বর্তমানে বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। ফলে কৃষি, ইলেকট্রনিকস, অটোমোটিভস এবং ডিজিটাল অর্থনীতি খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশ এবং জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে চলেছে। এ অর্জন বাংলাদেশের সর্বোপরি উন্নয়নে সুসংবাদ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যে বিশেষ সুবিধা এতদিন পেয়ে এসেছে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। উন্নয়ন প্রক্রিয়া চলমান রাখার সঙ্গে সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা মোকাবেলা করার জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করা হয় উৎপাদনে উচ্চমূল্যের কার্যক্রম, উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং দক্ষতা এবং গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে অংশগ্রহণ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা বা লাভ বৃদ্ধির জন্য একটি পদক্ষেপ হিসাবে।

গত অর্ধ শতাব্দীতে খুব কম মধ্যম আয়ের দেশ উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘চায়না ২০৩০’ রিপোর্ট অনুসারে, ১৯৬০ সালে ১০১টি মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৪টি উচ্চ আয়ের দেশে পরিনত হয়েছে। বেশির ভাগ মধ্যম আয়ের দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতির সম্মুখীন হয়েছে। একটি টেকসই ভিত্তিতে মধ্য আয় থেকে উচ্চ আয়ের স্তরে যাওয়ার জন্য ফ্যাক্টর-চালিত থেকে উদ্ভাবনচালিত উৎপাদনশীলতায় পরিবর্তন প্রয়োজন। মধ্যম আয়ের দেশ মানসম্মত, শ্রমনিবিড় পণ্যে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। কারণ মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও তারা নিম্ন উৎপাদনশীলতার ফলে বিস্তৃত পরিসরে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ফলস্বরূপ তারা এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে যায়, যা ‘মিডল ইনকাম ট্র্যাপ’ বলে পরিচিত। বিস্তৃত উদ্ভাবন ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উচ্চ-মধ্যম আয়ের পর্যায়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় এবং চেষ্টার প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে চায়। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘রূপকল্প ২০৪১’। বাংলাদেশের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এ দুষ্টচক্র এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সমর্থন এবং আপগ্রেডিং জোটের (আপগ্রেডিং কোয়ালিশন) উত্থান প্রয়োজন।

স্পেন ও কোরিয়া আপগ্রেডিংয়ের মাধ্যমে উন্নত দেশের মর্যাদায় পৌঁছেছে। দুটি দেশ ষাট এবং সত্তরের দশকে রাষ্ট্রনির্দেশিত চেষ্টায় শিল্পায়িত হয়েছিল, যা জাহাজ নির্মাণ, ইস্পাত, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিকস এবং অটোমোটিভ শিল্পের মতো অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছিল। আপগ্রেড করার জন্য এ শিল্প এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর, টেকসই সমন্বয় প্রয়োজন। স্পেন ও কোরিয়া দেশের অর্থনীতি আপগ্রেড করার জন্য ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছিল। স্পেন একটি পথ বেছে নিয়েছিল যা এফডিআই, প্রযুক্তিগত আউটসোর্সিং এবং ইউরোপের সঙ্গে একীকরণের ওপর ভিত্তি করে ছিল। এ পদ্ধতিটি ব্যাংকিং এবং টেলিকমিউনিকেশনের  মতো জটিল পরিষেবা খাতে উন্নয়ন করলেও উৎপাদন ক্ষমতায় তীব্র হ্রাস ঘটায়। বিপরীতে কোরিয়া প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর ভিত্তি করে একটি স্ট্রাটেজি অনুসরণ করেছে. যা উৎপাদন খাতে আপগ্রেডকে সমর্থন করে।

বাংলাদেশ আর ভিয়েতনামের যাত্রা শুরু হয়েছিল কাছাকাছি সময়ে এবং অভিন্ন একটি যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে। কিন্তু বর্তমানে ভিয়েতনাম এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। ভিয়েতনাম ‘ওপেন-ডোর’ নীতি থেকে উপকৃত হয়েছে এবং দেশটি গত তিন দশকে একটি বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য বিদেশী ব্যবসা যেমন ইন্টেল, স্যামসাং, অ্যাডিডাস এবং নাইকি এরই মধ্যে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করেছে। দেশটি এরই মধ্যে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ফুটওয়্যার রফতানিকারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ভিয়েতনামের অর্থনীতির উন্নয়নের পেছনে তিনটি উদ্যোগ ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমত, দেশটি অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বাণিজ্য উদারীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এশিয়ান এবং পশ্চিমা উভয় দেশের সঙ্গে অনেক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর বাণিজ্যের ধীরে ধীরে দেশটির উদারীকরণের ইঙ্গিত দেয়। ভিয়েতনাম ৭২টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করেছে এবং ১৬৫টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, ভিয়েতনাম বাহ্যিক উদারীকরণের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয় করেছে। ২০০৭ সালে ভিয়েতনাম ডুয়িং বিজনেস সূচকে ১০৪তম স্থানে ছিল। ওই  গবেষণা দেশটির কয়েকটি প্রধান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছিল। সরকার এ সূচকগুলোকে নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং ভিয়েতনাম ২০২০ সালে ডুয়িং বিজনেস জরিপে ৭০তম অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। এবং তৃতীয়ত, ভিয়েতনাম মানবিক ও সামাজিক পুঁজিতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। ফলে একটি দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে উঠেছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে ভিয়েতনামের শ্রমিক শ্রেণীর মজুরি ও উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ভিয়েতনামের মানব উন্নয়ন সূচক ২০২০ সালে শূূূন্য দশমিক ৭০৬-এ পৌঁছে গিয়েছে, যা ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ৬৮২ ছিল। এর মাধ্যমে ভিয়েতনাম মানবসম্পদ উন্নয়নের উচ্চস্তরের দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

এ দেশগুলোর সাফল্য আমাদের অনুপ্রাণিত করলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শ্রম ও মজুরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে। তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত, যা দেশের রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশ, মূলত সস্তা এবং স্বল্প দক্ষ শ্রমের ওপর ভিত্তি করে। এ খাতের  ওপর এ ধরনের অত্যধিক নির্ভরতা বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনার জন্য উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির মতো বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ এন্টি এক্সপোর্ট বায়াস, উচ্চমানের বিদেশী বিনিয়োগের অভাব এবং বাণিজ্য সুবিধার অভাব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রফতানি বহুমুখীকরণে একটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের জন্য তুলনামূলক অনুকূল নীতিমালা এবং সুযোগ-সুবিধার কারণে বেশির ভাগ উদ্যোক্তা এখনো এক্ষেত্রে নিয়োজিত। আমাদের দেশের অর্থনীতিকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির মানোন্নয়নে উন্নয়ন উদ্ভাবনভিত্তিক হওয়া দরকার যার জন্য অত্যন্ত দক্ষ জনবল প্রয়োজন। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। ১৩০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ১০ বছরে ৪১৬ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হয়েছে। উদ্যোক্তা, সরকার এবং প্রতিটি নাগরিক বিভিন্নভাবে ভূমিকা পালন করলেও, একটি ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার অভাব সবসময়ই পরিলক্ষিত হয়েছে। একা একটি খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাতে পারবে না: এর জন্য একাধিক স্টেকহোল্ডারদের একটি সমন্বিত এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।  রফতানিতে কেবল তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বৈচিত্র্য আনতে হবে। ইলেকট্রনিকস, অটোমোটিভস এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো রফতানি ঝুড়িকে বৈচিত্র্যময় করার উচ্চসম্ভাবনাসহ বেশ কয়েকটি শিল্প রয়েছে, এ শিল্পগুলোকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য নীতিনির্ধারণ পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন ও উচ্চমূল্যের পণ্যের উচ্চ পর্যায়ের শিল্পে দক্ষ জনশক্তি প্রদানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। ভোকেশনাল শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব এবং সামাজিক পুঁজিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। এছাড়া বর্তমানে কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যা (১৫-৫৯) বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি। ফলে আমাদের তরুণদের সামনে রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তাই অর্থনৈতিক উন্নতির প্রক্রিয়ায় তাদের অবশ্যই একটি শক্তিশালী অংশগ্রহণমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। ‘কোয়ালিশন ফর আপগ্রেডিং বাংলাদেশ ইকোনমি’ (কিউব) শিরোনামে ইয়ুথ পলিসি ফোরাম (ওয়াইপিএফ) একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের এ উদ্যোগটি নেয়ার পেছনে মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্য তরুণ, সরকারি ও বেসরকারি খাত, সরকার, একাডেমিয়া, মিডিয়া এবং সব প্রাসঙ্গিক স্টেকহোল্ডারের মধ্যে একটি জোট গঠন করা। গত ২১ জুন ঢাকার এমসিসিআই মিলনায়তনে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতির বহুমুখী উন্নয়নে যৌথ জোটের গুরুত্ব ও নানাবিধ প্রভাবের ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি খাতের সব প্রতিনিধি আলোচনা করে কিউবের ভিত্তি স্থাপন করেন। বর্তমানে ওয়াইপিএফ CUBE-এর মাধ্যমে একটি যৌথ সক্রিয় জোট গঠনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এ অভাবনীয় উন্নয়নের গতিকে সমুন্নত রাখতে সামনের দিনগুলোয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূূমিকা রাখবে দেশের তরুণ প্রজন্ম। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের গতিপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন সামনে রেখে কিউবের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দিকনির্দেশক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

লেখকদ্বয় যথাক্রমে ইয়ুথ পলিসি ফোরামের (ওয়াইপিএ) গবেষক