বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রা আজ বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য উদাহরণ। অল্প সময়ের মধ্যে কৃষিনির্ভর দরিদ্র দেশ থেকে রফতানিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ আমাদের গৌরবের বিষয়। এ রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি বাণিজ্য, যা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই বাড়াচ্ছে না, বরং উন্নয়নের নতুন দিগন্তও উন্মোচন করছে।

স্বাধীনতার পর শূন্য থেকে শুরু করা বাংলাদেশ আশির দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। আজ আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। ২০২৪ সালে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন এসেছে শুধু পোশাক খাত থেকে। এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান পেয়েছে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই নারী। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক পণ্য যাচ্ছে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী ১৭০টিরও বেশি দেশে কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক জীবন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে।

তবে অগ্রযাত্রার পথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও জাপানসহ অনেক বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের রফতানির ৮০ শতাংশ পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাস বা শ্রম ও পরিবেশমান-সংক্রান্ত কঠোর শর্ত আমাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও আফ্রিকার কিছু দেশ তুলনামূলক কম খরচে পোশাক উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলছে।

তবুও বাংলাদেশের সামনে বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খোলা। বর্তমানে আইটি সেবা রফতানি প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যালস খাত এরই মধ্যে ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষিজাত পণ্য যেমন হিমায়িত মাছ, সবজি, ফলমূল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি থেকে এসেছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরভিত্তিক সামুদ্রিক সম্পদকে কেন্দ্র করে ব্লু ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য নতুন বৈদেশিক আয়ের উৎস হতে পারে।

এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রথমত, রফতানি বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে পোশাকের পাশাপাশি আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে উৎসাহ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক বন্দর, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য, কারণ বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৯তম। তৃতীয়ত, কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) এগিয়ে নিতে হবে।

একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে; তাদের দক্ষতাকে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও বিশ্বমানের শিল্প ক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে মানানসই করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি টেকসই উৎপাদনের ধারাকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক গ্রিন ফ্যাক্টরি সার্টিফায়েড পোশাক কারখানার অধিকারী, যা আমাদের টেকসই বাণিজ্যের জন্য বিশেষ শক্তি।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা প্রমাণ করেছে—বাণিজ্যই আমাদের প্রকৃত শক্তি। রফতানি ও বৈদেশিক আয়ের এ ধারা টেকসই রাখতে পারলে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্রেও আরো শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হবে। সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে পারলে নিঃসন্দেহে বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের সামনে অগ্রগতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

ড. মো. নেয়ামুল ইসলাম: আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ