বাঙালি একটি লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ, নারী-পুরুষের বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য। এ জাতির দৈনন্দিন জীবন-জীবিকা যেমন সংগ্রামের, তেমনি তার পরিচয় নির্ণয় করাটাও বোধ করি একটু জটিল বটে। কোন কোন বৈশিষ্ট্য নিয়ে একজন আদমসন্তান নিজেকে বাঙালি বলে জাহির করতে পারে, এমন প্রশ্ন কোনো দিন যে মাথায় আসেনি তা ঠিক নয়, তবে এ রকম বিষয়ে একটি রচনা লিখব, তেমনটি কখনো ভাবিনি। আজ হঠাৎ করে লিখতে বসার কারণ বন্ধু মাহবুবের উৎসাহ। বাঙালির পরিচয় নিয়ে একটি নয়া লেখা তৈরি করতে সে শুধু প্রলুব্ধই করেনি, আমাকে কিছু বিষয়ভিত্তিক সূত্রও ধরিয়ে দিয়েছে। এ আলোচনায় তার কতটুকু তুলে আনতে পারব জানি না এবং আমার বক্তব্যের সঙ্গে তার ভাবনার আদৌ কোনো মিল হবে কি হবে না, সেই ঝুঁকি নিয়েই আমি লিখতে শুরু করেছি।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার মতো বাঙালিকে সংজ্ঞায়িত না করেই বলছি—এ দেশে বসবাসকারী সিংহভাগ মানুষই নিজেদের বাঙালি বলে মনে করে। তবে এ ভূখণ্ডে আরো অনেক ছোট ছোট অবাঙালি জাতিসত্তা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও থাকে। তারাও সমানভাবে এ দেশের নাগরিক, কিন্তু তারা বাঙালির সংজ্ঞায় পড়ে না। তাই দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই বাংলাদেশী, বাঙালি নই। তার মধ্যে অবশ্য জাতিতে কেউ বাঙালি, কেউ চাকমা, কেউ সাঁওতাল, কেউ খাসিয়া ইত্যাদি। এভাবে আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক জীবনে ‘বাঙালি’ ও ‘বাংলাদেশী’ শব্দ দুটোর মধ্যে একটা বোঝাপড়া ও সমঝোতা তৈরি করে নিয়েছি। অন্যভাবে বলতে গেলে, জনগণের বড় অংশ হিসেবে আমরা একসঙ্গে বাঙালি এবং বাংলাদেশীও বটে। ঠিক একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিরাও একদিকে বাঙালি, অন্যদিকে ভারতীয়। অবশ্য ওপারের বাঙালি এবং এপারের বাঙালির মধ্যে ‘জল-পানি’ ছাড়াও আরো ফারাক আছে।

তবে নোবেল বিজয়ী দ্বিতীয় বাঙালি বাঙালির মাঝে কোনো ভেদাভেদ মানতে নারাজ। ‘বাঙালি হওয়া’ কাকে বলে, একথা বোঝাতে গিয়ে বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ বিতর্কে সম্প্রতি এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। ২০১৯ সালে কলকাতায় অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসদনে অতিসচেতনভাবে তিনি বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৪২৬ সনের তাত্পর্য কী—এ প্রশ্ন তুলে এনেছেন। তারপর নিজের সওয়ালের জওয়াব নিজেই দিয়েছেন। তার মতে, মুসলমানদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যাওয়ার পর কতগুলো বছর কেটে গেল, বাংলা সন-তারিখ তারই এক হিসাবনামা। এ হিসাবের মাঝে একটি মিশেলও আছে। প্রথম ৯৬৩ বছর গোনা হয়েছিল ইসলামী চান্দ্রমাস অনুসারে, তার পরের সালগুলো হিন্দু সৌরমাস অনুযায়ী। অধ্যাপক সেনের বক্তৃতা শুনতে শুনতে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন শ্রোতা এই বলে স্বগতোক্তি করেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে এ বক্তৃতাটা শোনানো উচিত।’ কারণস্বরূপ অধ্যাপক সেনের ভাষায় সংক্ষেপে বলা যায়, বাঙালি পরিচয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যে ধর্মের ভিত্তিতে এ জাতিকে আলাদা করা যায় না। খ্যাতিমান এ অধ্যাপকের মতে, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাংলায় মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা বেজার হননি, বরং খুশিই হয়েছিলেন। এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছিল এবং বাঘের উৎপাতও কমে গিয়েছিল। তিনি আরো বলেন, যে ঢাকাইয়া ‘মসলিন’ দুনিয়াজোড়া এত তারিফ ও সমাদর হাসিল করল, তাও তৈরি হয়েছিল হিন্দু-মুসলমানের যৌথ প্রয়াসে। একই বক্তৃতায় এসব ইতিবাচক বয়ানের পর অধ্যাপক সেন একটি গুরুগম্ভীর সাবধানবাণীও উচ্চারণ করতে কসুর করেননি। তিনি বলেছেন, একটি সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষের আগে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের আরো অনেক ফিতনা-ফাসাদের পথ পেরোতে হতে পারে। বায়ান্নতে যে বাঙালি ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাথা রচনা করল, সেই বাঙালিই আবার ছেচল্লিশে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্যও দায়ী।

মোটাদাগে বলতে গেলে, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাঙালি-অবাঙালির পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, বিষয়টি আপাত সোজা মনে হলেও আদতে তা আচ্ছা মুশকিলের। এখানে আরো নানান জটিলতা ও কুটিলতা আছে। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে কলেজে পড়তে গিয়ে প্রথমে শুনলাম, ‘আমরা আগে বাঙালি, পরে মুসলমান’। এর বিপরীতে কেউ কেউ আবার বলতেন, ‘না, আমরা আগে মুসলমান, পরে বাঙালি’। হোস্টেলে সহপাঠীদের মাঝে এ রকম তর্ক হরহামেশাই থাকত এবং আমি রীতিমতো তটস্থ থাকতাম—না জানি কখন কোনো নন-সিলেটি বন্ধু বলে বসে, “তোমরা সিলেটিরা আবার ‘বাঙালি’ হলে কবে থেকে? তোমরা আসামি না?।” ভাগ্যিস এমন বিপত্তি কোনো দিন ঘটেনি। যদি কেউ বলেই ফেলত তাহলে আমার উত্তরটাও তৈরি ছিল—আমরা মামলার ‘আসামি’ নই, আবার আসামের ‘অহমিয়া’ও নই, আর হাছন-মুজতবার দেশে জন্মালে বাঙালি হতে বাধাটা কোথায়? কলেজজীবনে আড্ডার আসরে বসে এসব বিতর্ক শুনতে যত মজা পেতাম, তাতে সক্রিয় অংশ নিতে আমার অনীহা ছিল তার চেয়ে বেশি। কারণ আর কিছু নয়, স্রেফ আমার আক্ল ও এলেমের ঘাটতি। আমি জানতাম না এবং বুঝতামও না, এতসব কথার মারপ্যাঁচের মাঝে আদৌ কোনো গভীর মর্তবা আছে কিনা, আর থাকলেই-বা সেটা কী।

কলেজ থেকে আইএ পাস করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হলাম, তখন আমার কাছে বিষয়টির জটিলতা আরো ঘনীভূত হলো। আরেকটি নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হলাম—‘বাঙালি না মুসলমান, সেকথা বড় নয়, বড় কথা—আমরা মানুষ।’ এবার এ সবকিছু নিয়ে আমি রীতিমতো তালগোল পাকিয়ে ফেললাম। তাহলে কি ‘মানবতা’, ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘মুসলমানিত্ব’—এ সবই আলাদা আলাদা সত্তা? এগুলো কি তেল-জলের মতো মিশ খায় না? এ পরিচয়গুলো কি একটার সঙ্গে আরেকটা সাংঘর্ষিক? না, এসব কিছুই না। একসময় আমার ভুল ভাঙল। বুঝলাম ভাষা, ধর্ম ও জাতপাতের কাইজা মানুষের ভাবনাজগতের বেশ গভীরেই প্রোথিত। এর চেয়ে বেশি, এ বিতর্কের গূঢ় অর্থ আমি তখন একেবারেই বুঝতাম না, তবে এখন মনে হয় একটু-আধটু বুঝি। মতলবমতো একেকজন একেকভাবে বাক্যবিন্যাস করে শব্দের ধূম্রজাল সৃষ্টি করছেন মাত্র—উদ্দেশ্য যার যার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল। এতে আখেরে কার ফায়দা কতখানি হয়েছে, আজকের এ আলোচনায় তারও একটা সালতামামি করা সম্ভব, যদি আমার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শেষ অবধি সহি তরিকামতো চালিয়ে নিতে পারি।

প্রথমে দেখা যাক, বাঙালিকে কে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। উইকিপিডিয়া বলছে, বাঙালি একটি সংকর জাতি। আজকের বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তাদের বাস। প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছর আগে আর্য-অনার্য মিশ্রিত প্রাকৃত ভাষা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষা এবং ‘ব্রাহ্মী’ লিপি থেকে ‘সিদ্ধম’ লিপির মাধ্যমে আধুনিক বাংলা লিপির সৃষ্টি। পরে এদের সঙ্গে ‘অস্ট্রিক’ ও ‘নিগ্রিটো’ জাতি এসে মিশেছে। এ মিশেল জাতির নামই বাঙালি জাতি। এটি আমাদের একটি অতিসংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও সরলীকৃত সংজ্ঞা হতে পারে। কিন্তু কী হলে একজন মানুষকে বাঙালি বলে শনাক্ত করা যায়, সে প্রশ্নের কোনো সহি ও পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখানে পাওয়া যায় না।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘বাঙালি কাকে বলি’—এ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ লিখেছেন। এতে দেখা যায়, অধ্যাপক চৌধুরীর মতে, যে বাংলায় কথা বলে, বাংলা ভাষা এস্তেমাল করে, বাঙালির প্রতি সহূদয় সহমর্মিতা দেখায়, তাকে বাঙালি বলা যায়। তবে তিনি এমন উক্তিও করেছেন, বাংলাদেশে পয়দা নিলেই বাঙালি হওয়া যায় না। তার মতে, সে-ই প্রকৃত বাঙালিত্বের দাবিদার, যে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও আচার-আচরণে বাঙালিত্বকে ধারণ করে, বাঙালিত্বকে লালন করে। পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচর্চা ইত্যাদি সবকিছুই সংস্কৃতির অংশ। তবে তিনি এ সবকিছুকে সমানভাবে গুরুত্ব দেন না।  স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তার এই বইয়ে লেখক সংস্কৃতির একটি মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাঙালির পোশাক কী হবে—এ নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই, তিনি বরং চিন্তিত অভাবতাড়িত বাঙালির চিরন্তন বস্ত্র সমস্যার কথা ভেবে। ভাষার কথা বলতে গিয়ে তিনি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘বাংলার রেনেসাঁস’ থেকে একটি চমত্কার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘বিদগ্ধ নাগরিকের মার্জিত ভাষা যেন ভিটামিনবর্জিত ছাঁটা সিদ্ধ চালের ফ্যানগালা ভাত। তার না থাকে স্বাদ, না থাকে পুষ্টি।’

আমি যতটুকু বুঝেছি, ভাষা বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য মোটামুটি নিম্নরূপ। বাঙালির ভাষা বাংলা, কিন্তু এই বাংলারও তো ভিন্ন রূপ আছে। ধনী ও দরিদ্র বাঙালিরা কখনো একই বাংলায় কথা বলে না। ভদ্রলোক বাঙালি সমাজের জবান ও গরিব বাঙালির মুখের বুলি একেবারে আলাদা। এ অঞ্চলের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সাহিত্যের ভাষায় কথা বলেন। তাদের এ ভাষার সঙ্গে বাংলার কৃষক-শ্রমিকের মুখের কথার কোনো মিল নেই। রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ সাহিত্যের ভাষাকে আমজনতার আটপৌরে কথোপকথনের কাছাকাছি আনার অনেক কোশেশ করেছেন, কিছুটা সফলও হয়েছেন। তথাপি দুঃখের বিষয়, যুগ যুগ পরেও এই দুই শ্রেণীর বাঙালির চলায় ও বলায় বিস্তর ভিন্নতা আজও রয়ে গেছে। তাই এখন একক একটি ভাষা দিয়ে বাঙালির বাঙালিত্ব নিরূপণ করা যায় না। আমার মতে, সংস্কৃতি দিয়ে বাঙালির বৈশিষ্ট্য মাপতে গেলে জটিলতা কমবে তো না-ই, বরং বাড়বে আরো বহুগুণ। কারণ হিন্দু বাঙালির চেয়ে মুসলমান বাঙালির বাতচিত, চালচলন, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, উপাসনা-আরাধনা ইত্যাদি আলাদা। সংস্কৃতির এই ভেদাভেদ ধর্তব্যে নিয়ে যদি বলি, বাঙালি প্রধানত দুই কিসিমের—হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি। এ বিভাজনে অমর্ত্য সেনের স্পষ্টতই আপত্তি আছে। অর্থাৎ তিনি বাঙালিকে দ্বিধাবিভক্ত করতে নারাজ।

ধর্ম, সংস্কৃতির একটি অন্যতম প্রধান উপাদান। বাঙালি চিহ্নিতকরণে সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়ায় প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে অধ্যাপক চৌধুরী হিন্দু-মুসলমান বাঙালির বিভাজন মেনে নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি কোনোভাবেই ধনী ও গরিব বাঙালিদেরও এক করে দেখতে চান না। তারা কেবলই ভিন্ন দুই শ্রেণীর মানুষ নয়, বরং তাদের মধ্যে সরবে অথবা নীরবে নিরন্তর শ্রেণীদ্বন্দ্বও কাজ করে। অধ্যাপক সেন যেখানে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চান, সেখানে অধ্যাপক চৌধুরীর মন ও মননে বাঙালির শ্রেণীবিভেদ ও শ্রেণীবৈষম্য বড় হয়ে ধরা দেয়।

বাঙালির সমসাময়িক ইতিহাসের পরম্পরা কিন্তু নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদের পক্ষে নয়, বরং ইংরেজির অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দিকেই ঝুঁকে আছে। তার প্রমাণ ১৯০৫, ১৯১১, ১৯৪৭ ও ১৯৭১। বাঙালির জীবনে অতিগুরুত্বপূর্ণ এ চারটি সালের ব্যাখ্যা ও তাত্পর্য নিয়ে আরেকটি নতুন লেখা তৈরি হতে পারে।

 

আবু এন এম ওয়াহিদ: অধ্যাপক টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি

ম্যানেজিং এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ