আমাদের দেশে কৃষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকরা বিভিন্ন ফসলের ফলন বৃদ্ধি করছেন। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের আগ্রহ অধিকতর হচ্ছে। কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়নকে সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের সঙ্গে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে। ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জৈব কৃষি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে পরিবেশবান্ধব ফসল আবাদি এলাকা বিস্তৃত হয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও ভারসাম্য ব্যবহারে সহায়ক হবে। 

আবাদি জমির উর্বরা শক্তি রক্ষা এবং পানিধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি আবশ্যক। এজন্য জৈব সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। গবাদিপশু ও হাঁসমুরগি পালন, ফসলের অবশিষ্টাংশ, আবর্জনার স্তূপ ইত্যাদি জৈব সারের প্রধান উৎস। শেওলা, কচুরিপানা, পাটগাছের পাতা, ধইঞ্চা গাছ ইত্যাদি পচে এবং উঁচু এলাকা থেকে প্রবাহিত বৃষ্টির পানির সঙ্গে পলি মাটি ভেসে এসে জমির উর্বরা শক্তি বাড়িয়ে দেয়। জমি নিড়িয়ে এবং বাড়তি চারা তুলে ঘনত্ব কমিয়ে কৃষকরা উদ্ভিদ রোগ ও উদ্ভিদ ভক্ষণকারী পোকামাকড় বা রোগবালাই আক্রমণ ও বিস্তার রোধে ব্যবস্থা নেন। আক্রান্ত গাছ উৎপাটন, ছাই ছিটানোসহ বিভিন্ন জৈব উপায়ও অবলম্বন করে থাকেন। একেক জমিতে ভিন্ন ফসল বা একই ফসলের ভিন্ন জাত আবাদ করতে দেখা যায়। 

একসময় আমাদের দেশে অধিকাংশ আবাদি ফসলের জাত ছিল স্থানীয়। জমি থেকে ফসল তোলার পর প্রয়োজনীয় বীজ বাছাই করে পরবর্তী আবাদের জন্য সযত্নে বীজভাণ্ডারে সংরক্ষণ করা হতো। ঘাটতি কিংবা নষ্ট হলে প্রতিবেশীদের কাছে পাওয়া যেত। ফসল মৌসুমের শুরুতে হাটে বীজ বেচাকেনা চলত। কিছু ফসলের বীজ দেশের এক এলাকা থেকে অন্যত্র সরবরাহ করা হতো। প্রধান খাদ্যফসল ধানের অনেক স্থানীয় জাত ছিল। ফসল আবাদ ছিল বেশির ভাগই বৃষ্টিপাত নির্ভরশীল। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাতে আবাদি জমিতে ‘জো’ আসার পর অর্থাৎ মাটির রস বা আর্দ্রতা পরখ করে উপযোগী হলে আউশ ও জলি আমন ধান, পাট ইত্যাদি আবাদে লাঙল দিয়ে চাষ শুরু হতো। বর্ষাকালে আউশ ও পাট তোলার পর আমন ধানের চারা রোপণ করা হতো। শীতের আগে বা শুরুতে জলি ও রোপা আমন ধান তোলা যেত। শীতকালে উঁচু এলাকার জমিতে মাটির প্রাকৃতিক আর্দ্রতায় আবাদ হতো ধানবহির্ভূত হরেক ফসল। নিচু এলাকায় আবাদি জমিতে পানির বেশি গভীরতায় বর্ষাকালে ফসল বপন বা রোপণ সম্ভব না হলে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান চাষে সেচ পানির প্রয়োজন হতো। বেশির ভাগ সেচাধীন জমিতে দোন, সেঁউতি ইত্যাদি দেশীয় পদ্ধতিতে ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহ করা হতো। বোরো ধানের বেশির ভাগ উৎপাদিত হতো দেশের উত্তর-পূর্বে বিস্তৃত হাওড় এলাকায়। ধান ও পাট আবাদি জমিতে বিচরণ করত হরেক প্রজাতির প্রচুর প্রাকৃতিক মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী। আবাদি এলাকার চারদিকে বনজঙ্গলে স্থানীয় প্রজাতির গাছপালায় অসংখ্য পাখি বসবাস করত। উল্লেখ্য, অনেক জলজ প্রাণী ও পাখি পোকা শিকার করে ফসলের উপকার করে।

আধুনিক কৃষি উৎপাদন ও নতুন জাতের ফসল আবাদ শুরু হলে বীজ ও সার ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। সেচাধীন ফসল এলাকা প্রসারিত হতে থাকে। ধান উৎপাদনে উচ্চফলনশীল নতুন জাতের বীজ সরবরাহ শুরু হয় ষাটের দশকে। ওই দশকের শেষে নতুন জাতের ধান উৎপাদন এলাকা সারা দেশে মোট আবাদি জমির ৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে। খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন জাতের ধান আবাদ প্রসারিত হতে থাকে। মোট ধান আবাদি এলাকা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে অন্যান্য ফসলের আবাদও। জমিতে মাটির উর্বরা শক্তি বজায় রাখতে জৈব সারের পাশাপাশি অজৈব বা ইন-অর্গানিক সার ব্যবহার শুরু হয়। নিড়ানোর পরিবর্তে আগাছানাশক প্রয়োগের সুযোগ আসে। উদ্ভিদ রোগ, উদ্ভিদ ভক্ষণকারী পোকামাকড় ও ইঁদুর আক্রমণে ফসলের ক্ষতি রোধে অজৈব বা রাসায়নিক বালাইনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ছত্রাকনাশক, মিটিসাইড, কীটনাশক, রডেন্টিসাইড ইত্যাদি পাওয়া যেতে থাকে। তবে পরিমিত, যথাযথ ও অনুমোদিত হারে প্রয়োগের অভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। মাটির স্বাস্থ্য অর্থাৎ প্রকৃতিজাত জৈব, ভৌত ও অজৈব বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশের ওপর কিছুটা হলেও বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষণের সম্ভাবনা এবং লক্ষ্যবহির্ভূত প্রজাতি বা প্রাণী সম্ভাব্য ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। টেকসই কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণে এগুলো প্রতিরোধে উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক হয়ে পড়ে। জৈব, সবুজ ও জীবাণু সার উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হতে থাকে। সেই সঙ্গে ফসলের রোগ ও অনিষ্টকারী পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধ ও দমনে জৈব পদ্ধতি ব্যবহার এবং জৈব ও নিরাপদ বালাইনাশক প্রয়োগ বিস্তারে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ‘জাতীয় জৈব কৃষি নীতি ২০১৬’ প্রণীত হয়েছে। সময়োপযোগী এ নীতির উদ্দেশ্যাবলিতে জৈব কৃষির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সনাতন এবং দেশজ জ্ঞান ও প্রথা শনাক্তকরণ ও উৎপাদন কার্যক্রমে সম্পৃক্তকরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে ভূমির উর্বরা শক্তি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফসলের রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা এবং জৈব ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে আগাছা দমন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে জৈব বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং ফসলভিত্তিক জৈব কৃষিতাত্ত্বিক চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা এবং প্রাপ্ত ফলাফল কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এসব উদ্যোগ গ্রহণ ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সহায়ক হবে। ‘জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮’ অনুসরণে জৈব, সবুজ জীবাণু সার উৎপাদন, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ, জৈব বালাইনাশক ব্যবহার এবং নিরাপদ ও কার্যকর বালাইনাশক আমদানি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হয়ে পরিবেশবান্ধব ফসল আবাদ ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এগিয়ে যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারা দেশে কৃষকদের প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত সেবা প্রদান করে। জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবিত জৈব প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কৃষকদের কাছে সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে। মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রদর্শনী আয়োজনসহ বিভিন্ন সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড মৃত্তিকা এবং ফসলের রোগ ও পোকামাকড়ের জৈবিক দমন ব্যবস্থাপনাসহ উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূমির উর্বরা শক্তি ও উৎপাদনক্ষমতা রক্ষণাবেক্ষণে কৃষকরা সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং অনুমোদিত হারে সময়মতো সুষম সার প্রয়োগ করছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কৃষকদের আবাদি জমির মাটি নমুনা বিশ্লেষণ ও স্থানভিত্তিক ফসল চাষে সার সুপারিশমালা প্রদান করে। এসব সহায়তা প্রদানে কম্পোস্ট ও খামারজাত সারসহ বিভিন্ন জৈব সার তৈরি ও আবাদি জমিতে ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই জমিতে বারবার নির্দিষ্ট ফসল চাষ পরিহার এবং বিভিন্ন ফসলের চাষ করে অজৈব সার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা কমাতে কৃষকরা উৎসাহিত হচ্ছেন। মিশ্র ফসলের চাষ করে মাটিতে সূর্যের আলো প্রবেশ কমিয়ে আগাছা বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে আগ্রহী হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন কলাকৌশল নিরূপণ, রোগবালাই সম্পর্কে জরিপ ও আগাম ব্যবস্থা গ্রহণে কৃষকদের সতর্কীকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আইপিএম (ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট) হিসেবে অধিক পরিচিত সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রাথমিকভাবে জৈব পদ্ধতিতে ফসলের পোকামাকড়ের আক্রমণ ও বিস্তার রোধে কৃষকদের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কৃষকরা নিরাপদ ফসল উৎপাদনে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে। জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারে ফসল আবাদ আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি রোধে সহায়ক হবে। পরিবেশবান্ধব ফসল আবাদি এলাকা প্রসারে গুণগত মান বজায় রেখে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় আমাদের সবার সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ ও জৈব কৃষি নীতি ২০১৬, কৃষি মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সমীক্ষা; বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর. জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন. তথ্য ও  উপাত্ত এবং অন্যান্য।

 

ড. কিউ আর ইসলাম: উন্নয়ন গবেষক