আড়াই বছর ধরে বিশ্বে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে চাহিদা ও জোগান কিংবা চাহিদা-জোগান উভয় সংকটের কারণে। বর্তমানে জ্বালানি বাজার ঘিরে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা মানুষ হিসেবে আমাদের ক্ষুদ্র মানসিকতা এবং একপেশে ও সংকীর্ণ বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন।

বিশ্বব্যাপী কভিড মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ ব্যারেলপ্রতি ৬৪ ডলার থেকে কমে ২০০০ সালের এপ্রিলে ১৪ ডলারে নেমে আসে। এর দুই বছর পর, ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যা ব্যারেলপ্রতি হয় ১৩৩ ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার মধ্যে এখন আবার তেলের দাম কমছে। তবে চীনের অর্থনীতির ‘শূন্য কভিড নীতি’ দ্বারা প্ররোচিত স্থবিরতা কেটে গেলে তেলের দাম আবার বেড়েও যেতে পারে।

কিন্তু এরপর কী ঘটবে? তাছাড়া বাজার অস্থিরতার এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকরা কীভাবে টেকসই পরিবেশের বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেন?

তেল ও গ্যাসের দাম এতটা অস্থির হওয়ার একটি কারণ জোগানের বিপরীতে জ্বালানির জন্য স্বল্পমেয়াদি চাহিদা দাম পরিবর্তনের দিকে দ্রুত প্রবাহিত হচ্ছে। সুতরাং যখন জ্বালানির সংকট দেখা দেয়, তখন বাজার স্বাভাবিক রাখতে দামের বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

কভিড মহামারী কিন্তু সব সংকটের জননী, এতে বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চাহিদার সবচেয়ে বড় টেকসই পরিবর্তন ঘটছে। কভিডের আগে প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা ছিল ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল কিন্তু লকডাউনের (এবং ভয়ের) কারণে চাহিদা নেমে আসে ৭৫ মিলিয়ন ব্যারেলে। সরবরাহকারীরাও সম্মিলিতভাবে দ্রুত পর্যাপ্ত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। কেননা হঠাৎ করে খনি থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ করা সহজ কাজ নয়। ২০২০ সালের ২০ এপ্রিল তেলের দাম অনেকটা কমে ব্যারেলপ্রতি মাইনাস ৩৭ ডলারে নেমে আসে। কারণ সরবরাহকারীরা ডাম্পিংয়ের জরিমানা এড়াতে চেয়েছিল, পাশাপাশি তাদের মজুদ সুবিধাও হ্রাস পেয়েছিল। 

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দূরে রাখার জন্য বিশ্বব্যাপী উদ্যোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মহামারীর আগে থেকেই নতুন তেল ও গ্যাস উৎপাদনে বিনিয়োগ খানিকটা দুর্বল অবস্থায় ছিল। বিশ্বব্যাংক যেমন আর জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধানে অর্থায়ন করে না, যদিও এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসও রয়েছে, যা ক্লিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম উৎস। তেল ও গ্যাস প্রকল্পগুলোয় সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ কমছে, যা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে বিষয়টি নিয়ে সমস্যা তৈরি হবে না, যদি নীতিনির্ধারকরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে একটি সম্ভাব্য রূপান্তর পরিকল্পনা তৈরি করে থাকে। তবে এটি করা একটি চ্যালেঞ্জও, বিশেষ করে আমেরিকা ও এশিয়ায়।

বিশ্বব্যাপী ৮০ শতাংশ শক্তির উৎস তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস। ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তির সময়ও প্রায় একই অবস্থা দেখা যায়। চলমান দশকে ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা এবং আমেরিকা (বর্তমানে জো বাইডেনের শাসনকালে) দ্রুত সবুজ শক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রশংসনীয় উচ্চ আকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছে। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার ফলে জ্বালানি শক্তি সরবরাহের স্থানচ্যুতি, মহামারী-পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে তেলের চাহিদা ‘ভি’ আকৃতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে মোকাবেলা করার সত্যিই কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না। তাই এ পর্যায়ে আদর্শ সমাধান হবে একটি বৈশ্বিক কার্বন মূল্য নির্ধারণ। অথবা যদি অতিরিক্ত করের বিষয়টি প্রমাণিত হয় তাহলে একটি কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং স্কিম চালু করা।

যদিও বর্তমানে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত বাইডেন প্রশাসন সম্পূর্ণ অন্য পথে হাঁটার কথা বিবেচনা করছে। এরই মধ্যে তারা কংগ্রেসে তিন মাসে গ্যালনপ্রতি শূন্য দশমিক ১৮ ডলার ফেডারেল পেট্রল ট্যাক্স মওকুফের আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে সম্প্রতি ঘোষিত জি৭ পরিকল্পনা মূলত রাশিয়ার তেলের দাম কমানোর নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু রাশিয়া এরই মধ্যে ভারত ও চীনের কাছে খানিকটা ছাড়ে তেল বিক্রি করছে, যা বৈশ্বিক তেলের বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করছে ব্যাপকভাবে।

এই তো কিছুদিন আগে, বাইডেন প্রশাসন মার্কিন জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি রোধ করতে নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার করছিল। অথচ এখন তারা বিদেশী সরবরাহকারীদের মাধ্যমে উচ্চমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন করছে। আমেরিকার বিদেশী সরবরাহকারীদের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবও। একটা সময় মানবাধিকার ইস্যুতে আমেরিকা তাদের পরিত্যাগ করছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে, একদিকে মার্কিন তেলের উৎপাদন সীমিত করে পুণ্যকাজের নাম করছে তারা, ঠিক একই সময়ে অন্য দেশ থেকে উত্তোলনের পরিমাণ বাড়িয়ে আমেরিকা কিন্তু সত্যিকার অর্থে পরিবেশের কোনো উপকার করছে না। এমনকি ইউরোপেও বিশেষ করে জার্মানির মতো দেশগুলো যারা তাদের পরমাণু শক্তিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাদেরও একই ধরনের পরিকল্পনা ছিল। যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তা খানিকটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সব ধরনের উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মতোই, সবুজ জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কয়েক দশকজুড়ে ধারাবাহিক-স্থিতিশীল নীতির প্রয়োজন। কারণ টেকসই নীতি প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রতিশ্রুতিগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করতে সাহায্য করে। যতক্ষণ না বিকল্প শক্তির উৎসগুলো সম্পূর্ণরূপে জীবাশ্ম জ্বালানিকে প্রতিস্থাপন না করতে শুরু করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এমনটা চিন্তা করা সম্পূর্ণ অবাস্তব, ধনী দেশের ভোটাররা এমন নেতাদের পুনর্নির্বাচিত করবে যারা জ্বালানি খরচ রাতারাতি উড়িয়ে দেবে।

তাছাড়া এটাও উল্লেখযোগ্য, প্রতিবাদকারীরা যারা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরানোর জন্য চাপ দিয়ে সফল হয়েছে তারা উষ্ণতা বৃদ্ধি কিংবা এয়ার কন্ডিশনিং বন্ধ করতে প্রায় ততটা জোর লবিং করেছেন বলে মনে হচ্ছে না। শক্তির রূপান্তর ঘটাতে হবে, তবে প্রক্রিয়াটি কিন্তু একেবারেই যন্ত্রণাহীন হবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদে সবুজ জ্বালানি উৎপাদন এবং ভোক্তা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে একটি নির্ভরযোগ্য উচ্চ কার্বন মূল্য নির্ধারণ; বিনিয়োগের উদ্যোগ না করার মতো ছলচাতুরী প্রয়োগ করাটা অনেক কম দক্ষতা এবং অকার্যকরতার পরিচয়। (এছাড়া আমি একটি বিশ্ব কার্বন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানাই, যাতে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকে তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা যায় এবং তারাও যেন পরিবর্তনকে মোকাবেলা করতে পারে)।

এ মুুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে মন্দার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে পারে বলে মনে হচ্ছে। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম মৌসুম চলছে। এদিকে শূন্য কভিড লকডাউন থেকে বেরিয়ে এসে চীনের অর্থনীতিও সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার পর্যায়ে রয়েছে, তাই ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির ফলে মার্কিন প্রবৃদ্ধি তীব্রভাবে কমে গেলেও জ্বালানির দাম যে ক্রমাগত বাড়তে থাকবে তা কল্পনা করাটা কিন্তু খুব একটা কঠিন নয়।

দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ দ্রুত না বাড়ালে জ্বালানির দাম বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। তবে বর্তমান নীতি-নির্দেশিকা অনুসারে তা অসম্ভব বলেই অনুমেয়। সরবরাহ ও চাহিদার ধাক্কা সম্ভবত জ্বালানি শক্তির বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য নীতিনির্ধারকদের স্নায়ুচাপ সহ্য করার মতো শক্ত মানসিক জোর থাকতে হবে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কেনেথ রগোফ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস