যদিও ভোক্তাপণ্য বাজারজাতে বহুদিন পূর্ব থেকেই এ পদ্ধতি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে আসছে, তবে এটি প্রথম নজরে আনেন ২০০৯ সালে খ্যাতনামা ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পিপা ম্যামগ্রেন এবং এটিকে তিনি নাম দেন ‘শ্রিংকফ্লেশন’।

অর্থনীতির অভিধানে ‘ইনফ্লেশন’ বা মূল্যস্ফীতি শব্দটির প্রায়োগিক অভিঘাত বা ফলাফল সম্পর্কে কমবেশি সবারই জানা আছে। তবে অর্থনীতির ‘শ্রিংকফ্লেশন’ পরিভাষা বা শব্দটি খুব একটা ব্যবহার না হলেও ভুক্তভোগিতার ব্যাপকতায় এটিও আলোচনার দাবি রাখে এবং শব্দটি শোনার বা পড়ার তাৎক্ষণিক ব্যঞ্জনার সঙ্গে ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক বাস্তবতার মিলগত প্রভাব মোটামুটি জুতসই বলা যায়।

‘শ্রিংকফ্লেশন’ বাংলায় একশব্দে অনুবাদযোগ্য কিনা জানা নেই, তবে এটির চর্চা বাজার অর্থনীতিতে খুব ভালোভাবেই প্রচলিত আছে এবং এর ব্যাখ্যায় বোঝানো হয়েছে যে ‘ভোক্তাপণ্য বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্য পূর্বের মতো বা একই রেখে মোড়ক ও স্টিকার পরিবর্তন না করে ভেতরে পণ্যের পরিমাণ বা ওজন কমিয়ে দিয়ে বাজারজাত’।

সাধারণত এমনটা করা হয় অধিক হারে বাজারজাতকৃত বা চাহিদাসম্পন্ন প্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে খাবারজাতীয় পণ্যে। উল্লেখ্য, ক্রেতা বা ভোক্তা তার চাহিদাপূরণে অভ্যস্ত কম মূল্যের পণ্য ক্রয়েই ঝুঁকে থাকেন। এর ফলে সুযোগটি গ্রহণ করেন জনপ্রিয় বা প্রচলিত পণ্যের উৎপাদকরা ও বাজারজাতকারীরা। শ্রিংকফ্লেশন পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল্য একই বা পূর্বরূপ রাখা হয়, মোড়ক-স্টিকারও অপরিবর্তিত রেখে দেয়া হয়; কিন্তু পণ্যটি পরিমাণে বা ওজনে কম দেয়া হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হ্রাসকৃত ওজন বা পরিমাণও মোড়কে লেখা থাকে এবং কখনো ওজন বা পরিমাণ কিছু কমিয়ে মূল্য স্বল্পভাবে বাড়ানো হয়। কিন্তু ভোক্তা বা ক্রেতা এরূপ পরিবর্তনটি সহজে বুঝতে পারেন না এবং নিজ নিজ চাহিদা মেটাতে পূর্বের অভ্যাসগত আচরণ থেকে পণ্যটি ক্রয় করে থাকেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বেশ কষ্টে ফেলে দিয়েছে শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষজনকে। খাদ্যগ্রহণের বেলায় এখানে পুষ্টি, পুষ্টিমান, পুষ্টির পরিমাণ ইত্যাদি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিবেচনায় নেয়া সম্ভব হয় না ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে। শ্রমজীবী মানুষ ক্ষুধা মেটাতে ‘সহজলভ্য’ বা ‘কম মূল্যের’ সাধারণ মানের পাউরুটি, বিস্কুট, কেক ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে থাকেন। এসব অতিপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য বাজারজাতে উৎপাদকরা ‘শ্রিংকফ্লেশন’ পদ্ধতি অবলম্বন করে আসছেন এখানে বহু বছর ধরেই। বলা হচ্ছে, কাঁচামালসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এমনটি করা হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে ভুক্তভোগী হচ্ছেন ক্রেতা বা খাদ্যগ্রহীতা নিম্নআয়ের মানুষ। অথচ তারা মূল্য পরিশোধ করছেন আগের মতোই, কিন্তু খাদ্য বা পণ্য পাচ্ছেন পরিমাণে-ওজনে কম।

বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, শ্রিংকফ্লেশন সিস্টেমটির নেপথ্যে শুধু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিজনিত একটি কারণ নয়; কারণ ও অজুহাত কয়েকটি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, একই জাতীয় পণ্যের একাধিক বা অনেক উৎপাদক বাজারে সক্রিয় থাকায় সরাসরি মূল্য না বাড়িয়ে বাজার ধরে রাখার প্রতিযোগিতা। দ্বিতীয় কারণ হলো, মূল্য সংযোজন কর, শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক-লোকবলসহ পরিচালনাগত ব্যয় বৃদ্ধি। আরেকটি হচ্ছে, সরাসরি প্রতারণা—মূল্যবৃদ্ধির সময়গুলোয় অতিরিক্ত মুনাফার জন্য এহেন কারসাজি।

উৎপাদন খরচ বেড়ে থাকে সাধারণত দেশী-বিদেশী কাঁচামালের বাড়তি দাম, উৎপাদনে-বাজারজাতে নিয়োজিত লোকবলের বেতন বা মজুরি বৃদ্ধি, ভ্যাট-শুল্ক-পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি প্রভৃতিতে। কিন্তু যা-ই বাড়ুক না কেন, যেকোনো ধরনের অতিরিক্ত যুক্ত খরচই প্রস্তুতকারীরা-বাজারজাতকারীরা-মধ্যস্বত্বভোগীরা বহন করেন না। শেষ পর্যন্ত সব অতিরিক্ত খরচ ‘এন্ড ইউজার’ হিসেবে ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।

বাজার অর্থনীতিতে শুধু মুনাফার জন্যই উৎপাদন ও ব্যবসা—এটিই মূলমন্ত্র ও লক্ষ্য হওয়ায় শ্রিংকফ্লেশন করা হচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চুপিসারে। সরাসরি দাম বাড়ানো হলে বাজার হারানোর একটা বড় ঝুঁকি থাকে এবং মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির কালে এসব উৎপাদক-ব্যবসায়ীরা তাদের মুনাফা ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ‘শ্রিংকফ্লেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এটা হলো, ভোক্তার কাছে সত্য গোপন রেখে লাভবান হওয়ার পন্থা। এ পন্থা অবলম্বন নৈতিকতার মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু এটি রোধে বা এ ধরনের পলিসি অবৈধকরণে বিশ্বের কোথাও কোনো আইন বা প্রবিধান নেই। কিংবা নৈতিকতার প্রশ্নে এরূপ করা যাবে না মর্মে কোনো ধরনের সামাজিক কনসেনশাস বা সংস্কৃতিও তৈরি হয়নি। ফলে বাজার অর্থনীতিকবলিত বিশ্বে সভ্য ও নৈতিকভাবে উত্তীর্ণ কিছু সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যতীত অন্যত্র ‘শ্রিংকফ্লেশন’ একটি প্রচলিত বৈধতার ব্যবসায়িক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। উন্নত দেশেও এমনটা করার নজির আছে। তবে সেটি ভোক্তাকে অবহিত করেই করা হয় অনেক দেশে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র ভয়ানক। এখানে শ্রিংকফ্লেশন আর চৌর্যবৃত্তি সমার্থক হয়ে গেছে। মানুষ ঠকানোর মজ্জাগত চর্চা এক্ষেত্রে ব্যাপকতা পেয়েছে প্রবলভাবে। করপোরেট উৎপাদকরা-বাজারজাতকারীরা শুধু নিজেদের লাভের জন্য এখানে ‘শ্রিংকফ্লেশন’ করছেন তো বটেই পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের জোগানদাতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদক-বাজারজাতকারীরাও একইভাবে বছরের পর বছর মানুষকে এভাবে এক ধরনের প্রতারণাই করে যাচ্ছেন। মানুষ মূল্য পরিশোধ করে তার ন্যায্য প্রাপ্য পণ্য পাচ্ছে না। ফলে শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের মানুষ তার রোজগারের অর্থ ব্যয় করে অর্ধভুক্ত থাকছে। শারীরিকভাবে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। শ্রমবাজারে তার উৎপাদনশীলতা কমছে। প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে, জিডিপিতে অবদান তার পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা অনুযায়ী থাকছে না।

সামাজিক নিরাপত্তায় এগিয়ে থাকা দেশগুলো, উন্নত বিশ্বে, নৈতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ রাষ্ট্র-সমাজে, আইন-কানুনের বাধ্যবাধকতায় কিছু দেশে বা ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোয় অর্থনীতির এই ‘শ্রিংকফ্লেশনে’ ভোক্তা বা ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয়, বিশেষ করে বাংলাদেশে কী হচ্ছে? সর্বত্র শ্রিংকফ্লেশন পদ্ধতির একটা ঠগবাজির প্রতিযোগিতায় নেমেছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। প্রতারিত হচ্ছে প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষই। তবে বেশি ভুক্তভোগী নিম্ন আয়ের মানুষ। এসব মানুষের খাদ্যগ্রহণ স্বল্পতায় রুগ্‌ণ হয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে, কর্মক্ষমতা কমছে। অসুখ-বিসুখ বাড়ছে। উৎপাদনশীলতা যাচ্ছে কমে। রাষ্ট্রও সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এর অবসান দরকার এখানে জরুরি ভিত্তিতে—আইন করে, আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে, তদারকি নিশ্চিত করে—দেশের স্বার্থে।

মোতাহার হোসেন চৌধুরী: গবেষক ও রাজনীতি-অর্থনীতি বিশ্লেষক