ডিসেম্বরে ঢাকার উত্তরা-মতিঝিল রুটে চালু হতে যাওয়া মেট্রোরেলের ভাড়া সর্বনিম্ন ২০ টাকা ও সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। ঢাকা শহরে সরকার নির্ধারিত বাস ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪৫ পয়সা। সেখানে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে কিলোমিটারপ্রতি ৫ টাকা। আবার বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হলেও মেট্রোর সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। বাসে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২১ দশমিক ৬ কিলোমিটারে যেখানে ভাড়া ৫৩ টাকা, সেখানে মেট্রোরেলে দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিলের ভাড়া ১০০ টাকা। নির্ভরযোগ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ায় সারা বিশ্বেই মেট্রোরেলকে গণপরিবহনের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বল্প সময়ে ও স্বল্প ব্যয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের কারণে দ্রুতই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনটি ঘটবে তা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে উচ্চ হারে ভাড়া নির্ধারণের কারণে। সড়কের ওপর চাপ কমাতে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও ভাড়া নির্ধারণে সেটি বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে সফলতা মিলবে কিনা সেটি নির্ভর করছে কত মানুষ এটি ব্যবহার করছে তার ওপর। ভাড়া বেশি হওয়ায় এর ব্যবহার কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রত্যাশা থাকবে, কর্তৃপক্ষ মেট্রোর ভাড়া সড়ক পরিবহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হারে নির্ধারণ করবে। শুধু লাভজনকতা নয়, যানজট নিরসন ও গণপরিবহনে সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ভাড়া নির্ধারণে কৌশলী হতে হবে। সর্বোপরি উচ্চ ভাড়া মেট্রো ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করবে, যা পরিকল্পনা লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাত্রীর সংখ্যা। ঢাকায় মেট্রোরেলের ছয়টি করিডোরের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে মেট্রো-৬-কে বেছে নেয়া হয় অধিক যাত্রী পাওয়া যাবে বলে এবং প্রকল্পটি দ্রুতই লাভজনক হবে। যে সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে মেট্রোরেল প্রকল্প ডিজাইন করা হয়েছিল, বর্তমানে তার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে লাভজনক হওয়ার দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে—একটি হলো অধিক ভাড়া নির্ধারণ এবং কম যাত্রী পরিবহন আর দ্বিতীয়টি হলো কম ভাড়ায় অধিক যাত্রী পরিবহন। আয়-ব্যয় বিবেচনায় দেখা গিয়েছে ভাড়া কম হলে অধিক যাত্রী সেটি ব্যবহার করে এবং আয়ও আসে বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে মেট্রোর ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র লক্ষণীয়। গত বছরই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) মেট্রোরেলের জন্য কিলোমিটারপ্রতি ভাড়ার প্রস্তাব করেছিল ২ টাকা ৪০ পয়সা। এ বিবেচনায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ভাড়া হওয়ার কথা ৪৮ টাকা ২৫ পয়সা, যা বাস ভাড়ার চেয়ে কম। কিন্তু এখন বাস ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে মেট্রোরেলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার যানজট কমানো, সড়কের ওপর চাপ হ্রাস ও মানুষকে যাতায়াতে স্বস্তি প্রদান। আর মেট্রোকে লাভজনক করা পরোক্ষ লক্ষ্য। বর্তমানে নির্ধারিত ভাড়ায় প্রথম দিকে কিছু যাত্রী পাওয়া গেলেও ধীরে ধীরে সেটি কমে আসার শঙ্কা রয়েছে। করোনাসহ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতির কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে মানুষ যাতায়াতের জন্য বাড়তি ব্যয় করবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চাকরিজীবী ও দৈনন্দিন যারা যাতায়াত করেন মূলত তারাই এটি ব্যবহার করবেন। অর্থাৎ মাসে ২২ থেকে ২৬ দিন মেট্রো ব্যবহার করবেন। এক্ষেত্রে তার ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। ফলে তারা বাসমুখী হয়ে পড়বে। এতে সড়কে চাপ কমবে না, আবার মেট্রোর আয়ও বাড়বে না। এমন পরিস্থিতিতে ভাড়া নির্ধারণে শুধু লাভ বা পরিচালন ব্যয়কে বিবেচনায় না রেখে অন্য আনুষঙ্গিক বিষয় যেমন যানজট, সড়ক পরিবহনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মানুষের আয়, মূল্যস্ফীতি প্রভৃতি আমলে নেয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সড়ক পরিবহনের চেয়ে মেট্রোরেলের ভাড়া অপেক্ষাকৃত কম। যাত্রী আকর্ষণের জন্যই এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। থাইল্যান্ড, চীন, হংকং, জাপান, ইংল্যান্ডে মেট্রো খুবই জনপ্রিয় দ্রুততা ও স্বল্প ব্যয়ের কারণে। ভারতের বিভিন্ন শহরে মেট্রোরেল রয়েছে। এর মধ্যে কলকাতায় ইস্টওয়েস্ট মেট্রোরেলের ভাড়া প্রথম দুই কিলোমিটার ৫ রুপি ও পরবর্তী তিন কিলোমিটার ১০ রুপি। এর পরের পাঁচ (৬-১০) কিলোমিটার ভাড়া ২০ রুপি ও বাকি সাড়ে ছয় (১১-১৬.৫) কিলোমিটার ৩০ রুপি। অর্থাৎ সাড়ে ১৬ কিলোমিটার মেট্রোরেলে ভ্রমণ করলে ভাড়া দিতে হবে ৬৫ রুপি বা প্রায় ৭৫ টাকা। এতে প্রতি কিলোমিটার গড় ভাড়া পড়ে ৪ টাকা ৫৫ পয়সা। হায়দরাবাদ মেট্রোরেলের প্রথম দুই কিলোমিটার ভাড়া ১০ রুপি ও পরবর্তী দুই কিলোমিটার ৫ রুপি। এর পরের দুই (৫-৬) কিলোমিটার ভাড়া ১০ রুপি, তার পরের দুই (৭-৮) কিলোমিটার ৫ রুপি ও তার পরের দুই (৯-১০) কিলোমিটার ৫ রুপি। আর পুরো মেট্রোরেল রুটটি ২৬ কিলোমিটার। এ রুটে ভাড়া গুনতে হবে ৬০ রুপি বা ৭০ টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি গড়ে ভাড়া পড়ে ২ টাকা ৬৯ পয়সা। বাংলাদেশে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি। স্বল্প দূরত্বে, ফার্মগেট থেকে শাহবাগ গেলেও ২০ টাকা পরিশোধ করতে হবে যাত্রীদের।

আইন অনুযায়ী মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলা হচ্ছে। প্রথমত, জনগণের সামর্থ্য বা সক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য যে ব্যয় হবে সেটি তুলে আনা। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বলছে, করোনা ও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়েছে। নির্দিষ্ট আয়ের ব্যক্তিরা নানা ব্যয় কাটছাঁট করছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চহারে ভাড়া নির্ধারণ করলে সেটি যাত্রী আকর্ষণে সক্ষম নাও হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। এতে মেট্রোরেলের অন্যতম উদ্দেশ্য যানজট নিরসন কঠিন হয়ে পড়বে। মেট্রোকে বেসরকারি বাস মালিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। মেট্রোর ভাড়া নির্ধারণে কৌশলী হওয়া গেলে বাসের ভাড়াও যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসবে। যেমনটি ঘটেছে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় লঞ্চের ভাড়া এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা কমে আসে, এমনকি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও লঞ্চ মালিকরা ভাড়া বাড়াতে চাননি। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া আদায় করা হচ্ছে লঞ্চে। আইন প্রয়োগ করে এটি সম্ভব হয়নি, সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে। তেমনি মেট্রো চালুর মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরে বাস ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং বাস মালিকদের নৈরাজ্যও কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সে জন্য প্রয়োজন ছিল মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণে কৌশলী হওয়া। মেট্রোর ভাড়া অবশ্যই বাসের চেয়ে কম নির্ধারণ করতে হবে। প্রথম দিকে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হলেও যাত্রী বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এটি আর দিতে হবে না।

শুধু ভাড়া দিয়ে মেট্রোরেল লাভজনক করা যায় না। তার সঙ্গে কতগুলো জিনিস সংযুক্ত রয়েছে। স্টেশনে কমার্শিয়াল স্পেস। টিওডি বা ট্রান্সপোর্ট অব ইন্টার ডেভেলপমেন্ট। তার সঙ্গে স্টেশন প্লাজা। এই তিনটি বিষয় যদি করা যায় তাহলে যে ঘাটতিটা থাকবে, সেটা সেখান থেকে মেটানো যাবে। এভাবেই দেখা গিয়েছে সারা বিশ্বে অধিকাংশ মেট্রো লাভজনকভাবে চলছে। দেশে যেসব ট্যাক্সিক্যাব ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা নামানো হয়েছে সেগুলো জনবান্ধব করা যায়নি বলেই জনমানুষের পরিবহনে পরিণত হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়েই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে মেট্রোরেল বাস্তবায়ন করছে সরকার। আগে বিবেচনায় নিতে হবে এ বাহনগুলোকে গণবান্ধব পরিবহনে পরিণত করতে হলে কী ধরনের ভাড়া কার্যকর করা উচিত। এক্ষেত্রে আশপাশের দেশগুলোর মেট্রোরেলের ভাড়া পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বেশি ভাড়া হলে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে। এতে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ জলে যাবে। এরই মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর চক্রাকার নৌযান এবং শুল্ক প্রত্যাহার করে নামানো ট্যাক্সিক্যাবেও দেখেছি। যেগুলো এখন উধাও হয়ে গিয়েছে। যাত্রীবান্ধব না হওয়ায় মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যাত্রী সামর্থ্যের বাইরে চলে গেলে তা জনমানুষের বাহনে পরিণত হয় না। ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

ভাড়া বেশি হলে মেট্রোয় যাত্রী মিলবে না, আয়ও কমবে। ফলে মেট্রোর লাভজনক হওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পাবে। মেট্রোর অন্যতম লক্ষ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যাবে। মেট্রোর ক্ষেত্রে যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার মধ্যে স্বল্প ব্যয়, দ্রুতগতি ও নির্ভরযোগ্যতা অন্যতম। এর একটি কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে মেট্রোর আকর্ষণ ধূসর হতে সময় লাগবে না। মেট্রোরেল চালু হতে আর কয়েক মাস বাকি রয়েছে। আশা করি কর্তৃপক্ষ মেট্রোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া নির্ধারণে আরো কৌশলী হবে। ঢাকার যানজট নিরসন ও গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে মেট্রোর ভাড়া আরো কমানো দরকার। এক্ষেত্রে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, মানুষের আয়, মূল্যস্ফীতি প্রভৃতি বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। নইলে মেট্রোরেলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। খেয়াল রাখতে হবে মেট্রো যেন সরকারের বোঝায় পরিণত না হয়।