যক্ষ্মা এখনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম বিপদ; ভীষণ সংক্রামক ও প্রাণঘাতী। মাত্রাগত তারতম্য থাকলেও পৃথিবীর সব প্রান্তেই যক্ষ্মা রোগী রয়েছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বিস্তার বেশি। ২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মার প্রকোপ কোন কোন দেশে বেশি, তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নামও আছে। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী এ রোগে মারা যায়। সেই বিবেচনায় মারণঘাতী রোগটি আমাদের দেশের জন্যও অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। তার মধ্যে রোগীর অবস্থানগত বিন্যাস আরো ভীতিপ্রদ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া রোগীদের ৮৫ শতাংশই উপজেলা পর্যায়ের বলে খবর মিলছে। এটি উদ্বেগজনক বৈকি।

একসময় বলা হতো, ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই।’ সেই দিন শেষ। কার্যকর ওষুধ ও সুনির্দিষ্ট  কোর্সভিত্তিক চিকিৎসায় যক্ষ্মা রোগী এখন সুস্থ হয়ে ওঠে। রোগটি নির্মূলে সরকার বেশ আগেই জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় সফল দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ এবং এটি বৈশ্বিকভাবেও স্বীকৃত। তথ্য বলছে, দেশে ৯৬ ভাগ রোগীই চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে সেরে উঠছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ে এ রোগের ব্যাপকতার বিষয়টি নতুন করে দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছে। এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাঠামোগত সমস্যা নেই। যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিবন্ধন করে যে কেউ সেখানে বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এর পরও বড় শহর ও উপজেলা পর্যায়ে রোগীর বিন্যাসে এত পার্থক্য কেন বিরাজ করছে,  এর সুলুক সন্ধানপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

গ্রামীণ এলাকায় রোগী বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্টত বেশকিছু কারণ বিদ্যমান। সেখানকার বিপুলসংখ্যক রোগীই শনাক্তের বাইরে রয়ে যায়। আবার শনাক্ত হলেও চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করে। দেরিতে চিকিৎসা করার ফলে মৃত্যুর পাশাপাশি সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এভাবে ভেতরে ভেতরে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গ্রাম পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের উপস্থিতি বেশি। সহজলভ্যতা ও নিম্নব্যয়ের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের দ্বারস্থ হয় অধিক। ফলে রোগটি অনেক ক্ষেত্রে অনির্ণীত থাকে এবং যথাযথ চিকিৎসাও দেয়া হয় না। আছে পুষ্টিহীনতার মতো সমস্যাও। গ্রাম পর্যায়ে একে তো দারিদ্র্য হার বেশি, আবার পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতাও কম। কোন খাদ্যে কী ধরনের পুষ্টিগুণ রয়েছে, তা অনেকেই জানে না। এতে অজান্তেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে অনেকেই, যা যক্ষ্মার পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করছে। আরেকটি কারণ বায়ু দূষণ। শহরের মতো শিল্প দূষণ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া কম থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে ইটভাটা ও লাকড়ি চুলা ব্যবহারজনিত বায়ু দূষণের প্রকোপ বেশি। এর ফলেও অনেকেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া বাসস্থানগত পারিবারিক কাঠামোও একটি বড় ফ্যাক্টর। শহরে ছোট বাসায় এক-দুজন থাকলেও গ্রামে একই ঘরে অনেকে একসঙ্গে থাকে। এর মধ্যে কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে কিংবা চিকিৎসার বাইরে থাকলে পরিবারের বাকি সদস্যরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সর্বোপরি রয়েছে সচেতনতার ঘাটতি। সব মিলিয়ে বলা চলে, গ্রাম পর্যায়ে যক্ষ্মা রোগী বেশি।

২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ ভাগ রোগীকে পরিপূর্ণ চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। সুপরিকল্পিতভাবে গ্রামীণ এলাকাকে টার্গেট না করলে এ লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হবে বৈকি। সেখানে প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যন্ত্রের স্বল্পতা ও বরাদ্দ ঘাটতি রয়ে গেছে। এগুলো দূর করতে হবে। যক্ষ্মার প্রচারে সবসময় চিকিৎসা সম্পূর্ণ নিখরচায় বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ওষুধ ও কাশির পরীক্ষা বিনা মূল্যে হলেও এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা যক্ষ্মা সম্পর্কিত অন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিনা মূল্যে দেয়া হয় না। এটিও আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের রোগ গোপন করা বা চিকিৎসা না নেয়ার একটি। কাজেই চিকিৎসা আরো কীভাবে সুলভ বা ব্যয়সাশ্রয়ী করা যায়, তা-ও ভাবতে হবে। অনেকেই চিকিৎসা নিলেও পুরো ডোজ বা কোর্স শেষ করে না। আবার যথাযথ প্রশিক্ষিত জলবল ছাড়া পরীক্ষা করে ওষুধ দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। উভয় ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে আর ওষুধ কাজ করছে না। ফলে ওষুধ প্রতিরোধীদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে যক্ষ্মা চিকিৎসায় এটিও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যক্ষ্মা শনাক্তে আধুনিক জিন এক্সপার্ট পরীক্ষা উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মাধ্যমে মাত্র ২ ঘণ্টায় রোগ নির্ণয় সম্ভব। সমস্যা হলো পুরো দেশে অন্তত ১ হাজার ২০০ জিন এক্সপার্ট যন্ত্র দরকার হলেও চালু আছে মাত্র ২২১টি। সেগুলোও বড় শহরকেন্দ্রিক। উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের আধুনিক যন্ত্রের সুবিধা বাড়াতে হলে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ প্রয়োজন। বিষয়টি জরুরি বিবেচনার দাবি রাখে ।

বিশ্বের মধ্যে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে ভালো করেছে পেরু, তানজানিয়া ও ভিয়েতনাম। তাদের সাফল্যের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় অঙ্গীকার, জনঅংশগ্রহণ, দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সম্মিলন। দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে আমাদের দেশেও  যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসক ও রোগীর সুসমন্বিত প্রয়াসের পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও আবশ্যক। চিকিৎসককে রোগীদের এ রোগ সম্পর্কে ভালো ধারণা দিতে হবে। এ রোগের চিকিৎসার সময় ঠিকমতো চিকিৎসা না নেয়ার পরিণাম, চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার গুরুত্ব ইত্যাদি ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। রোগীকে নিয়মিতভাবে মাঠকর্মীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার, যাতে তারা চিকিৎসা প্রক্রিয়া থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন না হয়। ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে সচেতনতা বাড়ানো ও যক্ষ্মার চিকিৎসায় ব্র্যাক নিয়োজিত রয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে অন্য এনজিওগুলোকে এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। সচেতনতার ক্ষেত্রে স্থানীয় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত প্রচেষ্টায় সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে উপজেলা পর্যায়ে যক্ষ্মার বিস্তার রোধ কঠিন নয়। এটিই এখন জরুরি।