স্বাস্থ্য
খাত নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন কভিড ঘিরে, কারণ বিষয়টি এত বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে স্বাস্থ্য সংকট এখন অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রথম দিকে ধনী দেশগুলোকে কভিড বেশ বেকায়দায় ফেলেছিল। তবে যেহেতু তাদের অর্থ আছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গরিব ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো ব্যাপক
অনিশ্চয়তায় ভুগছে এবং বাংলাদেশও এর মধ্যে একটি। আমরা এ থেকে পরিত্রাণ কী করে পাব? কেউ বলছেন স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে, কেউ বলছেন দুর্নীতি কমাতে হবে, আবার কেউবা বলছেন ৪০ কোটি টিকা দরকার হবে কেবল কভিড মোকাবেলার জন্য। আবার বলা হয়েছে, দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় আনতে আরো চার বছর লেগে যাবে। সেদিন আমাদের একজন মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তি বললেন, শুধু তামাকের কারণে দেশে বহু লোকের মৃত্যু হয়, আমরা সেটা তো বলছি না, আর কভিডের কারণে আজ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে মাত্র ১৩ হাজারের কিছু বেশি, তাহলে এটাকে এত বড় করে দেখার কী আছে! এগুলোর কী ব্যাখ্যা আছে জানি না, তবে আমরা যে ভালো নেই, এটা সবাই জানেন এবং এ থেকে কবে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে আর কবেই-বা আমরা কভিড-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারব, তা কেউই বলতে পারছেন না।
এরই মধ্যে এবারের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে আমরা নতুন
সংযোজন দেখতে পেলাম। তা হলো নতুন ভ্যারিয়েন্ট, যা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এসেছে। আবার শুনছি বিভিন্ন রঙের ফাঙ্গাস, আবার সীমান্ত এলাকায় কভিডের বিশেষ আক্রমণ। এ পর্যন্ত আমরা দেখে এসেছিলাম কভিড আক্রান্ত এলাকার মধ্যে রাজধানী শহর ঢাকা সবার শীর্ষে; কিন্তু না, এখন অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে বেশি উপকরণ ঢাকাতেই, ঢাকার বাইরে স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রস্তুতি আরো খারাপ। তাহলে মানুষ কি বিনা চিকিৎসায়ই মারা যাবে? এ থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যাবে?
ধরে নেয়া হয়েছিল এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, কিন্তু তেমনটি হয়নি; বরং এ বাজেটের খাতটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা, বিতর্ক হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে পুরো বাজেটের খাতভিত্তিক বরাদ্দে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি (৪.২৯%) টাকা,
যা সংশোধিত (২০-২১-এর) বাজেটে ছিল ২৫ হাজার ৭৩৪ কোটি (৪.৭৭%) টাকা।
এছাড়া অবশ্য মেডিকেল ডিভাইস আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎপাদনকারীকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাজেট বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রাক্কলিত দরিদ্র ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অতিদরিদ্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, যারা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকে। অন্যান্য সূত্রে অবশ্য দেখা যায়, প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পৌঁছে গেছে। এদের খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে বাজেটে অবশ্য বেশকিছু বক্তব্য রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়নে দুর্বলতা সর্বতো স্বীকৃত।
সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা যায়, বছরে প্রায় ৫০ লাখ লোক দরিদ্র হচ্ছে কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য। এটা অবশ্যই ভেবে দেখার বিষয় যে দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার সবার, অথচ আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৭২ শতাংশ যার যার নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। তাহলে মোট দরিদ্র কত এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাই-বা কীভাবে হবে?
বাজেট বক্তৃতায় সরকারের সফল উদ্যোগের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় ছয় কোটি নাগরিক এবং প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান সরাসরি উপকৃত হয়েছে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনার ফলে। এসব উদ্যোগের কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় সফল শীর্ষ নারী নেত্রীদের অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করা
হয়েছে। বাজেটে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের টিকা সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কভিডের প্রভাব এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে—এ লক্ষ্যে টিকা প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া বাজেটের অষ্টম অধ্যায়ে খাতভিত্তিক কৌশল, কর্মপরিধি ও সম্পদ সঞ্চালন সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনায় প্যারা (৬৩)-তে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় ও জনজীবনের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর্যায়ে গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে এবং যার জন্য লকডাউন বলবৎ আছে। লকডাউনের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটা চলছে ঢিলেঢালাভাবে, তার মাঝে রয়েছে জীবন ও জীবিকার মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে তা নিয়ে বিতর্ক। কাজেই সরকার নাজেহাল।
সরকার দেশে সব নাগরিককে বিনা মূল্যে টিকা প্রদান নিশ্চিত করতে চায় এবং এজন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডোজ টিকা সংগ্রহের জন্য যত টাকাই লাগুক, সরকার তা প্রদান করবে এবং সে লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে (প্যারা ৭১) বলা হয়েছে। এছাড়া প্যারা ৭৫-এর বক্তব্য মতে, বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাসপাতালভিত্তিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে এবং তাদের আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার উদ্দেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি পাইলট শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় মোট ২০ হাজার ৯৩১ জন সদস্য সেবা গ্রহণ করেছেন। ক্রমান্বয়ে এ কর্মসূচি আরো বাড়ানো হবে বলে বাজেটে বলা হয়েছে। আশা করব এ সেবা যত দ্রুত সম্ভব প্রান্তজনের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।
বাস্তবায়িত বিষয়ের মধ্যে সমন্বিত বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মতো আগামী অর্থবছরেরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে। বিজ্ঞানের নতুন ধারা ও কলা-কৌশল উদ্ভাবনের জন্য ফেলোশিপ এবং অনুদান প্রদান অব্যাহত রাখার জন্য এ তহবিল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণার জন্য এ তহবিল থেকে বরাদ্দ হতে পারে। এ ধরনের বরাদ্দের কথা বাজেটে বলা হলেও এর অনেকটাই বাস্তবায়ন হয় না বিভিন্ন জটিল বাস্তবায়ন ব্যবস্থার জন্য। এ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও এ রকম হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। এজন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন তৈরি এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি হওয়া একান্ত দরকার।
বাজেটে যে ব্যবস্থার কথাই বলা হোক না কেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, কভিড অন্তত এ জায়গায় একটা সাড়া ফেলেছে। যেমন আমাদের তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে রানা প্লাজার ঘটনার পর এক্ষেত্রে শ্রমিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে নানা রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। আমরা বর্তমানে কভিড-দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য-দারিদ্র্য, বেকার-দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন রকম দারিদ্র্যের কথা শুনছি। দরিদ্রের সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি মহলে মতামতের বিপুল পার্থক্য
রয়েছে, সেই সঙ্গে আমাদের তথ্য-দারিদ্র্যের বিষয়টিও এসে যায়। আমরা তাহলে কত রকম দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করব? এখন আমাদের প্রধান বিষয় কভিড-দারিদ্র্য। এ বিষয়ে বাজেটে আরো সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান এবং তথ্য থাকা দরকার ছিল, স্বাস্থ্য খাতে আরো গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। সরকার বিভিন্ন হাসপাতাল স্থাপনে কর অবকাশ ঘোষণা করেছে। এটা বিবেচনায় আনতে হবে যে কর অবকাশই হাসপাতাল স্থাপনের একমাত্র সহায়ক নীতিমালা নয়। এর সঙ্গে আরো অনেক বিধিমূলক বিষয় আছে, যা নিশ্চিত না হলে শহরের বাইরে দরকারি হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হবে না।
অনেকে বলে থাকেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা থাকতে হবে, সরকারি ডাক্তারের সঙ্গে দক্ষ সাপোর্টিং স্টাফ থাকতে হবে। তা না হলে ডাক্তার সঠিকভাবে কাজ করতে পারবেন না। সর্বোপরি
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংযোগ ও সমন্বয় থাকা দরকার। যেমন আমরা এখন ক্রমাগত হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান, লকডাউনের নিয়মকানুন মেনে চলার কথা বলছি। এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমাদের যুবসমাজকে স্বাস্থ্যসচেতনতা দিয়ে শিক্ষিত করার এখনই সময়, যাতে অন্তত স্বাস্থ্য-দারিদ্র্য কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা যায়।
ফেরদাউস আরা বেগম: প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)










