বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে ময়মনসিংহে চরম দরিদ্র ৩০ শতাংশ আর দরিদ্র ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের চরম দরিদ্র ছিল ১০ শতাংশ ও দরিদ্র ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ জাতীয় দারিদ্র্যসীমার তুলনায় ময়মনসিংহে চরম দরিদ্র ২০ শতাংশ আর দরিদ্র ৩০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে ২৬ লাখ লোক সংযুক্ত হয়। সরকারি চাকরি প্রতি বছর ১ লাখ ৫০ হাজার শূন্য হলে প্রতি বছর ২৪ লাখ ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান করতে হবে বেসরকারি খাতে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা অনেক কম। বাংলাদেশ সরকার বিসিক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে কাজের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাবের কারণে শিক্ষিত বেকাররা ব্যবসার উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হন না। জাতীয় শিল্পীনীতি ২০১৬ অনুযায়ী, এসএমই শিল্পের সংজ্ঞা হলো, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে মূলধন ৭৫ লাখ থেকে ১৫ কোটি অথবা শ্রমিকের সংখ্যা ৩১ থেকে ১২০ জন হলে এবং সেবা খাতে মূলধন ১০ লাখ থেকে ২ কোটি অথবা শ্রমিক ১৬ থেকে ৫০ জন হলে ক্ষুদ্র শিল্প বলা হয়। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে মূলধন ১৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি অথবা শ্রমিক ১২১ জন থেকে ৩০০ জন ও সেবা খাতে মূলধন ২ কোটি থেকে ৩০ কোটি অথবা শ্রমিক ২১ জন থেকে ১২০ জন হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে মাঝারি শিল্প বলা হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের দোকান, পোলট্রি খামার, ডেইরি ফার্ম, ট্রেইলারিং, অটো রাইস মিল, বেকারি, প্রেস ও প্রিন্টিং, ফিশ ফিড, স মিল, ফিশারিজ, বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, অটোমোবাইল সার্ভিসিং, ফার্মাসিউটিক্যাল ইত্যাদি।

এসএমইকে তিনভাগে ভাগ করা হয়—ট্রেডিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সার্ভিস। বাংলাদেশে ব্যবসা করার খরচ অত্যন্ত বেশি। তাছাড়া এসএমই খাতের দুটি বড় সমস্যা হলো মূলধন ও বিপণন। এই এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এসএমই প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রথম যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তা হলো মূলধনের সংকট। অনেকে নিজস্ব অর্থায়নে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিংহভাগ তরুণের ব্যবসা শুরু করার জন্য নিজস্ব মূলধন থাকে না। মূলধন না থাকলে কোনো উদ্যোক্তা কীভাবে ব্যবসা শুরু করবেন। অনেকে মনে করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন এসএমই ব্যবসার বয়স তিন বছর না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক ঋণ দেবে না। আবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বয়স তিন বছর হলেও ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে তার সম্পত্তি (জমি, বিল্ডিং) জামানত রাখতে হবে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় ঋণ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে প্রয়োজনের সময় ঋণ পান না, আবার যাদের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা আছে, তারা পান না; অন্যরা ঋণ পান। মূলধন সংকট ছাড়াও আরো কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যেমন বাজারজাত সমস্যা ও পণ্যের মূল্য অস্থিতিশীলতা।

ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ওলয়রি গ্রামে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের বেশির ভাগ পোলট্রি খামারি তাদের ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হন। কারণ মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম বেশি কিন্তু ডিমের বাজারমূল্য কম। পোলট্রি মুরগির চিকিৎসা দিয়েও রোগ ভালো হয় না, মুরগি মারা যায়। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বেশি এবং ডিমের মূল্য কম হওয়ায় আয় কম। এক্ষেত্রে এমন খামারিরা ঋণ নিলে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের মাধ্যমে তাদের ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তাছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেশি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে ময়মনসিংহে দরিদ্রতা ও বেকারত্ব দূরীকরণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভূমিকা শীর্ষক গবেষণা প্রকল্পের জন্য ২৫০ জন এসএমই উদ্যোক্তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে দেখা যায়, তাদের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা বেশি। এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, সরকারি ব্যাংকের ঋণ পেতে সময় বেশি লাগে। অনেক সময় ঋণ পেতে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ দরকার হয় এবং সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গ্রাহকদের সেবা প্রদানে যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাবের কারণে সরকারি ব্যাংকে সুদের হার কম হওয়া সত্ত্বেও গবেষণা অঞ্চলে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেশি।

গবেষণা অঞ্চলে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, ব্যাংকে জামানত ছাড়া ঋণ পাওয়া যায় না। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যক্তিগত জিম্মায় একজন ব্যক্তি ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন কিন্তু ঋণখেলাপি হলে ব্যাংক গ্রাহকের নামে মামলা করলে সেই মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যক্তিগত জামানতে ঋণ দিতে আগ্রহী কম হয়। এসএমই ঋণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম প্রচলিত থাকলেও যথাযথ শর্ত পালন করে ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদান করে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এসএমই ঋণের ক্ষতিপূরণ দিতে চায় না। তাই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এসএমই ঋণ দিতে সতর্কতা অবলম্বন করে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে তরুণ শিক্ষিত বেকারদের উদ্যোক্তা হয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে ন্যূনতম সময়ে কোনো সুপারিশ ছাড়া প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদানে সহযোগিতা করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার জন্য ব্যাংকগুলো তাদের নিজ নিজ এলাকায় ব্যবসা-পূর্ববর্তী জরিপ করে সেই এলাকায় সম্ভাবনাময় খাতের ব্যবসায় ব্যাংক ও নতুন উদ্যোক্তার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা অথবা ঋণ প্রদান করলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ হবে এবং ময়মনসিংহে বেকারত্ব ও দরিদ্রতা কমানো সম্ভব হবে।

ময়মনসিংহ দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এ এলাকায় এসএমই ফাউন্ডেশনের শাখা স্থাপন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে এই বৃহত্তর অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নতি করা সম্ভব। বিপণন সমস্যা দূরীকরণের জন্য সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার মাধ্যমে পণ্যের স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ঋণখেলাপিদের মামলাগুলো সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের কার্যকর বাস্তবায়ন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

এসব বিষয় চালু করা সম্ভব হলে এমএসই খাতের ওই  উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ সমস্যা দূর করে মূলধন সংকট নিরসনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দরিদ্রতা কমানো সম্ভব হবে।

 

মো. তানজিল হোসেন: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়; ইউজিসির অর্থায়নে ময়মনসিংহে দরিদ্রতা ও বেকারত্ব দূরীকরণে এসএমই খাতের ভূমিকা শীর্ষক গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক

মো. আমিনুল ইসলাম: গবেষণা প্রকল্পের সহকারী গবেষক