গ্যাস অফুরন্ত সম্পদ নয়, সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যবান এ প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। এজন্য মজুদ থাকা গ্যাসের সুষম বণ্টন এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানির সহযোগিতা নেয়া হলেও এক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির। তাই গ্যাস মজুদের পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কোম্পানিগুলোকে প্রস্তুত হতে হবে। কেননা আমাদের গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে—এটি নতুন কোনো খবর নয়, সে হিসেবে গ্যাস নিয়ে যে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন, সেটি প্রণয়ন ও বিন্যাসের এখনই উপযুক্ত সময়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মোট স্থানীয় সরবরাহের ৬০ শতাংশের বেশি সরবরাহ হচ্ছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে। বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানিটির পরিচালিত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে মজুদ আগের চেয়ে কমে এসেছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বর্তমান মাত্রায় অব্যাহত থাকলে আগামী দু-তিন বছরের মধ্যেই শেভরনের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার কথা। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেননা জাতীয় গ্রিডে স্থানীয় সরবরাহের অর্ধেকেরও বেশি শেভরনের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসছে। বর্তমানে বাড়তি সরবরাহের কারণে তাদের মজুদও কমে এসেছে। দেশে গ্যাস মজুদের অর্ধেকেরও বেশি স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনাধীন গ্যাসক্ষেত্রে রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্থানীয় কোম্পানিগুলো সেভাবে সরবরাহ বাড়াতে সক্ষম হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের গত বছরের নভেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৬টি গ্যাসক্ষেত্রের আওতায় সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফসিএল)। এছাড়া বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড, শেভরন ও তাল্লোর কাছে গ্যাস মজুদ রয়েছে। তবে পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উত্তোলনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কম মজুদ নিয়েও শেভরন উত্তোলনের শীর্ষে রয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি গ্যাস মজুদ নিয়ে কম গ্যাস উত্তোলন করছে এসজিএফসিএল। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন কোম্পানিগুলোর মধ্যেও এসজিএফসিএল সবচেয়ে কম উত্তোলন করছে।
এভাবে গ্যাস উত্তোলনে দেশী কোম্পানির ভূমিকা সীমিত হওয়ায় আগামীতে গ্যাস সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও ভবিষ্যতে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়াতে সিলেট গ্যাসফিল্ডের পরিকল্পনার বিষয়ে সাতটি কূপের ড্রিলিং ও সাতটি কূপের ওয়ার্কওভারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কূপ খননে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) পাশাপাশি চীনের সিনোপ্যাক কাজ করবে। এরই মধ্যে সিনোপ্যাক থেকে রিগ ভাড়ার চুক্তিও হয়ে গেছে বলে গ্যাসফিল্ড কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন কোম্পানিগুলো দাবি করছে, শেভরনের মজুদ গ্যাস শেষ হতে এখনো পাঁচ-ছয় বছর সময় লাগবে। তাদের সরবরাহ একেবারে নিঃশেষ হবে না। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ পর্যায়ক্রমে কমবে। এ সময়ের মধ্যে অন্য কোম্পানিগুলোর পরিচালনাধীন ক্ষেত্র থেকে গ্রিডে নতুন গ্যাস যুক্ত হবে। পাশাপাশি নতুন কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। তবে নতুন গ্যাস কূপ খননের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সময়সাপেক্ষ কাজ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এজন্য কমপক্ষে দুই বছর সময় প্রয়োজন। তবে কূপ এলাকা আগেই চিহ্নিত করা থাকলে ও ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা না থাকলে এ সময় কিছুটা কম লাগতে পারে। এক্ষেত্রে সিলেট গ্যাসফিল্ড বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছে বলা যায়, তারা কূপ খননে বাপেক্সের পাশাপাশি বিদেশী একটি কোম্পানিকে কাজে লাগানোর কথা জানিয়েছে। কিন্তু এর পরও জাতীয় গ্রিডে শেভরনের সরবরাহ কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘাটতি পূরণের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাচ্ছে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পাশাপাশি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়েও অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান পাওয়া যাবে না। পরিত্যক্ত গ্যাস কূপে অনুসন্ধান এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে গ্যাসের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করাও নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব হবে না। এজন্য গ্যাস মজুদ ও গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন নিরবচ্ছিন্ন রাখার কোনো বিকল্প নেই। বড় ধরনের সংকট যেন না হয় সেজন্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পনাই দৃশ্যমান নয়। এর ফলে মহাসংকট চলে এলে তখন বেশ বিপর্যয়ই দেখা দেবে। কারণ গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। শিল্প-কারখানাসহ দেশের সামগ্রিক উৎপাদন খাতে এর প্রভাব পড়বে। বর্তমানে গৃহস্থালিতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া গ্যাস সরবরাহে চাপ কম থাকার বিষয়টিও আবাসিক গ্রাহকদের ভোগাচ্ছে। ‘শিল্পে প্রাকৃতিক গ্যাস, গৃহস্থালিতে বিকল্প জ্বালানি’—এ নীতিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির কথা বলে আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মাধ্যমে গৃহস্থালিতে রান্নার কাজ করা হতো, সে এলপিজি গ্যাসের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের কারণে এলএনজির মাধ্যমে গ্যাস সংকট মেটানো এতদিন সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে জ্বালানি পণ্যটির মূল্য নিম্নমুখী থাকায় স্পট মার্কেট থেকে আবারো এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তবে থাইল্যান্ড ও ভারত আবারো স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এ অবস্থায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যটির মূল্য আবারো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে গ্যাস রেশনিংয়ের পথে হাঁটতে হয়। যেহেতু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, তাই দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকার এখন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে জোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। এতদিন ধরে বিদেশী কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা যেভাবে তৈরি হয়েছিল, সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্যই দেশী কোম্পানির গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়াতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ভিত্তিতে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিদেশী কোম্পানির সহযোগিতা নেয়াসহ আমদানিনির্ভর এলএনজির ক্ষেত্রেও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়া গ্যাস সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।










