২০২২ সালে বাংলাদেশের যেমন কিছু সাফল্য আছে, তেমন আছে কিছু ব্যর্থতা। আগের বছরের মতোই ২০২২ সালেও বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে এগিয়েছে। উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশেরই প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। অথচ এমন দুঃসময়েও বাংলাদেশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন ঘটেছে। রফতানি আয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বড় বড় অবকাঠামো বাস্তবায়ন হয়েছে। অনেক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। শিক্ষার্থীরা আবার ক্লাসে ফিরেছে। নতুনভাবে শুরু হয়েছে তাদের জীবন গড়ার প্রস্তুতি। নতুন বছরে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জও। উচ্চমূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ হ্রাস, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে সঠিক নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সবকিছুর পরও প্রত্যাশা থাকবে, সাফল্যের পথে আগামী বছরও বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হবে।

গত কয়েক বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, নবীনগর ডিইপিজেড-চন্দ্রা-যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, মিরপুর ফ্লাইওভার, হাতিরঝিল, হানিফ ফ্লাইওভার, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, বনানী ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল করছে। মেট্রোরেল চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে যেমন যানজট কমবে, তেমনি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণে জ্বালানি ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হবে। কমে আসবে পণ্য পরিবহন ব্যয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকার আগামীর বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি জনশক্তি স্মার্ট হবে। তারা প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার সরকার আগামী দিনে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সরকারি সেবাদানের প্রায় সব ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স চালু করবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘২০৪১ সাল নাগাদ আমরা তা করতে সক্ষম হব এবং সেটা মাথায় রেখেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন জাতিকে দেখাচ্ছেন সেখানে মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে দেশের তরুণ সমাজকে। তবে স্মার্ট বাংলাদেশ মানে কেবল ফোর/ফাইভজি সেবা আর শক্তিশালী স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি নয়। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ই-গভর্ন্যান্স সিস্টেম চালু করতে হবে। আবার শুধু চালু করলেই হবে না, তা ব্যবহারে বিদ্যমান জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি অথবা নতুন দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে তারুণ্যের শক্তিকে যথাযথ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে। আমাদের তারুণ্য এখনো একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে। উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার মতো সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক মনোভাবের জাগরণ এখনো দেশের তারুণ্য ও সমাজের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠেনি। সেখানে সরকারের কিছু সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে এখনো শিক্ষার্থীদের দিয়ে ‘সৃজনশীল প্রজেক্ট’ করানোর জন্য কোনো প্রণোদনা বা সহায়তা দেয়ার মতো উদ্যোগ বা বাজেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নেই। এখানে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ বলতে কেবল ঢাকা মহানগর কিংবা কিছু বড় বড় শহরকে বোঝালে হবে না, বাংলাদেশ মানে সারা দেশ, পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ জনপদ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) স্লোগান ‘বাদ যাবে না কেউ’-এর প্রতিফলন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনায় সুগভীরভাবে সন্নিবেশিত করতে হবে। এর ফলে আমরা দক্ষ শ্রমশক্তি বিদেশে রফতানি করতে পারলে আমাদের প্রবাসী আয় আরো বৃদ্ধি পাবে। আরএমজির ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে এবং আমাদের অর্থনীতি ঝুঁকির বাইরে থাকবে। সরকার বলছে, ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্স’ নির্বাহী কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা দেবে। বিশেষ করে রফতানিমুখী কৃষিতে ‘স্মার্ট প্রযুক্তির’ ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষিমন্ত্রী, এটুআই প্রকল্প এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ আলোচনা ও উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা নির্ণয়, গাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে মাটিতে সার প্রয়োগের ব্যবস্থা চালু করার মতো উচ্চাভিলাষী কথাও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে নাগরিক সমাজের পাশাপাশি সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও অপচয় কমানোর লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উন্নততর প্রযুক্তিভিত্তিক ও ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম গ্রহণ করার ওপর জোর দিতে হবে। সরকারের টাকা যে জনগণের কষ্ট করে উপার্জিত টাকার ওপর দেয়া ‘ট্যাক্স বা কর’ থেকে অর্জিত এবং জনগণের দেয়া সে অর্থ যে গুরুত্বপূর্ণ আমানত, সেটা মনে রেখে সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও কৃচ্ছ্রতা সাধন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে, সর্বস্তরে ‘ডিজিটাল বা স্মার্ট কারচুপি’ যেন না হয় সে ব্যাপারে সরকার প্রযুক্তির সর্বোত্তম স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। রফতানিতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবানুগ স্মার্ট ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে।

সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও কৃচ্ছ্রতা সাধন জোরদার করতে হবে কারণ সেটা জনগণের টাকা। রাষ্ট্র কোথায় টাকা খরচ করবে, কোন প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাবে সেটা দলীয় স্বার্থে নির্ধারণ করা ঠিক নয়। রাষ্ট্রের স্বার্থ তথা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অধিকার সবার আগে। এরই মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন, গাড়ি, মোবাইল বিল ইত্যাদি খাতে ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সবসময় সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতা সাধনের কথা বলেন, ঘুস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা বলেন, কিন্তু তাতে খুব বেশি কাজ হচ্ছে বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। আমরা সে কারণে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ তথা সরকারি ব্যয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষাকে স্বাগত জানাচ্ছি। এটা মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের মানুষ উদার বটে কিন্তু তারা বোকা নয়। তারা ভালো সরকার চায়, ভালো ব্যবস্থাপনা চায়, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি চায়। সেই লক্ষ্যটাকে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জানাই।

বিগত বছরটি রাজনীতির দৃষ্টিতে সুখকর ছিল না। সামাজিক অস্থিরতা সবসময় তাড়া করেছে। জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই রাজনীতির প্রভাব প্রত্যক্ষ। রাজনীতি স্বচ্ছ হলে অর্থনীতি, সমাজ ও উন্নয়ন সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকে। তাই নতুন বছরের অঙ্গীকার হোক গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ ধরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার শপথ। এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে পারলে নতুন বছর হবে জাতির জন্য একটি মাইলফলক, স্বাধীনতা হবে অর্থবহ। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার পূরণে জাতি এগিয়ে যাবে। নববর্ষের প্রকৃত আবেদন তখনই সার্থক হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বৈষম্যহীন, সবার জন্য সমান সুযোগ এবং মানবিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এমন কাঠামো প্রত্যাশা। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ঘোষণা যেন সেই কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক হয় সে দাবি জানাই। প্রধানমন্ত্রী সরকার তথা জনগণের অভিভাবক। বর্তমান সরকার যদি বৈষম্যহীন, সর্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে মনোনিবেশ করে তাহলে জনগণ আগামীতে নতুন ভাষায় স্লোগান ধরবে না। ক্ষমতাসীন দলের নতুন কমিটিকে সে জায়গায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি সব ক্ষেত্রে সবসময় মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন স্বদেশ গড়ার জন্য কাজ করার আহ্বান জানাই। সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সবার জীবন সুন্দর ও সমৃদ্ধ হোক। সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে, কাউকে বাদ দিয়ে বা পেছনে ফেলে নয়। অগ্রাধিকার বুঝতে ব্যর্থ হলে বিপদ বাড়বে। বৃহত্তর স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হবে, নতুন বছরে এটাই প্রত্যাশা। 

নতুন বছর ২০২৩। জীর্ণ পুরনো ধুয়ে-মুছে শুরু হোক আমাদের নতুন বছরের নতুন পথচলা। পুরনো বছরে অনেক ব্যর্থতা ছিল, আবার ছিল অনেক সাফল্যও। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বছরে আমাদের নবযাত্রা আরো সফল হবে এমনটিই প্রত্যাশা সবার। শুভ হোক, সুন্দর হোক নতুন বছর। নতুন বছরে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে, এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। সাফল্যের পথে ২০২৩ সাল হোক একটি মাইলফলক। স্বাগত ২০২৩।