গুরুতর কোনো সহিংসতা ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গভীরে প্রোথিত সংকটগুলো এখনো কাটেনি। ভোট চুরির অভিযোগ, ভোট কেনা, কেন্দ্র দখল কিংবা কারচুপির অভিযোগ ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অনেক ভোটার নিজ নিজ কেন্দ্রে গিয়েও ভোটার তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাননি বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ করেছেন। সব অভিযোগ যে নির্বাচন কমিশন আমলে নিয়েছে, এমনও নয়। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের আবহে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অনেকেই ন্যায্য প্রতিযোগিতা নয়, বরং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ আমরা একটি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছি বটে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখনো তার ঐতিহাসিক সংকট থেকে মুক্ত নয়।
একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা, অধিকার এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ঔপনিবেশিক শোষণের দীর্ঘ ছায়া বহন করে এসেছে এবং নিজেকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের শ্রমবাজারে পরিণত করতে বাধ্য হয়েছে। এ বাস্তবতায় দেশীয় পুঁজির দখলকে কেন্দ্র করে বহুমুখী রাজনৈতিক লড়াই চলতে থাকে, আর ‘জনগণ’ নামক ধারণাটিকে সামনে রেখে নাগরিকের প্রকৃত প্রয়োজন মেটানো হয়ে ওঠে অত্যন্ত কঠিন। কর্মসংস্থান থাকলেও আয়ের নিরাপত্তাহীনতা আমাদের তাড়িত করে, ফলে রাজনীতি কিংবা সরকারি চাকরি অনেকের কাছে একটি নিশ্চিত জীবনের পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের সংকট এখানেই। প্রতিনিধিরা ক্ষমতা প্রাপ্তির পর প্রায়ই নিজেদের জীবনমান উন্নয়নেই অধিক মনোযোগী হয়ে পড়েন, আর প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় কার্যকর প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি এ সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। এ বাস্তবতার সমাধান যেমন শাহবাগ বনাম শাপলা চত্বরের প্রতীকী দ্বন্দ্বে নেই; তেমনই লিবারেল এলিটদের সীমিত পরিসরের তর্কেও তার সমাধান মিলবে না।
একদিকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ধর্মীয় আবেগ ও পরকালীন প্রতিশ্রুতির ভাষ্যে প্রান্তিক তরুণদের সংগঠিত করা, অন্যদিকে আরাম-আয়েশে অভ্যস্ত ধনী উদারপন্থী গোষ্ঠীর ন্যূনতম নাগরিক দায়বদ্ধতার অভাব—এ দুইয়ের মধ্যকার ফাঁক ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। এ বিভাজন কমানো এখন বিজয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষের দায়িত্ব।
বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের পথে স্থিতিশীল রাখতে হলে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে আমূল সংস্কার করা ছাড়া বিকল্প নেই। নাগরিকের মৌলিক অধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জলবায়ু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যদি ইসলাম-সেক্যুলার মেরুকরণকে গৌণ করা যায়, তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার টিকে থাকার বাস্তব ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
আমাদের সমাজে সহিংসতাকে ভাষার ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখার রাজনৈতিক পরিপক্বতা এখনো গড়ে ওঠেনি। ‘হাত থাকতে মুখে কী?’—প্রবাদ সমাজে বিদ্যমান রেখে কি নির্বাচনকালীন সহিংসতা দূর করা সম্ভব?
শিক্ষা ব্যবস্থায় সহনশীলতা, মতভিন্নতার স্বীকৃতি এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার চর্চা অনুপস্থিত থাকলে গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত পূরণ হয় না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলিত রেখে বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
এ প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘পুরনো বিএনপি’ না হয়ে ওঠা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটির প্রতি যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল ক্ষমতা অর্জনের নয়, বরং একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে সমঝোতা কিংবা নারী অধিকার প্রশ্নে আপস করলে সেই প্রত্যাশা দ্রুত ক্ষয় হবে। নাগরিক অধিকারের পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন, তাদের আস্থা ধরে রাখতে হলে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে যে ক্ষমতা মানেই লুটপাটের পুনরাবৃত্তি নয়।
একই সঙ্গে ১১ দলীয় জোট রাজনীতির বাস্তবতা, ভিন্নমুখী আদর্শ এবং সংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির চাপের মধ্যেও দলটিকে বিচক্ষণতা ও সৌজন্যের পরিচয় দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেড়ে ওঠা মব-সংস্কৃতি ও তার পৃষ্ঠপোষকদের মোকাবেলায় তাদের অবস্থানও স্পষ্ট করতে হবে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিক আস্থার ধারাবাহিক নির্মাণের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ সেই নির্মাণপর্বের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। হাজারো শহীদের রক্ত আর আজীবন পঙ্গুত্ববরণ করা গণ-অভ্যুত্থানের সৈনিকদের মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে কি এই নতুন সংসদ?
অলিউর সান: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য ও প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)










