চাহিদা অনুযায়ী প্রাকৃতিক গ্যাস মিলছে না, তার ওপর বাড়ানো হয়েছে দাম। বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দামও। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ডলার মূল্যও বাড়তির দিকে। সব মিলিয়ে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। মূল্যস্ফীতির হার এখনো উচ্চ। উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে গলদঘর্ম। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, অন্তত চলতি বছর বিদ্যুতে সহনীয় পর্যায়ে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হোক। ব্যবসায়ীদের দাবি যথার্থ। এ সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। শিল্পে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। উদ্যোক্তারা নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছেন। একদিকে স্থানীয় বাজারে স্বল্প মূল্যে পণ্য সরবরাহ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে রফতানি বাড়ানো। শিল্প উৎপাদনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বড় ভূমিকা রাখে বিধায় একে সহনীয় পর্যায়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ভুলে গেলে চলবে না দেশের শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে সস্তায় সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ।
এক যুগের বেশি সময় ধরে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার জন্য তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। বেসরকারিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কুইক রেন্টাল ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগও নিয়েছে। বিনা প্রতিযোগিতায় বেসরকারি খাতকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি এবং সেখান থেকে সরকারের অধিক দামে বিদ্যুৎ কেনা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। উল্টো এগুলো নিয়ে যাতে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলা না যায়, এজন্য দায়মুক্তির ব্যবস্থা করেছে। কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, তাতেও সরকারকে বড় ধরনের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে। বর্তমানে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা খুব একটা না থাকলেও সরকার সেগুলো চালু রেখেছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হলেও দেশের ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতার অভাব বড় সমস্যা হয়ে ধরা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদিত বিদ্যুতের চেয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বেশি থাকতে হয়। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে সরবরাহ ব্যবস্থার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬০ শতাংশ বাড়বে। তখন খরচ ও ভর্তুকি আরো বাড়বে এবং এর দায় গিয়ে পড়বে শিল্প খাতসহ সাধারণ মানুষের ওপর। ভুল পরিকল্পনাই বিদ্যুৎ খাতে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কোনো বাছবিচার করেনি। কয়লা, গ্যাস, তেল, এলপিজি যেভাবে পেরেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। পাশাপাশি আমদানিও করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পর তা যে যথাযথভাবে সরবরাহ, বিতরণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে সেদিকে খুব একটা দৃষ্টি দেয়নি। অনেক সময় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সমন্বয় করার জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ ধরনের অপরিকল্পিত উৎপাদনে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান ও ভর্তুকি
দিতে হচ্ছে। আর লোকসান পোষানোর জন্য বিদ্যুতের যথেচ্ছ দাম বাড়ানো হচ্ছে। এমনকি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অর্থাৎ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) এড়িয়ে সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। এর জন্য আইন সংশোধনেও পিছপা হয়নি সরকার। এতে বিইআরসির ক্ষমতা খর্ব হয়েছে।
বিপুল ভর্তুকি কমাতে সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এখন দফায় দফায় বাড়াচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মাসে মাসে দর সমন্বয় হতে পারে। দাম বাড়াতে এখন আর গণশুনানির প্রয়োজন হচ্ছে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। ভর্তুকি না দিলে বিদ্যুতের দাম পড়বে ১৪ দশমিক ২৯ টাকা। গত অর্থবছরও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল ৮ টাকা ৯৬ পয়সা এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় ছিল ভর্তুকি বাদে ১১ টাকা ২৬ পয়সা। বর্তমানে ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয় ৭ টাকা ১৩ পয়সায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দুই বছর ধরে অস্বাভাবিক বাড়ছে। এতে ঘাটতি বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুতের দামের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সময় এটা নয়। সে চেষ্টা হলে তা হবে আত্মঘাতী। সরকারকে তা বুঝতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়লে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে জনজীবনের ওপর।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশেরই সমস্যা নয়, ইউরোপের দেশগুলো বিষয়টি নিয়ে মারাত্মক উদ্বিগ্ন। দেশগুলো জনগণ ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বিবেচনায় সব নিয়ম উপেক্ষা করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের সরকার বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি প্রদান করছে। এ কারণে দেশটিতে বিদ্যুতের গড় দাম প্রতি কিলোওয়াট আওয়ার শূন্য দশমিক ০৫৯৫ ইউরো। হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়ায় বিদ্যুতের দাম প্রতি কিলোওয়াট আওয়ার যথাক্রমে শূন্য দশমিক ০৯৪৮ ও শূন্য দশমিক ১০৯৩ ইউরো। তবে জার্মানি, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স সরকার বিদ্যুতে ভর্তুকি না দিয়ে দাম বাড়ানোর পথেই হেঁটেছে। দেশগুলো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরাসরি ক্যাশ ট্রান্সফারের মাধ্যমে জনগণের এ ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব প্রশমনে সরকারের অন্য কোনো টুলস (যেমন রেশনিং বা নগদ অর্থ প্রদান) কার্যকর নেই। তাই বিদ্যুতের মূল্য কমিয়ে রাখাই শ্রেয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে সরকার কেন অধিক দামে বিদ্যুৎ কিনে বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাবে। যৌক্তিক প্রশ্ন বটে। তবে সরকারের ভুল পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের কারণে উদ্ভূত দায় জনগণ কেন বহন করবে? দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কোটি কোটি টাকার অপচয় বন্ধ করতে হবে। কারো সংশয় নেই যে এ খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে ব্যয় অনেক কমে আসবে। তখন স্বল্প ভর্তুকিতে বা বিনা ভর্তুকিতেই বিদ্যুতের জোগান দিতে পারবে সরকার। তখন এত ঘন ঘন দাম বাড়াতেও হবে না। বিশেষজ্ঞরা বারবার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে দিলেও সেগুলো সংশোধনে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না, যা হতাশাজনক। ফলে স্বল্প মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা নিয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভুল পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং এ খাতে বিদ্যমান চুরি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশীয় ও বিদেশী উৎসের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে দেশের জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কীভাবে কমানো যায় সেদিকে নজর দেয়া উচিত। বিদ্যুৎ বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাড়তি ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রয়োজনে ভ্যাট কমিয়ে দিয়ে হলেও বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে বেতন বৃদ্ধির দাবিও উঠবে। কীভাবে বহুমুখী অভিঘাত মোকাবেলা করবে তারা। মানুষের ওপর নতুন চাপ না দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে যে চুরি, অপচয় ও কমিশন বাণিজ্য চলছে, তা বন্ধ করা হতো গণমুখী সিদ্ধান্ত। সরকারের উচিত হবে দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে চুরি-অপচয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। তাহলে বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখা সম্ভব। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে রফতানি খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, সে সময় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সরকারের এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে শিল্প, উৎপাদন সর্বোপরি অর্থনীতি আরো চাপে পড়ে।










