৭১। প্রতিরক্ষামন্ত্রী সর্দার শরণ সিং দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। তার বক্তৃতার শেষ অংশটুকুর একটি উপ-শিরোনাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’—প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় তা ভাষান্তরিত করে উপস্থাপন করা হলো শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, আমি সে সম্পর্কে বলতে চাই। খবরে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের একটি প্রস্তাব রয়েছে। কয়েকটি খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি তাকে বিচারে সোপর্দ করা হয়, তাহলে এটা হবে একটি সামরিক আদালত, সেখানে তিনি একজন আইনজীবী রাখতে পারবেন, তবে বিদেশী কোনো আইনজীবী নয়—সবকিছুতে এটাই স্পষ্ট, যে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা পরিচিত তাতে যেকোনো প্রমাণের প্রয়োজন হয়, এখানে তার দরকার হবে না। পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থায় এসবের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের যেকোনো বিচারই আসলে প্রহসন। এটি আইনানুগ কোনো কাজ নয়, গোপনে হোক আর প্রকাশ্যেই হোক সময় নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে এটা করা হবে না।

এটি অবশ্যই একটি রাজনৈতিক বিষয়, সামরিক রাজত্বে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর যে সহিংসতা চালানো হয়েছে এটা তারই ধারাবাহিক একটি অংশ। তাদের সহিংসতার ধারাটি উল্টে ফেলতে হবে, সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং সমাধান চাইলে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। আমরা যখন তাদের সামরিক পদ্ধতি রহিত করার কথা বলেছি, আমরা বাংলাদেশের জনগণ ও শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গ্রহণযোগ্য। এখন শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগই নেয়া হোক না কেন তা হবে ২৮ জুন, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যা বলেছেন এটা তারই ফলোআপ অ্যাকশন। আর এটাই সম্পূর্ণ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ করে দেবে।

এ পথে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের যেকোনো অভিযানই হবে উন্মত্তের অভিযান। তাতে মুক্তিযোদ্ধারা আরো মরিয়া হয়ে উঠবেন এবং তাদের লক্ষ্য তাদের জনগণের জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টিতে আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠবেন। তাই বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের যেকোনো কার্যক্রম সম্পর্কে আমরা পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিতে চাই। এই সহিংসতা যেকোনোভাবেই হোক চলতে থাকলে এবং নিরস্ত্র জনতার ওপর তাদের উন্মত্ততার নীতি অব্যাহত থাকলে মুক্তিযোদ্ধারা আরো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ইয়াহিয়ার শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেবে। ইয়াহিয়া এখন অজুহাত খুঁজছেন কোনো এলাকা সেনাবাহিনীর দখল থেকে মুক্ত হলে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করে বসবেন। এখন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানের যত চাপ তার ওপর পড়ছে সেখান থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি সরাতে তিনি বিচারের আয়োজন করেছেন।

বিভিন্ন সময় আমরা আমাদের অভিব্যক্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি। আমাদের পার্লামেন্ট সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা (বাংলাদেশের জনগণের প্রতি) সহানুভূতি ও সমর্থন ব্যক্ত করেছি এবং এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার জন্য যা কিছু করা সম্ভব আমরা তা-ই করে যাচ্ছি।

আমি আপনাদের (লোকসভার সদস্যবৃন্দ) আশ্বস্ত করতে চাই, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং বিদেশে অবস্থিত আমাদের মিশনগুলো আমাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যেসব বিষয় জড়িত সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত। আমাদের ভুললে চলবে না, এ বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—আমাদের অস্তিত্ব ও আমাদের টিকে থাকার জন্য।

কাজেই আমাদের বৃহৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সুবিবেচনা প্রয়োগ করতে হবে, অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগোতে হবে—বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে, আওয়ামী লীগকে বড় ধরনের সমর্থন দিতে হবে।

যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসন ও সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হচ্ছে—শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। কেবল বিবৃতি দিয়ে তাদের ফেরানো যাবে না, তাদের মনে বিশ্বাস থাকতে হবে, তারা তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে, চুলায় আগুন দিতে পারবে। ইয়াহিয়া খানের এ বিবৃতির প্রভাব কী? তার বিবৃতির পর আরো ৩৫ লাখ শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে এসেছে—এই হচ্ছে ইয়াহিয়ার বিবৃতির ফল। বিবৃতি কিংবা জাতিসংঘের আশ্বাস শুনিয়ে তাদের মনে আস্থা সৃষ্টি করা যাবে না। কেমন অদ্ভুত ব্যাপার—তারা মনে করে কেবল ক্যাম্প বানালেই শরণার্থী সেখানে ফিরে যেতে প্রলুব্ধ হবে—তা কখনো ঘটার নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না মূল সংকটের সমাধান হচ্ছে তারা ফিরে যাবে না। মূল সংকট হচ্ছে লড়াই—একদিকে জনগণ ও গণতান্ত্রিক শক্তি অন্যদিকে সামরিক শাসক ও অন্যসব (জনবিরোধী) বিষয়। এ কারণেই আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এ লক্ষ্য আমাদের বাস্তবায়ন করতেই হবে।

সর্দার শরণ সিংয়ের কথার সারাংশ হচ্ছে, মুজিবকে মুক্তি দিতে হবে এবং একমাত্র তিনিই সংকটের সমাধান করতে পারবেন; তিনি জনগণের নির্বাচিত নেতা, তার ওপরই জনগণের আস্থা।

যুদ্ধ ও বিজয়: ১৬ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতিকে শোনালেন: আগামী ১০ দিনের মধ্যে আমি হয়তো রণাঙ্গনে থাকব। ঘোষণার নবম দিন পাকিস্তান বিমান বাহিনী ভারতের অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, আম্বালা, আগ্রাসহ আরো কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে যুগপৎ আক্রমণ চালায়। রাতে ভারতীয় বিমান বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালায় পাকিস্তানের শিয়ালকোট, সারগোদা, মিয়ানওয়ালি, চান্দোরি রিসালওয়ালাসহ আরো কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে।

৪ ডিসেম্বর ভারত ও পকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ৭ ডিসেম্বর যশোরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। সিলেট ও মৌলভীবাজার মুক্ত হয়। একই দিন ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

ইন্দিরার মহাকর্মকৌশল: এয়ার মার্শাল কপিল কাকের রচনা থেকে অনূদিত:

ভারতীয় কর্মকৌশল সম্ভবত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে রচিত।

প্রথমত, পশ্চিম পাকিস্তানের ভ্রান্ত বিশ্বাস, চীনের সহায়তায় পূর্বাংশের যুদ্ধে তারা জিতে যাবে। নভেম্বরের গোড়ার দিকে চীনফেরত ভুট্টো বলেছিলেন, তার সফরকালে চীন তাকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পাকিস্তানের হয়ে চীন লড়বে।

২৮ জুলাই, ১৯৭১ নিক্সন ও কিসিঞ্জারের সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড বলেছেন, ‘ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব চীনকে টেনে আনবে। প্রকৃতপক্ষে যা আমেরিকা ও পাকিস্তানের অজানা তা হচ্ছে এপ্রিলের পর থেকে নভেম্বরে ভুট্টোর সফরের মাঝখানে চীনও তার বিদেশ নীতিতে পরিবর্তন এনে পাকিস্তানের জন্য কেবল সমর্থন ব্যক্ত করেছে। কারণ চীনের মূল্যায়নে পাকিস্তানের কাঁধ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বোঝা সরে যাওয়া এবং ভারতের শরণার্থীর বোঝা নামানোর জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টিই ছিল অনিবার্য।

দ্বিতীয়ত, হিমালয়ের কাছাকাছি রাষ্ট্র নেপাল, ভুটান, সিকিমের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ, এ অঞ্চল ভারতের জন্য কৌশলগত বাফার জোনের কাজ করতে থাকে (পরে সিকিমকে ভারত নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়)।

তৃতীয়ত, বিষয়টি সম্পূর্ণ সামরিক—হিমালয়ের গিরিখাতে প্রবেশযোগ্যতা। বরফ আচ্ছাদিত এ গিরিখাত সম্পর্কে আমেরিকা ভালো অবহিত নয়। বছরের কিছু সময় আবহাওয়ার কারণে এ পথ তুষাররুদ্ধ ও অগম্য হয়ে ওঠে।

নৈকট্য ও অভিজ্ঞতার কারণে এ তিনটি বিষয়ে ভারতের মূল্যায়ন ছিল সঠিক।

২৫ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের সাড়া পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্পষ্ট, ভারত একই সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইন্দিরা গান্ধী ও তার মুখ্য উপদেষ্টারা একমত, ভারতের জাতীয় স্বার্থ যেখানে হুমকির মুখে সেখানে যুদ্ধের আশ্রয় নেয়া দরকার হতে পারে।

কে সুব্রামানিয়ামের যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য মনে হয়, এক কোটি শরণার্থী লালন-পালনের যে ব্যয়, যুদ্ধের ব্যয় তার চেয়ে কম। ভারত এ হিসাবটি সনাতন অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ দিয়ে করেনি, সমকালীন পৃথিবীর অনেক যুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কাহিনীও সামনে নিয়ে এসেছে।

তিন বাহিনীর কাজে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে অবদান রেখেছে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় উত্তর আফ্রিকার সশস্ত্র বাহিনী যে গতিতে এগিয়েছে তারপর এই প্রথম সবচেয়ে দ্রুততার সঙ্গে কোনো সেনাবাহিনী এগিয়ে গেছে। ১৯৭১-এর যুদ্ধে পশ্চিমে ভারতের লড়াইটা ছিল প্রতিরক্ষামূলক আর পূর্বে চালানো হয়েছে সৃজনশীল কৌশলগত আক্রমণ। ভারতীয় বিমান বাহিনী দুদিনেই পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ দখল করে নিল। আর এতেই পাঁচ ডিভিশন শক্তিশালী ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও ক্যান্টনমেন্ট পাশ কাটিয়ে ফেরি-সেতু নিরাপদে পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল।

স্যাম মানেকশর কথা: ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ ১৯৬৯-৭৩ ভারতের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ ছিলেন। জ্যেষ্ঠতম অফিসার হিসেবেই তিনি সেনাপ্রধান হন। ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে পাঁচ বছরের বড় স্যাম মানেকশ তার সঙ্গে চমত্কার একটি অপ্রথাগত সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ১৯৭১এর যুদ্ধজয় তাকে রাষ্ট্রীয় বীরে পরিণত করে।

১৯৭১-এর এপ্রিলে ইন্দিরা গান্ধী সেনাপ্রধানকে ডেকে বললেন, ‘আমি চাই আপনি পাকিস্তানে প্রবেশ করুন।’

আমি বললাম, ‘তার মানে তো যুদ্ধ।’

তিনি বললেন, ‘একে যদি যুদ্ধ বলা হয় আমি কিছু মনে করব না।’

আমি বললাম, আপনি কী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত? আমি অবশ্যই তৈরি নই। এখন এপ্রিলের শেষ প্রান্ত। হিমালয় পাস এখন খুলে যাবে, চীনারা চাইলে আক্রমণ করতে পারে। মানেকশ প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আবহাওয়ার কারণে আমি সেনাদের উপযুক্ত সমর্থন জোগাতে পারব না। ...আমার কাজ আপনাকে সত্যটা বলা, আমার কাজ যুদ্ধ করে জেতা। আমাকে তো সত্যটাই বলতে হবে।

যুদ্ধের জন্য নভেম্বর কি ডিসেম্বর বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তটি মানেকশরই।

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি: ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী

হিজ এক্সিলেন্সি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি ৪ ডিসেম্বর যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তা আমাকে এবং ভারত সরকারে আমার সহকর্মীদের বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। বার্তাটি পাওয়ার পর আপনারা যেভাবে আত্মনিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন, সেই দেশকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করে।

আমি হূষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিবৃতির অনুলিপি সংযুক্ত করছি।

বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই, এ শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরো শক্তিশালী করবে এবং দুদেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যা হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুদেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হব।

ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি।

আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন।

আপনার একান্ত

ইন্দিরা গান্ধী

এই চিঠির সঙ্গে ভারতীয় লোকসভায় প্রদত্ত বিবৃতিটিও সংযুক্ত করে দেন।

৮ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এসএইচএফজে মানেকশ পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। ১২ ডিসেম্বর আক্রমণ জোরদার করতে ঢাকায় ভারতীয় প্যারাট্রুপার নামানো হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে নিরপেক্ষ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মালেক ও তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা পদত্যাগ করেন। ১০ ডিসেম্বর সকাল ৯টা আত্মসমর্পণের শেষ সময়সীমা বেঁধে দিলেও তা বিকাল পর্যন্ত গড়ায়।

১৬ ডিসেম্বর ৪টা ৩১ মিনিটে জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেন। ভূলুণ্ঠিত হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অহঙ্কার; অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। [শেষ]

 

ড. এমএ মোমেন: কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা