বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়ে  বিতর্ক নেই । তবে সেই  সফলতা সর্বাত্মক নয়,  বরং তা  বৈরী একটা ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠায়। ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠা আমাদের স্বাধীনতার লক্ষ্য ও সংবিধানের ১৯(২) ধারায় স্পষ্ট বিধৃত আছে—‘মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা দূরীকরণে এবং নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ ও সুযোগের সমান বণ্টন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে প্রজাতন্ত্রব্যাপী একই মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো যায়।’ বিষময় আঞ্চলিক বৈষম্য অভ্যন্তরীণ অভিপ্রয়াণ উসকে দিচ্ছে, শিকড় ছিঁড়ে ছুটছে মানুষ শহরে, বিশেষত চিটাগং ও ঢাকায় এবং পড়ছে গোলকধাঁধায়। টপডাউন প্ল্যানিং, নগরমুখী নীতিমালা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আঞ্চলিক পরিকল্পনার অভাব সুষম উন্নয়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক বলে মনে করছেন বিজ্ঞজন।

সম্প্রতি এ কথাগুলো উঠে এসেছে  বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) ও জার্মানির জিআইজেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনার ওপর এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে। 

আপাতত আমাদের বৈষম্যের গল্পটা দারিদ্র্য দিয়ে শুরু করা যাক। প্রাক-প্যানডেমিক এক দশকে সার্বিক দারিদ্র্য প্রকোপ কমেছিল বটে কিন্তু ঢাকা আর সিলেট বিভাগে দারিদ্র্যের গড়পড়তা হার রংপুর ও ময়মনসিংহের অর্ধেক। চরম দারিদ্র্যের বেলায় অবস্থানটা অনেকটাই ওরকম। ২০১৩-১৬ সময়কালে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পেয়েছে ঢাকা বিভাগ, প্রায় ৩০ শতাংশ চিটাগং। এর বিপরীতে রংপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল প্রত্যেক বিভাগ গড়ে পেয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ৩-৫ শতাংশ। রাস্তার ঘনত্ব, শিল্প-কারখানার ব্যাপকতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলগুলো প্রমাণ করছে তারা গরিব কারণ তারা গরিব; দহনে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র।

 আয়বৈষম্যের নির্দেশক জিনি সহগের পরিবর্তন শাসনতন্ত্রের ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, অর্থাৎ আয়বৈষম্য ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশির দশকের শূন্য দশমিক ৩৭৭ থেকে ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ৪৮৩, যা  আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে  প্রবৃদ্ধির সুফল সবার জন্য সমান হয়নি। এ দেশে আজ মানুষে মানুষে আয়বৈষম্য বাড়ছে—ওপরের ২০ শতাংশের কাছে মোট আয়ের ৪১ ভাগ আর নিচের ২০ শতাংশের কাছে ৮ ভাগ। সম্পদের বৈষম্য তো কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতা কাঠামো কোটিপতিদের কটিবন্ধ। তবে একথাও ঠিক যে কেউ বঞ্চিত হয়নি, কিছুটা হলেও প্রবৃদ্ধির সুফল চুইয়ে পড়েছে, এমনকি গরিবের চৌহদ্দিতে। যাই হোক, অপরিকল্পিত শহর হিসেবে ‘খ্যাত’ খোদ ঢাকা শহরে পেটের টানে শিকড় উপড়ে গ্রাম থেকে আসা গরিবদের ঘিঞ্জি কুড়িল বস্তি ধনীদের গুলশানের পাশেই। বারবার আগুন লাগে কুড়িল বস্তিতে, খবর পাই, আর বস্তিবাসী ভাবে, ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’

সুষম উন্নয়নের কথা প্রথম বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা যদি শুধু ঢাকার জন্য পরিকল্পনা করি, সেটা হবে না। আমাদেরকে পুরো বাংলাদেশের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। প্রত্যেককে দেশ নিয়ে ভাবতে হবে, যাতে শুধু ঢাকার জন্য পরিকল্পনা করার ভুলটা না হয়।’

তার পরও গত ৫০ বছরে আলোকিত হয়ে আসছে ঢাকা আর পুরো দেশ অনেকটাই ঢাকা অন্ধকারে।

ব্যক্তি বা আঞ্চলিক স্তরে বৈষম্যবিরোধী যুক্তি দুটি না বললেই নয়। একটি নৈতিক, অন্যটি অর্থনৈতিক। ইচ্ছাকৃতভাবে বিশেষ সুবিধা বা সুযোগ দিয়ে কাউকে এগিয়ে দেয়া কিংবা পেছনে ফেলা ধর্মীয় বিধান বা ন্যায়ের নিক্তিতে সঠিক নয়। ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক কিংবা ব্যক্তিগত বাধা থাকলে সে অন্য কথা, যেমন শারীরিক অক্ষমতা কিংবা ল্যান্ড লকড অঞ্চল। দ্বিতীয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ—নেহাত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, কোনো ব্যক্তি বা অঞ্চলকে বঞ্চিত করা মানে পুরো দেশকে বঞ্চিত করা। কেননা সুযোগ ও সুবিধা পেলে ওই ব্যক্তি বা অঞ্চলের উৎপাদন জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারত। সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি করত, পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার ব্যাপার তো থাকছেই।

তার পরও বলতে হয়, ধীরগতিতে বিশেষত নগর-পল্লী পার্থক্য হ্রাস পাচ্ছে। প্রায় ৭০ শতাংশ খানায় বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন, ঘরে ঘরে সেলফোন, এমনকি গ্রামের বাজারে শহুরে ভোগ্য ও সেবা পণ্যের প্রাপ্তি খাটো করে দেখার মতো নয়। কমছে শহর-নগর মজুরি ব্যবধান; এমনকি নারী-পুরুষের ক্ষেত্রেও, মেয়েরা এগিয়ে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষায়। আঞ্চলিক বৈষম্য আছে, তবে আগের মতো তত তির্যক নয় বলে ধারণা—বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ কেন্দ্রের সঙ্গে প্রান্তিক উত্তর প্রান্তের সংযোগ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটিয়ে চলেছে; দক্ষিণের সঙ্গে সখ্য পদ্মা সেতু নির্মাণের পরেই অনুভূত হতে আর মাত্র কিছুদিন বাকি। নোবেলজয়ী গুনার মিরডালের ভাষায়, ‘স্প্রেড ইফেক্ট’ ‘ব্যাক ওয়াশ’ ইফেক্টের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে মেগা প্রকল্পের কারণে।

 সুতরাং বলা বাহুল্য, বিদ্যমান বৈষম্য বিদায় করতে সরকারি প্রচেষ্টার খামতি নেই—পঞ্চবার্ষিক কিংবা প্রেক্ষিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কৌশল উপস্থিত, যেমন হটস্পট অঞ্চল নির্ধারণ করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান। প্রশ্ন হলো, পাহাড়ি লোকেরা কি সমতলের মানুষের মতো আধুনিকায়ন চায় না প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল জীবিকা চায়, সেটা কে ঠিক করে? তবে এরই মধ্যে মেগা প্রকল্পগুলোর ক্রাউডিং ইন ইফেক্ট হিসেবে গড়ে উঠছে কলকারখানা, দোকানপাট, নিওন বাতির আলো;  যা দেখলে প্রথমে ধাক্কা লাগে। লাগবেই তো—‘অন্ধকারে যে বাস করে মৃদু আলোতে তার চোখ ঝলসাইয়া যায়।’ তবে এগুলো হচ্ছে তদারকিবিহীন যত্রতত্র ‘যেমন ইচ্ছা তেমন সাজো’ গোছের—পরিকল্পনাহীন, কোথাও কৃষিজমি দখল করে। তেমনি ব্যক্তি বা সরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠছে গ্রামীণ গ্রোথ সেন্টার, টাউনশিপ, রেমিট্যান্স অধ্যুষিত গ্রামে দালানের পর দালান। এরই মধ্যে হয়তো ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে প্রবৃদ্ধি উসকে দেবে কিন্তু তাতে বৈষম্য কমবে কিনা, সেটা এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। আঞ্চলিক তথা খানা পর্যায়ে বৈষম্য লাঘবে রাঘববোয়াল শিল্পের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অন্তত ইউনিয়ন স্তরে কিংবা তার আশপাশে গ্রোথ সেন্টারে।

‘নতুন করিয়া গড়িবে ঘর-দুয়ার পথঘাট। সুন্দর সুগঠিত সুসমান পথগুলি বাড়ির সম্মুখ দিয়া, পঞ্চগ্রামের মাঠের মধ্যে দিয়া সুদূরপ্রসারী হইয়া চলিয়া যাইবে গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে, দেশ হইতে দেশান্তরে যাইবে সেই পথ। সেই পথ ধরিয়া যাইবে পঞ্চগ্রামের মানুষ, পঞ্চগ্রামের শস্য-বোঝাই গাড়ি দেশ দেশান্তরে। শত গ্রামে সহস্র গ্রামের মানুষ তাহাদের জিনিসপত্র লইয়া সেই পথ ধরিয়া আসিবে পঞ্চগ্রামে।’ (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘গণদেবতা পঞ্চগ্রাম’)

বৈষম্যের ব্যাপকতা কমিয়ে আনার সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। তার মধ্যে প্রধান কথা ও কাজের ব্যবধান। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও স্থানীয় পরিকল্পনায় সাযুজ্যের ঘাটতি, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে ফারাক, স্থানীয় সরকারের কর্মদক্ষতা ও ক্ষমতায় ঘাটতি, স্থানীয় পরিকল্পনায় জনগণের কম সম্পৃক্ততা। তবে এলিট বা অভিজাত গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ ও আমলাতন্ত্রের প্রকট অভাব, ধীরগতিসম্পন্ন বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি অবশ্যই প্রতিবন্ধক। বস্তুত এসব সমস্যার সমাধান ঈপ্সিত লক্ষ্য পৌঁছতে সাহায্য করবে। আমরা এমন উন্নয়ন চাই না, যে উন্নয়ন মানুষকে গ্রাম থেকে শহরের দিকে টানে। আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে শহরের সব সুবিধা গ্রামে পাওয়া যাবে:

‘সে কাল আর নাই। কালের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। মাঠের বুক চিড়িয়া রেল লাইন পড়িয়াছে। তাহার পাশের টেলিগ্রাফ তারের খুঁটির সারি। বিদ্যুৎ শক্তিবহ তারের লাইন। মেঠোপথ পাকা হইয়াছে। তাহার উপর দিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে মোটর বাস ছুটিতেছে। নদী বাঁধিয়া খাল কাটা হইয়াছে। লোকে হুক্কা ছাড়িয়া বিড়ি সিগারেট ধরিয়াছে। কাঁধে গামছা, পরনে খাটো কাপড়ের বদলে বড় বড় ছোকড়াড়া জামা, লম্বা কাপড় পরিয়া সভ্য হইয়াছে। ছ-আনা, দশ-আনা ফ্যাশনে চুল ছাঁটিয়াছে। ভদ্র গৃহস্থ ঘরের হাল-চাল বদলাইয়াছে।’ (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘রাইকমল’)

আরো কথা আছে। আঞ্চলিক পরিকল্পনা ও নগর উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ কাজে লাগাতে হবে। সময় এসেছে যখন এমনকি উপজেলা পর্যায়ে ভৌত পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের কথা ভাবতে হবে, যিনি গ্রাম অব্দি ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে, এমনকি বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নির্মাণে পরামর্শ দেবেন।

অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনায় নগর উন্নয়ন নিয়ে কৌশলের কথা আছে, যা আমাদের জন্য কুশল নিয়ে আসবে বলে আশা করা হয়। তেমনি আঞ্চলিক বৈষম্য নিরোধেও ভালো ভালো কৌশলের কথা আছে। শুনছি ২০৪০ সালের মধ্যে গ্রামের ৮০ শতাংশ মানুষ পাবে জীবন উন্নত করার শহুরে সুযোগ-সুবিধা—‘আজি আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে।’

কিন্তু যেন বলতে না হয়, ‘ফিরিয়ে দাও সে অরণ্য, লহ এ নগরী’ অথবা গাইতে না হয়, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ উন্নয়ন যেমন দেয়, তেমনি কেড়ে নেয় অনেক কিছুই। তার পরও ভারসাম্যের উন্নয়ন চাই, বৈষম্যমূলক উন্নয়ন নয়।

‘Enough economic inequality can transform a democracy into a plutocracy, a society ruled by the rich. Large inequalities of inherited wealth can be particularly damaging, creating, in effect, an economic caste system that inhibits social mobility and undercuts equality of opportunity.’

[অধ্যাপক ড. আখতার মাহমুদের সঞ্চালনায় ওই সেমিনারের এক অধিবেশনে দুটি প্রণিধানযোগ্য প্রবন্ধ পেশ করেছেন মাফিদুল ইসলাম ও আদিল এম খান, যা লেখকের উপাত্তের প্রধান উৎস]

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও উপাচার্য

বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক