১. অত্যন্ত
ঘটনাবহুল এবং ব্যাপকভাবে আলোচিত ব্যাপক অর্জন ও অনেক শঙ্কা পেরিয়ে ২০১৯ সাল বিদায় নিল।
বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের পথ ধরেই ২০২০ সালের কর্মঘটনার নির্ঘণ্ট প্রস্তুত করে বাস্তবায়নের
কঠিন রাস্তায় উঠতে হবে।
২. অত্যুক্তির
নিন্দার ভয় ছাড়াই একমত হওয়া যাবে যে, পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্য—সিংহভাগ তরুণই ২০১৯ সালে অর্থনীতির পরিস্থিতিতে
(৮০ শতাংশ) এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে
(৫৩.৭ শতাংশ) সন্তুষ্ট (১২ পৌষ ২৭ ডিসেম্বর),
যা ক্রমবর্ধমান। তবে নিরাপত্তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।
প্রতি পাঁচ তরুণের চারজনই জীবনের লক্ষ্য নিয়ে চিন্তিত। মনে রাখা প্রয়োজন,
২০১৯ সালের প্রাক্কলন ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক
আয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়েছে,
২০২৪ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই অংক অর্থাৎ ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে আসা
রেমিট্যান্স বহির্গামী রেমিট্যান্সের চেয়ে বেশি বলে মাথাপিছু জিএনআই মাথাপিছু জিডিপির
চেয়ে বেশি হয়। ২০২৪ সালে মাথাপিছু জিএনআই ২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার হওয়ারই কথা। আর
বার্ষিক নিট প্রবৃদ্ধি (বার্ষিক জিএনআই প্রবৃদ্ধি থেকে বার্ষিক জনসংখ্যা
বৃদ্ধির হার বাদ দিলে) ৯ শতাংশ হবে। একটি অব্যর্থ লগারিদমিক ফর্মুলা অনুসারে,
এ পরিস্থিতিতে মাথাপিছু আয় প্রতি ৭ দশমিক ৫ বছরে
দ্বিগুণ হবে অর্থাৎ ২০৩১
সালের জুনে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ৫ হাজার মার্কিন ডলার এবং ২০৩৯ সালে ১০ হাজার
মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। সুতরাং ২০৪১ সালে বিশ্বে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতি বাংলাদেশ
একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত হবে বলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অর্জনযোগ্য বটে।
৩. বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, যাতে বিশ্বব্যাংকেরও সায় আছে,
বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে ২০ দশমিক
২ শতাংশ লোক বাস করে। ১৯৭২ সালে ৭ দশমিক ৫ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত ৮০ শতাংশ
(৬ কোটি) তথা চার-পঞ্চমাংশ মানুষ বাস করত আর এখন ১৬ দশমিক ৫ কোটি মানুষের
মধ্যে ৩ দশমিক ৫ কোটি তথা এক-পঞ্চমাংশ
লোক বাস করে। বিশাল অগ্রগতি নিঃসন্দেহে।
৪. ২০১৯
সালে রেমিট্যান্স ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
এদিকে শিল্প খাতের ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ইতিবাচক আশার দীপালি হয়ে যুক্ত হয়েছে
নির্মাণ খাতের ঘুরে দাঁড়ানো। সরকারি নীতি কৌশল, অত্যন্ত যুক্তিসংগত কম সুদে সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকমণ্ডলীর
জন্য আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে গৃহনির্মাণ ঋণ এখন এ খাতকে চাঙ্গা করেছে। আর নির্মাণ
খাতের প্রবৃদ্ধি সামষ্টিক আয়ের প্রাক্কলিত ৮ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন এমনকি ছাড়িয়ে যাওয়াকে
সাহায্য করবে—ঘটবে
কর্মসংস্থান। পৃথিবীর তিনটি শীর্ষ দ্রুতগতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে বহাল থাকবে
বাংলাদেশের অবস্থান।
৫. বাংলাদেশের
গুণী শীর্ষস্থানীয় মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর মেহতাব খানম বলেছেন,
মা-বাবা যেন উদ্যোগ নিয়ে টানাপড়েনে থাকা কিশোর বয়সী
(মানসিক পরিবর্তন, সামাজিক অবস্থানে অদলবদল ও বিপরীত লিঙ্গে আকর্ষণ
বোধ করা) সন্তানদের
সঙ্গে বিশ্বস্ত সহজ-সরল সখ্য
গড়ে তোলেন। নইলে হঠাৎ বিত্তবান
এমনকি মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মা-বাবার
সঙ্গে কিশোর, যুবক
ও যুবনারীদের দূরত্ব বেড়ে গিয়ে তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও ধর্মান্ধতার পথে নিয়ে যেতে পারে।
৬. ২০২০
সালে বাংলাদেশ যেসব বড় বাধার সম্মুখীন হবে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়ন। নইলে ২০১৯-২০
সালের বাজেটে বলা ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত তিন কোটি চাকরি সৃষ্টির আশা ভেস্তে যাবে।
সমকাল ১০ পৌষ ১৪২৬ মোতাবেক ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ জানাচ্ছে যে এমএ পাস ৩৪ শতাংশ বেকার;
সম্ভবত এরা আংশিক বেকার অর্থাৎ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী যে কর্ম তাদের প্রাপ্য,
এর চেয়ে অনেক নিম্নস্থানীয় কাজে তারা নিয়োজিত। প্রফেসর
নজরুল ইসলাম ও ড. জায়েদ
বখত যথার্থই বলেছেন, চাকরির
সঙ্গে শিক্ষার মিল নেই। একে তো বিষয় যুগোপযোগী নয়, তাই আবার লেখাপড়া অনেকটাই তাত্ত্বিক ও মুখস্থধর্মী।
সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের মূল্যায়ন, উচ্চশিক্ষার মান তলানিতে পৌঁছে গেছে। তবে রাশেদা
কে. চৌধুরীর
কথামতো শুধু বাড়তি বরাদ্দে মান বাড়ানো যাবে বলে মনে হয় না। লক্ষ করা গেছে শ্রীলংকার
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় দুপুরের খাবার, দুধ এবং স্কুল ইউনিফর্ম দেয়ার ফলে অনেক আগেই দেশটি
ভালো উচ্চমানসম্পন্ন ১০০ শতাংশ হার অর্জন করেছিল। আমাদেরও লাঞ্চ প্রোগ্রাম উপকারে আসছে।
ঝরে পড়ার হার কমেছে। তবে বিশ্বব্যাংক ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা
কে. চৌধুরীর
মূল্যায়ন হচ্ছে, মাধ্যমিকে
অর্ধেকের বেশি ছাত্রছাত্রী ক্লাসেই যায় না এবং যারা যায়,
তাদের অর্ধেকের বেশি কিছুই শেখে না। অনেকেই মনে করেন,
ছেলেমেয়েরা না ঘরে মায়ামমতা পায়,
না স্কুলে শিক্ষকের স্নেহের ছোঁয়া বা খেলাধুলা ও
সাংস্কৃতিক চর্চার সৃজনশীলতা দেখে।
৭. পুরো
শিক্ষা ব্যবস্থায় আপাতদৃষ্টিতে অজনপ্রিয় হলেও একটি আমূল সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক
ও মাধ্যমিক উন্নত দেশের মতো অঞ্চল বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি করা;
স্কুল ইউনিফর্ম চালু করা;
ব্যক্তিগত যানবাহন নয়,
বরং প্রয়োজন হলে স্কুল-কলেজের বাসে যাতায়াত;
খেলাধুলা ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ;
বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে শিক্ষকমণ্ডলীকে টিউশন
থেকে ক্লাসমুখী করা; নোটবই/গাইড ও কোচিং সেন্টারের দৃঢ়হস্ত নিয়ন্ত্রণ তথা কালক্রমে
বন্ধ করা না হলে দেশের দৃষ্টিনন্দন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং হূদয় উষ্ণ করা সামাজিক
অগ্রযাত্রা (গড় বয়স
৭৩ বছর ও অন্যান্য) ধরে রাখা,
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না-ও হতে পারে। ভারতে আগামী বছর থেকে এসএসসি পরীক্ষা
বোর্ড পর্যায়ে আর হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আমাদের পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর
বোর্ড পরীক্ষা অভিভাবককে বিষাদময় এবং ছাত্রছাত্রীদের তোতাপাখির মুখস্থবিদ্যার দিকে
নিয়ে যাচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে
বস্তুনিষ্ঠ নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। মাধ্যমিকে বৃত্তিমূলক এবং উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তিশিক্ষা
বিষয়ে সদাশয় সরকারের যে সিদ্ধান্ত রয়েছে, তা কৃতসংকল্পতার সঙ্গে পিপিপি সহযোগে বাস্তবায়ন করা
সমীচীন হবে। লেখাপড়াকে ব্যবহারিক-প্রায়োগিক
করতেই হবে এবং সেজন্য চাকরিদানকারী করপোরেট ও শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে
নিবিড় যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের
মধ্যে পালাক্রমে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদলে কো-অপারেটিভ শিক্ষার প্রচলন করা সঠিক হবে। শীতকালে উচ্চশিক্ষার
বিদার্থীদের এক সেমিস্টারের জন্য পল্লীবাংলার কিষাণ-কিষাণীর তত্ত্বাবধানে পাঠানোর কথা ভাবা যেতে পারে।
৮. রাষ্ট্রনীতি
ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশের উন্মুক্ত অবস্থান ১৯৯৭ সালের এশিয়ান ক্রাইসিস এবং ২০০৭-০৯
সময়কালের অর্থনৈতিক মহামন্দাকালের চেয়ে অনেক বেশি সম্পৃক্ত করেছে। তাই দ্য ফিন্যান্সিয়াল
এক্সপ্রেসের ১২ পৌষ, ২৭ ডিসেম্বর
তারিখের ‘এ গ্র্যাম্পি ২০২০ ফর গ্লোবাল গ্রোথ’-এর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে বেশি করে লাভবান হওয়ার জন্য
আমাদের বেশ ইতিবাচক বিদেশী বিনিয়োগ নীতি এবং তীব্র জমি সমস্যা সমাধানে বিশেষ অর্থনৈতিক
অঞ্চল খুবই সহায়ক হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস জোগান ঠিক হলেও অব্যবস্থাপনা ক্ষতি করতে
পারে। সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মূল্যায়নে আমরা আট ধাপ এগিয়ে কস্ট অব বিজনেস
সূচকে শুভসূচনা করেছি। কৃতসংকল্পতায় যেতে হবে বহুদূর।
৯. দুর্নীতি
ও দীর্ঘসূত্রতা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনেককেই নিরুৎসাহিত করছে। বাংলাদেশ ২০১৭ সালে মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে
টপকে গেছে। ২০২৯ সালে ভারতকেও টপকে যেতে পারে বলে ব্লুমবার্গ,
এইচএসবিসিসহ একাধিক পূর্বাভাস রয়েছে। তবে সম্প্রতি
রফতানি আয়ে ধস চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থযুদ্ধের ফলে চৈনিক বহু কোম্পানি বাংলাদেশের
বদলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া,
তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা
বিনিময় হারে অনমনীয়তা সৃষ্ট টাকার অতি মূল্যায়ন (যা বৈদেশিক মুদ্রায় রফতানি পণ্যের দাম অবমূল্যায়নকারী
দেশের তুলনায় বাড়িয়ে দেয়) রফতানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তৈরি পোশাকে এর প্রভাব
বিশাল; যখনই
ভিয়েতনাম তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে, তখনই বৈদেশিক মুদ্রায় ওই দেশের তৈরি পোশাকের মূল্য
কমে যায়। ক্রেতারা সেই হ্রাসকৃত মূল্য বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের ওপর চাপিয়ে
দেয়। শূন্য ১ শতাংশ আরএমজি ভর্তুকি ও রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনা মাল্টিপল এক্সচেঞ্জ
রেটের ক্ষতিকারক দুর্বল সমাধানে না গিয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে স্থানীয় মুদ্রায় বর্তমান
গতির চেয়ে দ্রুততর অবমূল্যায়ন করা জরুরি। এতে ভোগের আমদানি
(প্রায় ৩০ শতাংশ) কমতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা,
দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপে বস্ত্র শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে
(ব্যাপক সরকারি প্রণোদনার প্রয়োজন হবে)
বছরে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের বস্ত্র আমদানি
কমানো যাবে। লিড টাইম ৪২ দিন থেকে দুদিনে হ্রাস পাবে। রফতানি খাতে বহুমুখীকরণের বিরাট
সুযোগ কাজে লাগানো যায়। বিশ্বমানে উন্নীত করে বিএসটিআইকে বিশ্বময় গ্রহণযোগ্য করে তুলতে
পারলে পুনরায় পরিদর্শনের সময় ও অর্থ অপচয় বাঁচানো যাবে। তাছাড়া মানবসম্পদের সেবার মান
যদি বিএসটিআই বিশ্বমানে করতে পারে, তাহলে রিক্রুটিং এজেন্টদের মধ্যে যারা দুর্বৃত্তায়িত
মধ্যস্বত্বভোগী, তাদের
প্রতাপ কমানো যাবে। প্রমাণিত দক্ষতার পাদুকা, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, মোটরসাইকেল, প্লাস্টিক পণ্য, হিমায়িত কাঁচা মাছের বদলে রান্না করা আকর্ষণীয় মোড়কে
মত্স্য ইত্যাকার ক্ষেত্রে উৎপাদন ও রফতানি বহুমুখীকরণ সম্ভব এবং উচিত। রফতানি পোশাকে
উচ্চমূল্যের ডিজাইন ও বিক্রির বাজারে বহুমুখিতা আনতে হলে বেশকিছু বিনিয়োগ করে নিজস্ব
ডিজাইনের ব্যবস্থা করতে হবে।
১০. ২০১৯
সালে যেসব বিষয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু মোকাবেলায় আংশিক প্রতিকার;
ভবিষ্যতে ব্যাপক প্রতিরোধের শিক্ষাই পাওয়া গেল। ক্যাসিনো
কাণ্ডে দুর্নীতি-সন্ত্রাস
দমনে প্রশংসনীয় শুদ্ধি অভিযান শুরু করা হয়েছে। তার অব্যাহত বিস্তার ও গভীরায়ন কল্যাণপ্রসূ
হবে। গ্রামীণফোন ও রবির সঙ্গে বিরোধ অচিরেই মিটিয়ে না ফেললে অতি কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক
বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। ধর্ষণ ও খুন, ভবন নির্মাণে রডের বদলে বাঁশের ব্যবহার,
কিলোমিটারপ্রতি শতকোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক নির্মাণের
প্রস্তাব, কেমিক্যাল
গুদামসহ সম্ভবত নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, কোনো রকম নিয়োগ নিশ্চয়তা ছাড়া বেপরোয়াভাবে গাড়িচালকদের
দ্বারা ঘন ঘন দুর্ঘটনা এবং রেলের বেহালে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়গুলো আমলে নিয়ে ফেনীর
নুসরাত হত্যার মতো দ্রুত বিচার আইনে প্রমাণিত হলে শাস্তি দেয়া ছাড়াও ২০২০ সালে এ ধরনের
সমস্যার কৃতসংকল্প সমাধান করা সঠিকভাবেই সম্ভব হবে।
১১. আগামীতে
আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশাল কর্মকাণ্ডের সফল পরিসমাপ্তির জন্য বেসামরিক প্রশাসনের
ক্রমবর্ধমান দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। দি ইনডিপেনডেন্ট ১৬ পৌষ,
৩১ ডিসেম্বর যেমনটি বলছে,
১১৫টি অতিরিক্ত সচিবের পদে ৫৮৬ জনের অবস্থান,
৩৪১টি যুগ্ম সচিবের পদের বিপরীতে ৬৭২ জনের অবস্থান
প্রশাসনকে ‘টপ হেভি’ ও ‘ক্যাউটিক’ করে বেসামরিক প্রশাসনের কার্যকারিতা নষ্ট করছে।
পত্রিকাটি বলছে, ‘Due to rampant promotions, many officials were attached to
previous posts causing administrative chaos.’ সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতির অপরিহার্যতা স্বীকার্য
বটে, কিন্তু
কিছুটা ধৈর্য এবং অনেকটা বিজ্ঞ পদক্ষেপ এ অবস্থা থেকে ক্ষিপ্রতর প্রশাসনে যেতে সহায়তা
করতে পারে ২০২০ সালে।
১২. পক্ষান্তরে
পরিকল্পনা কমিশনকে ঢেলে সাজিয়ে শক্তিমান করে অর্থপূর্ণ অথচ অগ্রাধিকারভিত্তিক পরস্পর
সমন্বিত প্রোগ্রাম ও প্রকল্প রচনা এবং প্রকল্প তৈরি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে অধিকতর পারদর্শিতা
সম্পদের সুষম বরাদ্দ ও সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বাড়বে বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা। তার সঙ্গে সুশাসন যুক্ত হয়ে ইনক্রিমেন্টাল
ক্যাপিটাল: আউটপুট
রেশিও কমানো সম্ভব হতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু প্রকল্প অনুমোদন হতেই পারে,
তবে তার সংখ্যা ও প্রকল্প সংখ্যার ভারে বিপর্যস্ত
পরিকল্পিত উন্নয়নের পথ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে ২০২০ সালে বিশেষ দৃষ্টি প্রার্থনীয়। জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর আর সোম-শুক্র কর্মসপ্তাহ শুরুর সময় কি এখনো আসেনি!
১৩. ২০১৮
সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন পলিসি কমিটির তিনটি পরীক্ষায় তথা জিএনআই,
মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের সব কয়টিতেই
ইতিহাস সৃষ্টিকারী একযোগে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭২ সালের অনুন্নত,
১৯৭৪ সাল থেকে স্বল্পোন্নত বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের
কাতারে পদোন্নতি পেয়েছে। এ অবস্থানকে সংরক্ষণ করতে হলে এবং
‘কাউকে পেছনে ফেলা যাবে না’ ঘোষণাকারী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
(এসডিজি) অর্জনে সদাশয় সরকারের প্রশংসনীয় প্রস্তুতিকে বাস্তবে
আনতে হবে। মান্দাতার আমলে গৃহীত ‘ট্রিকল ডাউন’ উন্নয়ন মডেল পাল্টাতে হবে। কারণ এরই মধ্যে বাজার
অর্থনীতিতে দ্রুতগতি প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য উপসর্গ হিসেবে আয়-ব্যয়, সম্পদ ও সুযোগ বৈষম্য দৈত্যাকার রূপ নিয়েছে। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত যে ৪০ শতাংশ লোক,
তাদের কাছে আয় সম্পদ আছে মাত্র ১৪ শতাংশ। আর উচ্চবিত্ত
১০ শতাংশের কাছে আছে ৪০ শতাংশের মতো। অথচ বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ চিহ্নিত সোয়া কোটি
(১২.৫ মিলিয়ন) লোকের হাতে ৫ হাজার মার্কিন ডলারের মাথাপিছু আয় থাকলেও
কর আদায় করা হচ্ছে মাত্র ২২ লাখ (২.২ মিলিয়ন) লোকের কাছ থেকে। সেজন্য কর জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। পৃথিবীতেও খুবই নিচের দিকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ পর্যন্ত কর
আদায় পরিস্থিতি মোটেও আশাপ্রদ নয়। মূসকের আদায়ও ভালো হচ্ছে না,
কারণ প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতি বসানোর কাজে আমরা পিছিয়ে
আছি। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ পরামর্শে কর প্রশাসনকে সহজ-সরল ও কার্যকর করে ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ২০ লাখ
অতিরিক্ত লোককে করের আওতায় এনে ২০২৪ সালে কর জিডিপি অনুপাত দ্বিগুণ অর্থাৎ ২০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রায় করজালের বিস্তার করা
জরুরি। নইলে বিনিয়োগ জিডিপি অনুপাত ৪০ শতাংশে ওঠানো যাবে না।
১৪. অধিকন্তু
উন্নয়ন অগ্রযাত্রার মডেলকে শিল্পায়ন তথা কর্মসংস্থানমূলক অর্থাৎ আয়-রোজগার বৃদ্ধি আনয়নে দারিদ্র্য নিরসন ও বৈষম্য দূরীকরণের
স্থির নিশ্চিত যাত্রাপথে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া অতিক্ষুদ্র,
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবিষয়ক নীতিমালা এবং বাংলাদেশ
ব্যাংক কর্তৃক সংজ্ঞায়িত কটেজ, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ঘটানো সম্ভব
এবং উচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে এসব খাতে কর্মসংস্থান হয় মোট কর্মজীবীর দুই-তৃতীয়াংশ। তাই আমাদেরও এক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বর্তমানের
২৫ শতাংশ (এডিবি)
বা ৩৫ শতাংশ (পরিকল্পনা কমিশন) ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে মূলধন কম লাগে,
বিনিয়োগ থেকে উৎপাদনে যাওয়ার সময় লাগে অতি স্বল্প,
ব্যবহার হয় দেশী কাঁচামাল,
প্রযুক্তি জানা আছে,
আমদানি নেই, উৎপাদিত পণ্যের দেশে-বিদেশে বাজার আছে, বিপুলভাবে আত্মকর্ম ও মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থান—এটিই বাংলাদেশের মোক্ষম সুযোগ। সম্ভবত মাঝারি ক্যাটাগরিকে
বাদ দিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা এনে এসএমই ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করে সরকারের আকর্ষণীয়
প্রণোদনা এবং নিবিড় প্রশিক্ষণ-২০২০
সালে এর শুভসূচনা হতেই পারে।
১৫. ২০১৯
সালের অন্যতম আলোচিত বিষয় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলা এবং জাতিসংঘের
উদ্যোগে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে। তবে হঠাৎ করে কয়েক লাখ লোকের প্রতিবাদ সমাবেশ করে রোহিঙ্গাদের
ফেরত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত, ভাসানচরে স্থানান্তরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাধা
এবং কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তার চোরাপথে অনেক রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেয়ার ঘটনা চিন্তাকে
আরো দুর্বিষহ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেনস এবং সিএবি অবশ্যই বাংলাদেশের
জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ ঘটিয়েছে। এদিকে ট্রান্সশিপমেন্ট ফি প্রান্তিক খরচের ওপর নির্ধারণ
করা বড় ভুল হবে। রাস্তাঘাট, রেল ও বন্দরের ব্যবহার ব্যাপক হবে বলে নিদেনপক্ষে
গড় বা এভারেজ কস্টের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা উচিত।
১৬. আর্থিক
খাতে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা
হয়েছে বটে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরের ৫ দশমিক ৮ শতাংশের পর ২০১৮-১৯ সালে প্রথমবারের মতো বাজেট
ঘাটতিতে সর্বত্র সমীহ করা সামষ্টিক আয়ের ৫ শতাংশ সীমানা ছাড়িয়ে ৫ দশমিক ২ হয়ে গেছে।
এতে বহুল প্রশংসিত সামষ্টিক স্থিতিশীলতা এখনই হুমকির সম্মুখীন হয়ে যাবে না। তবে কর
রাজস্ব বাড়ানো, রফতানি
বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের
অব্যাহত বেড়ে যাওয়া, মূলধন
বাজারে আস্থা ফেরানো, স্টক
এক্সচেঞ্জ-বীমা-প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল আহরণ করে
১৯৯২ সাল থেকে ভুল পথে থাকা স্বল্পমেয়াদের আমানত গ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদি
ঋণজালে জড়ানো থেকে ধীরে ধীরে বের করে আনতে হবে। বিশাল ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং
২০০৩ সালে শুরু করা নৈতিক বিপর্যস্ত খেলাপিদের সুদ মওকুফ
(অনেকেই ইচ্ছাকৃত) বন্ধ করা খুবই জরুরি। মার-কাট না করে উপযুক্ত নীতি কৌশলে ঋণ খেলাপের সমস্যা
সমাধান ২০২০ সালেই শুরু হতে পারে। খুব লাগসই ফর্মুলাই আছে। বিনিয়োগে ব্যাংকঋণের সুদ
হার এক অংকে নামাতে হবে বাজার অর্থনীতিতে একটি নিয়ামক পরিমণ্ডল এনে। ৩৭ শতাংশ স্থায়ী
বা মেয়াদি আমানতের গড় সুদহার ৮ শতাংশ আর ৬৩ শতাংশ সেভিংস আমানতের গড় সুদ
(০ থেকে ৪ পর্যন্ত বিস্তার)
হার ৩ দশমিক শূন্য। তাই কস্ট অব ফান্ড হবে ৪ দশমিক
শূন্য থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজার নিয়ামক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করা হলে সুদহার অবশ্যই ৮
দশমিক ৫ থেকে ৯ দশমিক শূন্য হারের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।
১৭. ২০২০
সালের ১ জানুয়ারি নতুন সূর্যকিরণ অস্ত যাওয়ার আগেই যেন আমরা দুঃখী মানুষের মুখে হাসি
ফোটানো প্রযুক্তিনির্ভর, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, খুন-ধর্ষণ-গুম সন্ত্রাসমুক্ত অশিক্ষা,
গৃহহীনতা ও ক্ষুধামুক্ত সোনার দেশ গড়ার যে যাত্রাপথে
আছি, তা আরো
জোরদার হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় কল্যাণ রাষ্ট্রে বৈষম্যমুক্ত স্নেহ-মমতা ভরা সোনার বাংলা।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী










