দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক মিত্র মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান এবং এ অঞ্চলে চীনের ক্রমশ আগ্রাসী বিনিয়োগ টোকিওকে দক্ষিণ এশিয়ামুখী হতে বাধ্য করেছে। আর এর সুফল পেতে যাচ্ছে ঢাকা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলো আরো বিনিয়োগ করতে চায় বলে জানিয়েছে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি ডিরেক্টর। জাপান একটি শিল্পোন্নত দেশ, যার বাজারভিত্তিক অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক খাতগুলো অত্যন্ত দক্ষ ও প্রতিযোগিতাশীল। তবে সুরক্ষিত খাত যেমন কৃষি বিতরণ এবং বিভিন্ন পরিষেবার উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ থেকে জাপানের আমদানীকৃত পণ্যগুলোর মধ্যে চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক এবং চিংড়ি অন্যতম। জাপান বাংলাদেশে বহির্বিশ্বের সরাসরি বিনিয়োগের চতুর্থ বৃহত্তম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম সারিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং মালয়েশিয়া। বিদেশী বিনিয়োগের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এখনো কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অবকাঠামোগত সুবিধার স্বল্পতা, দক্ষতার অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। অবকাঠামোর ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জোগান এবং উন্নত রাস্তাঘাট অপরিহার্য। জনশক্তির ক্ষেত্রে যদিও বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা দেখতে চায় তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের নিরাপত্তা কতটুকু রয়েছে, বিনিয়োগ করে তারা অর্থ ফেরত পাবেন কিনা। তাছাড়া আর একটি উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা হচ্ছে বাংলাদেশে জমির অভাব এবং জমি পেতে অনেক বিলম্ব হওয়া। একটি আধুনিক পদ্ধতিতে জমির মালিকানায় স্বচ্ছতা থাকা একান্ত অপরিহার্য। আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো সুশাসনের অনুপস্থিতি। সস্তা শ্রম এবং সেবা খাতে অন্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে সুবিধা বেশি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এ দেশকে লাভজনক বলে মনে করছেন। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং স্বচ্ছতার অভাবের মতো পরিস্থিতির জন্যও এফডিআই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের সহায়তা নজিরবিহীন। অবকাঠামো ছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য খাতেও জাপানিদের সহায়তা অনেক। বাংলাদেশকে যত দেশ উন্নয়ন সাহায্য দেয় জাপান সে তালিকায় ওপরে। দেশী কিংবা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ায়, সেখানে জাপানিরা নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ করার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। সময়ের আগে কাজ শেষ হওয়ায় হাজার কোটি টাকাও সাশ্রয় হয়েছে। জাপান সরকার চীন থেকে তাদের কারখানা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরপরই ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারতসহ অনেক দেশ জাপানের এ নতুন বিনিয়োগ তাদের নিজ নিজ দেশের মাটিতে টানার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া শুরু করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার অনগ্রসর অর্থনীতি এবং পণ্য বিক্রির জন্য আদর্শ বাজার না হওয়ার দরুন একটি লম্বা সময় ধরে জাপান এই অঞ্চলকে অর্থনৈতিক সহযোগী অঞ্চল হিসেবে বিবেচনায় নেয়নি। কেননা, জাপান তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে সবসময় অর্থনীতিকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষত ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকায় একটি মধ্য শ্রেণীর উত্থান এই অঞ্চলে জাপানি পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। পাশাপাশি সস্তা শ্রম, নতুন উঠতি বাজার, বিনিয়োগের উত্তম পরিবেশ; অর্থাৎ স্বল্প খরচে পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতের সুবিধা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়া জাপানের কাছে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হতে চলেছে।
প্রশ্ন জাগতে পারে যে জাপান-বাংলাদেশের মধ্যকার এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কি চীনত্যাগী জাপানি কারখানার নতুন বিনিয়োগ প্রাপ্তির জন্য যথেষ্ট কিনা অথবা জাপানি নতুন বিনিয়োগকে বাংলাদেশমুখী করতে আমরা কতটা উদ্যোগী। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, জাপান কোনো দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়—ক. সরকারের বিনিয়োগবান্ধব পলিসি, খ. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিরতা. গ. কাঁচামালের সহজলভ্যতা, ঘ. শ্রমবান্ধব এবং শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষাসংশ্লিষ্ট কঠোর জাতীয় আইন, ঙ. সস্তা শ্রম এবং জাপানি পণ্যের উপযুক্ত বাজার, চ. বিনিয়োগ প্রাপ্তির লক্ষ্যে সরকারের সুনির্দিষ্ট এবং ফলপ্রসূ প্রস্তাব ইত্যাদি। বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজমান। যদিও ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জাপান এখনো বাংলাদেশকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি মনে করে, তথাপি সরকারের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কিছুটা হলেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের মনে সাহসের সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে শ্রমিকদের কম মজুরি, উঠতি মধ্য শ্রেণীর জন্য জাপানি পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ দেশে জাপানি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে প্রায় ১ হাজার ১০ একর জমির ওপর ‘জি-টু-জি’ভিত্তিক ‘জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেটি পাসও হয়েছে। এছাড়া মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ২৫ একর জমিতে জাপানি হোন্ডা মোটর করপোরেশনের জন্য কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে প্রায় ১২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা বিনিয়োগে জাপান টোব্যাকো বাংলাদেশের আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নেয়। এছাড়া মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ামাহা আগ্রহ দেখিয়েছে।
আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে জাপানিজদের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রবাসীরা জাপানি ভাষা আয়ত্ত করে জাপানি পরিবার ও তাদের নিয়োগ কর্তৃপক্ষ জাপানি শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশে জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধার কথা সহজে তুলে ধরতে পারে। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ বেড়েই চলছে। বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগের সঙ্গে জাপান সরকার থেকেও সরাসরি প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। জাপান থেকে ঠিক যেমন বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়, ঠিক তেমনি আগের থেকে জাপানে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানিও বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের তিন শতাধিক কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সর্বাধিক কম। বিগত কয়েক বছরে জাপানে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানি খাতে বাংলাদেশ বেশ প্রশংসিত হয়েছে। তবে দেশে কল-কারখানার পরিবেশ, শ্রমবান্ধব আইনের অনুপস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি জাপানি বা বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দাঁড়াতে পারে।
নতুন উদ্ভূত জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন আশার আলো দেখালেও বাংলাদেশকে এক্ষেত্রে খুব সাবধানে পা ফেলার বিকল্প নেই। যদিও জাপান বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্র, তথাপি জাপানের নতুন এবং অতীব জরুরি এসব পণ্যের বিনিয়োগে জাপান যে সতর্কতা এবং অনেক হিসাবনিকাশ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তা অনেকটাই নিশ্চিত। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জাপানি নতুন বিনিয়োগ ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কোনো তত্পরতা লক্ষ করা যায়নি। এখন পর্যন্ত মাত্র বাংলাদেশের দুটি সংস্থা জাপানি বিনিয়োগপ্রাপ্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে: বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা) এবং বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা)। এর মধ্যে একমাত্র বেজা দেশে প্রায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে, যার মধ্যে জাপানের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনাও করছে, যা নিঃসন্দেহে কার্যকর উদ্যোগ। যেহেতু জাপানের এ বিশাল বিনিয়োগ ধরার লক্ষ্যে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো মুখিয়ে, সেহেতু বাংলাদেশকেও বসে থাকলে চলবে না। কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকল্পে সরকারিভাবে কিছু প্রণোদনা এবং আরো বিশেষায়িত অঞ্চল প্রদান করতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগের সুবিধার্থে দেশের ভূমি, শ্রম এবং কর আইনকে প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান রক্ষায় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকেই একনিষ্ঠতার পরিচয় দিতে হবে এবং সরকারকে এ বিষয়ে তদারক জোরদারের কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন বুনছে সেক্ষেত্রে জাপান এবং জাপানি বিনিয়োগ হতে পারে প্রধান সহযোগী।










