অভিবাসনের ক্ষেত্রে মানব অঙ্গের কালোবাজারি নতুন এক আতঙ্কের নাম। সম্প্রতি জাতিসংঘও এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে। সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম না থাকলেও রাষ্ট্রপুঞ্জের ওই সতর্কবার্তায় মধ্যপ্রাচ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনা-বেচায় কালোবাজারিরা আলোচ্য অঞ্চলে তত্পর হয়ে উঠছে। উচ্চদামে সেখানে বিনিময় হচ্ছে অবৈধভাবে সংগ্রহ হওয়া বিভিন্ন মানব অঙ্গ। মধ্যপ্রাচ্য সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার হওয়ায় বাংলাদেশের জন্যও তা ভীষণ উদ্বেগজনক বৈকি। বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সতর্কতাই কাম্য।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মানব অঙ্গের কালোবাজারের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট সক্রিয়। ওই সিন্ডিকেটের এজেন্টরা বেকার তরুণ-তরুণীদের দিচ্ছে বিনা ব্যয়ে অভিবাসন ও চাকরির প্রলোভন। এরপর বিভিন্ন গন্তব্য, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। দেহ থেকে মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহপূর্বক চলছে সেগুলোর বেচা-কেনা। সিরিয়া, বাহরাইন, লেবানন ও তুরস্ক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবৈধ ব্যবসার ‘হটস্পট’ হিসেবে বর্তমানে চিহ্নিত। প্রধানত এসব দেশ ঘিরে উল্লিখিত এজেন্টরা প্রতারণার নানা অভিনব পরিকল্পনা আঁটছে। টার্গেট করছে বিভিন্ন দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। বাংলাদেশও তাদের লক্ষ্যের বাইরে নয়। দেশে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের অবস্থা ভালো নয়। কভিড-১৯-এর অভিঘাতে তা আরো পর্যুদস্ত। এ প্রেক্ষাপট থেকে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীর চোখ বাইরের শ্রমবাজার, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। কিন্তু উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকের পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বিনা ব্যয়ে অভিবাসন ও আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেয়া হলে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীই তা লুফে নেয়ার যথার্থ কারণ আছে বৈকি। তদুপরি এ ধরনের ঘটনা একেবারে নতুন নয়। আগেও এ ধরনের প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশী অনেক তরুণী মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়েছেন। তাদের অনেককেই সেখানে আটকে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার পাশাপাশি কেউ কেউ গুম হয়েছেন বলে খবর মিলছে। নিখোঁজ হওয়া তরুণীরা যে অঙ্গ পাচারকারীদের হাতে পড়েননি, সেই আশঙ্কাটি উড়িয়ে দেয়ার নয়। শুধু অভিবাসনপ্রত্যাশী নয়, এরই মধ্যে কর্মরত অনেক বাংলাদেশী প্রবাসীও এ ধরনের ঘটনার শিকার। প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে তাদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ  নিয়ে নেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার তা অঙ্গদাতার সম্মতিতেও ঘটে। এক্ষেত্রে মূলত হতদরিদ্র অবস্থা থেকে আসা অভিবাসীরাই পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্য হয় বলে খবরে প্রকাশ। কাজেই অভিবাসীদের জীবন হুমকি প্রশমনে দূতাবাসগুলোরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।

সন্দেহ নেই, মানব অঙ্গের পাচার একটি মানবতাবিরোধী গর্হিত অপরাধ। কেবল আইন-শৃঙ্খলা নয়, মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অনৈতিক। এ বিষয়ে জাতিসংঘের সুনির্দিষ্ট রেজল্যুশন রয়েছে। সেখানে মানব অঙ্গের পাচার ও অবৈধ কেনা-বেচাকে সংগঠিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ অপরাধ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক বিধি ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতিটি সদস্য দেশকে অভ্যন্তরীণ জাতীয় আইনে সম্পর্কিত ধারা সংযোজন এবং তার প্রয়োগ নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টার পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়েও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে এক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে। নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে আমাদের দেশের কিছু এজেন্টও জড়িত, যারা এখানকার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের টার্গেট করে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করায় সচেষ্ট। তাদের তত্পরতা রুখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সচেতনতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যারা প্রতারণার শিকার হন, তারা মূলত দরিদ্র ও অশিক্ষিত। তাদের সচেতনতা বাড়াতে প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে এক্ষেত্রে এনজিওগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মানব অঙ্গের কালোবাজারি অপরাধের অভিপ্রকাশ হলে মানব পাচারই এর মূল কারণ। সুতরাং একে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। মানব পাচার রোধ করা গেলে এটিও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। দেশে মানব পাচারবিষয়ক শক্ত আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। আজকাল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাচারকারী ও তাদের অবস্থান চিহ্নিত করা সহজ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এক্ষেত্রে আরো চৌকস হতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সীমান্ত এলাকা ও দেশের সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গাকে পাচারকারীরা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এসব জায়গায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীর টহল বাড়াতে হবে। নতুন কোনো স্থানকে অপরাধীরা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে কিনা, সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মানব পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহূত দেশগুলোর সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করা যায় কিনা, সেটি ভাবতে হবে। আন্তঃদেশীয় সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে মূল হোতাদের ধরা অসম্ভব নয়। তার জন্য কূটনৈতিক তত্পরতা এবং সরকার টু সরকার পর্যায়ে মানব পাচারবিরোধী আলোচনা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোকেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বাংলাদেশী কোনো প্রবাসী নিখোঁজের খবর পাওয়া গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। তত্পরতা বাড়াতে হবে, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা না ঘটে।

সমরূপভাবে, অভিবাসন প্রক্রিয়ায়ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন দরকার। আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো দালালনির্ভর। বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বেশির ভাগই রিক্রুটিং এজেন্সির নাম-পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকেন না। ফলে দালাল কর্তৃক সহজেই প্রতারিত হন। অনেক দিন ধরেই দালালদের নিবন্ধনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈধভাবে নিবন্ধিত হলে দালালদের চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। কাজেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি আমলে নেয়া যেতে পারে। মানব অঙ্গের কালোবাজারি বিষয়ে জাতিসংঘ যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, সেটিকে গভীরভাবে আমলে নিতে হবে। কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধানে সরকার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।