ব্যবসার উদ্দেশ্য লাভ করা, লাভ ছাড়া কোনো ব্যবসা টিকে থাকতে পারে না। প্রাচীনকাল থেকে এভাবেই ব্যবসার প্রসার হয়েছে। অব্যাহত ক্ষতির মুখে অনেক ব্যবসাই বিলুপ্ত হয়েছে, সেখানে নতুন কোনো ব্যবসা জায়গা করে নিয়েছে। কোনো ব্যবসা বাঁক বদল করেছে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন পণ্য উৎপাদন করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসা প্রথা যুগের পর যুগ ধরে টিকে আছে।
সম্প্রতি ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য বাড়াবেন না। এ বদনাম থেকে ব্যবসায়ীরা রেহাই পেতে চান। এমনকি ১ মার্চ থেকে নতুন করে ৯৪৭টি বাসে ই-টিকেটিং শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে মনের পর্দায় ভেসে উঠল গত জানুয়ারিতে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তারা ভাড়া নৈরাজ্যের অভিযোগ থেকে মুক্তি চান। দৃশ্যত ব্যবসায়ীদের এমন ইতিবাচক মনোভাব আমাদের জন্য স্বস্তিকর। কিন্তু এর প্রয়োগ কি দেখা যাবে?
আর ভোক্তাদের অতিরিক্ত পণ্য কেনার ফলে দ্রব্যের দাম বাড়ে—এমন অভিযোগকেও কি অস্বীকার করার উপায় আছে? তাহলে সমাধান কী হতে পারে? বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়েরই সচেতন ভূমিকা এক্ষেত্রে কি কাম্য নয়?
আরেকটি বিষয় হচ্ছে পণ্য মজুদ করে রাখা, খুচরা বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলেও পাইকারি বাজারে পণ্যের মজুদ স্বাভাবিক থাকে। এক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করে কোনো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়ার যে দুষ্টচক্র, সেটিকেও কি অস্বীকার করার উপায় আছে? এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করার দুঃসাহস কিছু ব্যবসায়ীর কীভাবে হয়? ক্ষমতার বলয়ে বর্তমানে ব্যবসায়ীরা প্রবেশ করেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের ৬১ শতাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী। এর অর্থ দাঁড়ায়, ব্যবসায়ীরা এখন নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু ব্যবসার উদ্দেশ্য তো খারাপ নয়। কোনো ব্যবসায়ী নিশ্চয়ই খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবসা করতে নামেন না। বিশেষ করে সম্পদে ব্যক্তি মালিকানা প্রথা শুরু হওয়ার পর ব্যবসা করে জীবিকা উপার্জন খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে এসেও ব্যবসার মতো লাভজনক জীবিকার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। যে কারণে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তরুণদের আহ্বান জানিয়েছেন।
আবার উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যেকোনোভাবে চেষ্টা না করে সৎ পথে উদ্যোগী হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। না হলে কোনো এক অনলাইন কোম্পানির ফাঁদে পা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন এমন নজিরও নিকট অতীতে দেখা গেছে। এদিকে বর্তমানে উদ্যোক্তা মানেই মধু, কালিজিরার তেল, গুড়, ঘি, ড্রাই ফ্রুটস বিক্রি করা হয়—এমন মত দেন কেউ। আবার এসব পণ্যে ভেজাল বেশি হয় বলেই গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে শিক্ষার্থীরা খাঁটি পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেন। তবে আমের মৌসুম সামনেই আসছে, আর এ সময়ে অনেক তরুণ আম বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, যা আসলেই প্রশংসার যোগ্য। এতদিন বাগানের যে আম বাগানে গিয়েই খেতে হতো, সে আম এখন বক্সে করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেই ঘরে চলে আসে।
ভেজালের প্রসঙ্গে বলছিলাম, মূলত ব্যবসায় নৈতিকতার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ভোক্তাকে খাঁটি পণ্য সরবরাহ করা। এ জায়গায় কি ব্যবসায়ীরা নৈতিকতা বজায় রাখতে পারছেন? খোদ ঢাকা শহরে বিষাক্ত কেমিক্যালমুক্ত ফল পাওয়া এখন রীতিমতো কল্পনার ব্যাপার হয়ে রয়েছে। ছোটবেলায় যে কলা খেয়ে তৃপ্তি পাওয়া যেত, সে পাকা কলা এখন ঢাকা শহরে পাওয়াই যায় না। বিক্রেতারাও কেমিক্যাল মিশ্রিত কলা জমা করে রাখেন, কেমিক্যালের প্রভাবে পাকার পর সে কলা বিক্রি করেন। যে কারণে কলার থোকায় গোড়া সবুজ থাকা অবস্থাতেই আমাদের কলা কিনে খেতে হয়। একদম পাকা কলা খেতে হলে গ্রাম থেকে কারো মাধ্যমে নিয়ে আসা ছাড়া উপায় থাকে না।
কিছুদিন আগে দেশের বৃহৎ একটি শপিং মলে ভেজালবিরোধী অভিযানে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান পরিচালনাকারী দল। এ সময় গণমাধ্যম কর্মীদেরও সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেয়া হয়। এমনকি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা ভাংচুর করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অভিযান পরিচালনা না করেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্যান্য কর্মকর্তা চলে আসেন।
এর আগে পুরান ঢাকায় আবাসিক ভবন থেকে রাসায়নিক দ্রব্য সরানোর অভিযানে গিয়ে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়েন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট। প্রায় সময় ঢাকার মিটফোর্ডে ভেজাল ওষুধবিরোধী অভিযানে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ২০১৬ সালে চকবাজারে অবৈধ পলিথিন তৈরির কারখানার সন্ধানে গেলে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিককে। বাংলাবাজারে সরকারি বই গুদামজাত করে বিক্রি হচ্ছে—এমন অভিযোগে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধাওয়ার মুখে পড়ে একটি বেসরকারি চ্যানেলের অনুসন্ধানী সংবাদ টিম। সুদূর বান্দরবানে সরকারি গাছ কেটে খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে—এমন অনুসন্ধানে যাওয়ার পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নলের সামনে পড়ার কথা জানিয়েছিলেন এক সাংবাদিক।
তাহলে ব্যবসার ক্ষেত্রে বৈধ, অবৈধ প্রসঙ্গ কি মিথ? এটা সত্য, ব্যবসায় লাভ করার ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ একটি আপেক্ষিক বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। এজন্য দামাদামি করে পণ্য ক্রয় করাকে আর্ট হিসেবে দেখা হয়। তবে বাজার যেন অস্থিতিশীল না হয়ে পড়ে সেজন্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা জরুরি। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে পণ্যের মূল্য ঠিক করা উচিত। কিন্তু ভেজাল পণ্য বিক্রি করে লাভবান হওয়া তো কোনো অর্থেই ব্যবসায় নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। এক্ষেত্রে ছাড় দিলে ভোক্তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকায় কার্টুন কোলাজ ছাপা হয় ‘খাদ্যে ভেজাল দেয়ার সময় আপনার সন্তানের কথা ভাবুন’। কথাটা নিঃসন্দেহে স্পর্শকাতর, কিন্তু ভেজাল খাবার মোড়কজাত করার আগে এ চিন্তা কি মাথায় থাকে? গুঁড়োদুধে মেলামাইন কাণ্ডে চীনের ঘটনা মনে পড়ে, দেশটির সরকার শক্ত হাতে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু আমাদের দেশে ভেজাল এখন নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে। খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে যেকোনোভাবে লাভবান হওয়ার চিন্তাই এমনটি হওয়ার কারণ। প্যাকেটজাত খাবারে লবণের অতিরিক্ত মাত্রা, মিষ্টিতে কাপড়ের রঙ, তরমুজ সিরিঞ্জের মাধ্যমে রঞ্জিত করা, কৃষিপণ্য গাছে থাকতেই রাসায়নিক প্রয়োগ করা, এমনকি মুরগিকে নিম্নমানের খাবার খাওয়ানোর ফলে ডিমে ক্রোমিয়াম ও সিসার উপস্থিতি, হোটেলগুলোয় মৃত পশুর মাংস খাওয়ানোর অভিযোগ এসব নিয়েই আমাদের দিনাতিপাত করতে হয়। এর যেন কোনো শেষ নেই। মাঝে মধ্যেই ভেজালবিরোধী অভিযানের খবর নজরে আসে। কিন্তু জরিমানা প্রদানের পর আবারো পূর্বের অবস্থা ফিরে আসে।
ব্যবসার সব ক্ষেত্রেই শুধু নগদ অর্থ আর স্বার্থকেই বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা রমজানে দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার কোনো চিহ্ন এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না, বরং রমজানের আগেই দাম বাড়িয়ে রমজানে আর সেভাবে না বাড়ানোর কৌশল নেয়া হচ্ছে কিনা সেটি একটি প্রশ্নবোধক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা-ই হোক, মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা কারো পক্ষেই এককভাবে দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হয় না। বাজারে নতুন প্রতিযোগীর আবির্ভাব হবেই, এটাকে মেনে নিয়েই ব্যবসা করতে হয়। এক্ষেত্রে অন্যকে ব্যবসা করার সুযোগ যেমন দিতে হয়, ঠিক তেমনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পণ্যের দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী করে ফেলাটাও কাম্য নয়। তাই লাভের অংক গণনার পাশাপাশি ভোক্তার জন্য খাঁটি পণ্য নিশ্চিত করা এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করা ব্যবসায়ীদের নৈতিক দায়িত্ব। এজন্য মনুষ্যত্বের বোধটাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন, অন্তত ভালো মানুষ এবং ভালো ব্যবসায়ী—এ ধারণাটি নিশ্চয়ই এখনো মিথ নয়?
তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক










