আমার বাসায় গৃহসহকারী হিসেবে যে মানুষটি কাজ করেন তার দুটি সন্তান। ছোটটির বয়স দুই ও বড়টির ১১ বছর। যেহেতু শিশু দুটির মা রোজ সকালে কাজে বের হয়ে যান, তাই ছোট সন্তানটিকে দেখভালের জন্য বড়টির স্কুল বন্ধ হয়েছে। তা না হলে ওইটুকু শিশুকে বাড়িতে রেখে কাজে আসতে পারতেন না তিনি। যেহেতু তার স্বামী তেমন কিছু করেন না, তাই সংসারের প্রয়োজনে বড় সন্তানের লেখাপড়া জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে তাকে। এর আগে যিনি আমার বাসায় কাজ করতেন তার অবস্থাও কাছাকাছি। তার নয় বছরের ছেলেটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু মা সারাদিন বাসায় থাকে না আর বাবা থেকেও নেই; তাই তার দিন কাটে এদিক-সেদিক ঘুরে ঘুরে। সকালে মা কাজে বের হওয়ার আগে ছেলেটিকে ২০-৩০ টাকা দিয়ে আসেন। সেটা দিয়েই সে সারা দিন এটা-সেটা কিনে খায়। ভাত-সবজি-মাছ বা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার আর খাওয়া হয় না তার। ফলে নয় বছরের ছেলেটিকে দেখায় পাঁচ বছরের শিশুর মতো।


ঢাকায় আসার পর থেকে আমি যে কয়জন গৃহসহকারী পেয়েছি, তাদের প্রত্যেকের অবস্থাই কম-বেশি এ রকম। ঢাকায় বিভিন্ন বাসায় গৃহসহকারী হিসেবে কাজ করা ও পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের একটি বড় অংশই তাদের সন্তানদের গ্রামে বাবা-মা অথবা শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে রেখে আসেন। এতে অন্তত সন্তানের তিনবেলা ঠিকঠাক খাবার, লেখাপড়া আর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাবা-মায়ের সঙ্গে হয়তো তাদের দেখা হয় বছরে সাকুল্যে দুবার। ফলে সারা দিন মাথায় সন্তানের ভাবনা রেখেই দিন কাটে মায়ের। নিজে মা হওয়ার পর এ সত্যের দেখা পাই আমি। মনে হয়, কর্মজীবী মায়েদের মনের অবস্থা বুঝতে গানের এ কলিটিই যথেষ্ট—‘দুই দিকে দুই খণ্ড হয়ে, যাই আবার যাই না’।


শুধু শ্রমজীবী নারী কেন, করপোরেট, সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মী, শিক্ষিত-উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদ বা উচ্চমর্যাদা; কোনো পরিচয়ই কর্মজীবী মায়ের দুশ্চিন্তা কমাতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক হোক আর অপ্রাতিষ্ঠানিক; বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা বলছে, দেশের জিডিপিতে সরাসরি নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। আর যদি সংসারের ভেতর-বাইরের কাজের মূল্য যুক্ত করা হয় তাহলে এ অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ। দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে, নারীর অংশগ্রহণে অর্থনীতি গতি পেয়েছে, জিডিপির উন্নয়ন হয়েছে, বিশ্বের বুকে বলার মতো অবস্থান হয়েছে। কিন্তু আদৌ কর্মজীবী মায়েদের চিন্তা কমেছে? কিংবা অন্যভাবে বললে, মাকে চিন্তামুক্ত করতে কোনো পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পরিসরে নেয়া হয়েছে?


নারী সন্তানধারণ করেন বলে নানাভাবে তাকে, তার মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করা হয়। কিন্তু আমি বলি, এসব আদতে ফাঁকা বুলি। কর্মজীবী মায়ের জীবন সহজ করতে কেউ পাশে দাঁড়ায় না; না সমাজ, না রাষ্ট্র, না ব্যবস্থা। নারীর যুদ্ধ কেবল তার একার, ভাগ্য ভালো হলে যুদ্ধে শামিল হন স্বামী, সঙ্গী অথবা পরিবার।


বছর দুয়েক আগে একটি বেসরকারি সংস্থা আয়োজিত মতবিনিময়ে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে কোনো কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মী থাকলে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র খোলার বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে সরকারকে চাপ দেয়ার নীতি তৈরির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমি বলেছিলাম, এমন নিয়ম করলে উল্টো নারীর জন্য বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তখন দেখা যাবে, নারী কাজেরই সুযোগ পাচ্ছেন না। কারণ নারী নিয়োগ দিলেই ডে কেয়ার সেন্টার খুলতে হবে, তার চেয়ে তো নিয়োগ না দেয়াই ভালো। এমনিতেই সমান যোগ্যতার নারী-পুরুষের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে পুরুষটি এগিয়ে থাকেন। যোগ্যতার মানদণ্ডে সন্তান আর সংসার নারীকে পিছিয়ে দেয়। সেখানে আর নতুন করে কোনো শর্ত আরোপের পক্ষপাতি নই আমি।


এ মুহূর্তে ঢাকায় কর্মজীবী মায়েদের জন্য সরকারি উদ্যোগে যে কয়টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বেসরকারি ডে কেয়ার সেন্টারগুলো সবার সাধ্যের মধ্যে নয় কিংবা সেগুলোর সময়সূচির সঙ্গে ট্রাফিক জ্যামের এ শহরে মা-বাবার কাজের সময়সূচি মেলে না। আবার কর্মক্ষেত্রে ডে কেয়ার সেন্টার খুলতে বাধ্য করাও কোনো সমাধান নয়। কারণ আমাদের শহর বা সমাজ কোনোটিই শিশুবান্ধব নয়। ধরে নিই যদি আমার অফিসেই ডে কেয়ার সেন্টার খোলা হয়, তাহলে আমি আমার সন্তানকে সেখানে আনব না। কারণ স্কুল শেষে একদফা রিকশা আর দুই দফা বাস বদলে তাকে রোজ আমার অফিসে আনা সম্ভব না। ঢাকার লোকাল বাসে যেখানে নিজেরই উঠতে, সিট পেতে জান বের হয়ে যায়; সেখানে ছয় বছরের ছোট্ট প্রাণকে কেনইবা এত কষ্ট দেব?


আমি পত্রিকায় কাজ করি বলে রোজ দুপুরের পর অফিস করার সুযোগ পাই। সকালে ছেলেকে স্কুলে আনা-নেয়ার দায়িত্বটুকু পালন করতে পারি নিশ্চিতে। কিন্তু রোজ কত মাকে দেখি, তাদের গল্প শুনি যে সন্তান জন্মের পর চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। যারা চাকরি করেন তাদের বাসায় এনে রাখতে হয়েছে মা-বাবা কিংবা শ্বশুর-শাশুড়িকে, যারা নাতি-নাতনিকে আনা-নেয়ার কাজটি করেন। যাদের কেউ নেই বা যাদের পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা শহরে এসে বসবাসে ইচ্ছুক নন, তারা ঢিবঢিবে বুক নিয়ে গৃহসহকারী বা ড্রাইভারের হাতে ছেড়েছেন সন্তানকে স্কুল থেকে আনা-নেয়ার ভার। আর যারা কোনো ব্যবস্থাই করতে পারেননি, তাদের সন্তান স্কুলে যায় খাঁচাসদৃশ স্কুলভ্যান নামের বাহনে চড়ে। সন্তানকে বাড়িতে গৃহসহকারীর কাছে নিরাপদ রাখতে কেউ কেউ বাড়িজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছেন, কাজের ফাঁকে একটু পর পর মোবাইলের স্ক্রিনটা খুলে দেখে নেন সন্তান খাওয়া-দাওয়া করল কিনা, গোসল করেছে কিনা, নির্যাতিত হচ্ছে কিনা। আদতে এতে কোন কাজটা মন দিয়ে হয়? না মা হিসেবে মন শান্ত হয়, না কর্মী হিসেবে মনোযোগ দিয়ে কাজটি করা যায়।


এত কষ্ট করে বড় করা সন্তানই যখন বিজ্ঞানী-চিকিৎসক-ক্রিকেটার-প্রকৌশলী-শিল্পী হয়ে নিজের নামে উজ্জ্বল হবে, তখন দেশের মানুষ তাকে মাথায় তুলে রাখবে। রাষ্ট্র তাকে সম্মাননা দেবে, সাক্ষাৎকার নেবে, পত্রিকায় বড় করে ছবি ছাপা গবে। অথচ কেবল আমরা কর্মজীবী মায়েরা জানব, এ সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেনি কেউ। ডে কেয়ার সেন্টার তো অনেক দূরের কথা, মায়ের চলার পথ মসৃণ করতে কর্মক্ষেত্রের সিস্টেমে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়নি। জ্বর বা শরীর খারাপ নিয়েও মা অফিস করেছেন, কারণ সিক লিভ জমিয়ে রাখতে হয় সন্তানের অসুস্থতার জন্য। এমনকি আমার গৃহসহকারী মাকেও দেখি, লো প্রেসার নিয়ে কাজে আসছেন। এসে হয়তো আমার মায়ের কাছে একটু স্যালাইন পান করতে চান। তারপর নিজেকে শক্ত করে কাজ শুরু করেন। কারণ তার ছোট সন্তানটি অসুখে পড়লে মা ছাড়া বোঝে না। তাই নিজের ছুটি তিনি জমিয়ে রাখেন সেই সময়ের জন্য। কর্মজীবী মায়ের এ বন্ধুর পথচলায় কেউ সহযাত্রী হয় না, বরং মাকে বলা হয় তুমি দুর্গা; কী চমৎকার করে দুই হাতে ১০ হাতের কাজ সামলে ফেলছো। আর দুর্গা হওয়ার তাড়নায় মা ভুলতে বসে, দুর্গতিনাশিনীকে ফি বছর ডুবতেই হয় জলে।


এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কর্মজীবী মায়েরা আসলে কী চান? অনেকের সঙ্গে কথা বলে, অভিজ্ঞতা-অনুভূতি ভাগ করে আমার মনে হয়েছে, মায়েদের মূল চাওয়া নিরাপত্তা। যেন সন্তানকে নিরাপদে তিনি বাড়িতে রেখে আসতে পারেন, ডে কেয়ারে রাখতে পারেন বা পথে নিয়ে নামলে সেখানেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাটুকু পান। সেই সঙ্গে এমপ্যাথি, যার আক্ষরিক অর্থ অন্য কোনো ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি বোঝার ও তার অংশীদার হওয়ার ক্ষমতা। সন্তানের অসুস্থতাকে মায়ের দুর্বলতা হিসেবে না দেখা, মা হয়েছেন বলে তাকে কম যোগ্য জ্ঞান না করা, কর্মজীবী মায়ের জন্য কর্মক্ষেত্রভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা, গণপরিবহনগুলোয় শৃঙ্খলা আনা, ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা, এ ছুটি যেন নারীকে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে না দেয় সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা। আমি জানি এসব চর্বিতচর্বণ। তবু যতদিন পর্যন্ত কর্মজীবী মায়ের পাশে সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা না দাঁড়াচ্ছে; ততদিন পর্যন্ত তো বলে যেতেই হবে, তাই না?

লেখক: সাংবাদিক