ব্রেক্সিট-উত্তর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বাইডেন প্রশাসনের বিবর্তনশীল ডিনামিক্সের প্রেক্ষাপটে আফ্রিকা মহাদেশে চীনের বর্ধমান প্রভাব বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন হবে। এটি এজন্য জরুরি হবে যে আফ্রিকা বৈশ্বিক পর্যায়ে ধীরে ধীরে তার নিজস্ব ন্যারেটিভ/বয়ানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। আলোচ্য মহাদেশটি সম-অংশীদার হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে আচরণ প্রত্যাশা করে।
আফ্রিকা মহাদেশ বিচিত্র মতাদর্শের একটি মহাদেশ। কিন্তু ধীরে ধীরে দৃঢ় প্রত্যয়ে মৌলিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এটি। এ বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একটা ইঙ্গিত দেয় যে অতীতে তারা সেখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার থাকলেও এখন আর নেই। নতুন কর্তারা এখন আফ্রিকার সুপ্ত সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সেটি তাদের আপেক্ষিক সুবিধা হিসেবে ব্যবহারের উপায় সন্ধান করছে। সুনির্দিষ্টভাবে চীনের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বিচিত্র ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং আফ্রিকান দেশগুলো এগুলো ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে।
চীন এরই মধ্যে আফ্রিকার নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটের মধ্যে যুক্ত হয়েছে এবং শিক্ষা ও গণমাধ্যম প্লাটফর্মগুলোর মধ্যেও তাদের সফট পাওয়ার টুলস ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। চীন আফ্রিকাকে এরই মধ্যে নতুন সুযোগের ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মহাদেশটিতে বার্ষিক গড়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে এশিয়ার (৭ দশমিক ৪) পরে এটি দ্বিতীয় দ্রুত বিকাশমান অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। অধিকন্তু, একটি বর্ধনশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশসহ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছাড়াও আফ্রিকা অন্য অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক নির্দেশকে চমকপ্রদ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এসব ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক তাত্পর্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জও এখনো রয়ে গেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অসম সম্পদ বণ্টন, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় অকার্যকারিতাসৃষ্ট দুর্বল সুশাসন, দুর্নীতি, নিরাপত্তা সমস্যা এবং উচ্চ বেকারত্ব। কভিড-১৯ মহামারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবগুলো এসব চ্যালেঞ্জ আরো বাড়িয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিষয়াদিতে আফ্রিকার মত প্রকাশের প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে এবং এটা যদি দক্ষতার সঙ্গে করা যায় তাহলে তা আফ্রিকা ও তার জনগণের জন্য নতুন সুযোগ নিয়ে আসবে। বর্তমানে ওই মহাদেশে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক দাবা খেলা চলছে। অনেক কর্তা যেমন চীন, রাশিয়া ও তুরস্ক আফ্রিকার সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শক্তিশালীকরণের পথ সন্ধান করছে। তাদের মধ্যে আফ্রিকায় চীনের ভূমিকা জোরালো গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বেইজিং আফ্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার এখন। চীন-আফ্রিকার মধ্যকার বাণিজ্য বর্তমানে বছরে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। আলোচ্য মহাদেশে দেশটি তার নিরাপত্তা উপস্থিতি ও সামরিক সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে। গত কয়েক বছরে সেখানে দেশটির অস্ত্র রফতানির ব্যাপকতর উল্লম্ফন ঘটেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের সদস্য হিসেবে চীন ও আফ্রিকা উভয়ই সমতা নীতি, অভিন্ন সমৃদ্ধি ও তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন পৃষ্ঠপোষকতা জোগানোর অভিন্ন ভিত্তি আবিষ্কার করেছে। আজকে চীন ও আফ্রিকা উভয়ই একটি অধিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও মিথস্ক্রিয়ার নৈমিত্তিক ধরন স্বীকার করে, যা তাদের সম্পর্ক দৃঢ় করার পাশাপাশি পারস্পরিক বোঝাপড়া সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে আজকে নিজেদের একটি বর্ধমান অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্র আছে, যা আরো সমতামূলক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বীকৃতির ওপর গুরুত্ব দাবি করে। ২০০০ সালে চালু হওয়া একটি ত্রিবার্ষিক সামষ্টিক সংলাপ প্লাটফর্ম দ্য ফোরাম অন চায়না-আফ্রিকা কো-অপারেশন (এফওসিএসি) এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছে।
এটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে চীন ও আফ্রিকান কোনো দেশের মধ্যে অদল-বদল করে এফওসিএসি ফোরামের সংলাপ আয়োজিত হয়, যেখানে উভয় পক্ষই চলমান উদ্বেগগুলো উপস্থাপন করে এবং অর্জনগুলো উদযাপন করে। তদুপরি ওই মহাদেশের প্রতি চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশটি সেখানে যথাক্রমে ২০১৫ ও ২০১৮ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। কৌশলবিদরা উল্লেখ করেছেন যে গত কয়েক দশকে এফওসিএসি নিছকই আন্তঃসরকারি চর্চা থেকে বিবর্তিত হয়ে থিংক ট্যাংক, বৃত্তি, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বিনিময় এবং এমনকি নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
প্রক্রিয়াটি বর্তমানে আলজেরিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, সিয়েরা লিওন এবং জিম্বাবুয়ের সঙ্গে চীনের সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিনিময়ে পর্যবসিত হয়েছে। আফ্রিকার এসব দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মৌলনীতি ও লক্ষ্যগুলোয় নিম্নোক্ত প্রধান উপাদানগুলো জোর দেয়া হয়েছে। আফ্রিকার শিল্পায়ন চাঙ্গা করা, সেখানকার কৃষির আধুনিকায়ন করা, আফ্রিকান অবকাঠামো উন্নয়নে অংশগ্রহণ, আর্থিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা, সম্পদ ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো, সর্বোপরি নীল অর্থনীতির সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
অন্যদিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে সম্পদ ও বাজার প্রবেশাধিকারসহ বাস্তব স্বার্থই আদর্শিক পথের সূচনা করেছে। ২০০৯ সাল থেকে চীন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চীন-আফ্রিকার বাণিজ্য ২০১৮ সালে ১৮৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, ২০১৭ সালে যা ছিল ১৫৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালে অ্যাঙ্গোলা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং কঙ্গো চীনে পণ্য রফতানি করেছে। তবে কভিড-১৯ সংকটের কারণে ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীন-আফ্রিকার বাণিজ্য ১৪ শতাংশ কমেছে।
গভীর পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দেয় যে আফ্রিকার দেশগুলো চীন থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করতে এবং কাঁচামাল (প্রাইমারি গুডস) দেশটিতে রফতানি করতে আগ্রহী। আলোচ্য মহাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন বড় টেলিকম প্রতিষ্ঠান হোয়াও গ্রাহকদের কাছে সাশ্রয়ী দামে ডিভাইস সরবরাহ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা জুগিয়েছে) বাজার সম্ভাবনা বিপুল। সার্বিকভাবে আফ্রিকায় চীনা সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) ২০১৮ সালে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং ২০১৪ সালে সেখানে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে।
২০১৮ সাল থেকে চীনা বিনিয়োগের একটা অংশ নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, জাম্বিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে হয়েছে। বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চীন থেকে বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে এশিয়া ও ইউরোপের পরই আফ্রিকার অবস্থান। তার পরও কিছু ইউরোপীয় বিশ্লেষক মনে করেন যে আফ্রিকায় কিছু ইউরোপীয় দেশের বিনিয়োগ মাত্রায় পৌঁছতে চীনের এখনো অনেক কিছু করতে হবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ২০১৯ সালের জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলার নিয়ে আফ্রিকায় ফ্রান্স ছিল সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, যেখানে একই বছরে চীনের বিনিয়োগ ছিল ৪৩ বিলিয়ন ডলার। শহরগুলোর মধ্যে বিপুল দূরত্বের কারণে আফ্রিকা বর্তমানে চীনের আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ ও সহযোগিতার ভিশন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছে। আফ্রিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মনে করে যে বিআরআইয়ের প্রাধিকারগুলো আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) এজেন্ডা ২০৬৩-এর সঙ্গে একীভূত হয়েছে, যা মহাদেশটির সম্পদ ব্যবহার, শিল্পায়ন বেগবান করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলে। আরো সম্প্রতি দেশটি একটি আফ্রিকা মহাদেশভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার দিকে চালিত হয়েছে।
যেমনটা আশা করা হচ্ছে, লক্ষণীয় শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় আফ্রিকার দিক থেকে চীন এখন তাদের আকাশ, সড়ক, বন্দর, রেলপথসহ পরিবহন অবকাঠামোয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে উপযুক্ত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। এই প্যারামিটারের মধ্যে চীন এরই মধ্যে আদ্দিস আবিবায় অবস্থিত আফ্রিকান ইউনিয়ন সদর দপ্তর নির্মাণে ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা জুগিয়েছে, যেটি ২০১২ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল। চীনা নির্মাণ কোম্পানিগুলো এবং প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নগুলোও প্রধানত আফ্রিকার বিদ্যুৎ উৎপাদন, আইসিটি নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, মাইনিং, আবাসন, পরিবহন, শিপিং এবং বন্দরগুলো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।
এসব পদক্ষেপ আফ্রিকায় শিল্পায়ন প্রক্রিয়া জোরদারের দিকে চালিত। এরই মধ্যে চীনা প্রতিনিধিরা আশ্বস্ত করেছেন যে ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়া ও কঙ্গো হবে শিল্পায়ন সহযোগিতার জন্য তাদের ডেমোস্ট্রেশন কান্ট্রি। মহাদেশটির শিল্পায়ন প্রচেষ্টায় দক্ষিণ আফ্রিকাকেও লাভজনক হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে আফ্রিকায় তাইওয়ানের কূটনৈতিক উপস্থিতির অবসান ঘটাচ্ছে। উল্লিখিত উপাদানগুলো আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করছে বৈকি।
মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার










