ঢাকা শহরের ৯৮ শতাংশ বিপণিবিতানে অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা নেই। এগুলোয় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানি ও ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম নেই। কিছু কিছু শপিং মল ও মার্কেটে অক্সিজেন সিলিন্ডার, পানির রিজার্ভ ট্যাংক, বালিভর্তি বালতি ও রেসকিউ সিঁড়িসহ অন্যান্য অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রীও নেই। এসব নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতারা কিছুটা শঙ্কিত হলেও অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে মালিক সমিতি এবং ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগ যেন একেবারেই উদাসীন। পুরান ঢাকার নিমতলীর পর চুড়িহাট্টা, সিদ্দিকবাজারে ক্যাফে কুইন ভবন থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ড। এর মাঝে আরো প্রায় অর্ধশত অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে খোদ রাজধানীতে। একের পর এক এসব অগ্নিকাণ্ডে ঝরেছে শত শত প্রাণ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। কিন্তু যেসব কারণে সংঘটিত হচ্ছে অগ্নিকাণ্ড, সেই সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে না। আগুনের ঝুঁকি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও অগ্নি আইন (২০০৩) অনুযায়ী ৩০টির বেশি নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করার কথা। কিন্তু কেউ এসবের তোয়াক্কা করছে না, যা উদ্বেগজনক। 

বাংলাদেশের মার্কেট, ভবন মালিক, কারখানা কিংবা কর্তৃপক্ষকে আরো সতর্ক হতে হবে। মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সামগ্রিকভাবে আগুন নেভানো ও জানমালের উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে প্রত্যাশা। তাজরীন গার্মেন্টস থেকে সীতাকুণ্ড কিংবা সাম্প্রতিক বঙ্গবাজার প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত গাফিলতি ও অবহেলা প্রমাণিত হলেও মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট বিষয় তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও দণ্ডের আওতায় আনতে পারছে না রাষ্ট্র। যে কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ প্রদান করে, মামলা হয়, ক্ষতিপূরণ কিছু দেয়া হয়। কিছু ধরপাকড় চলে। দৃষ্টান্তমূলক কিছুই হয় না। প্রতিবারই দেখা যায় প্রতিটি ঘটনায় অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে সর্বস্তরের গাফিলতি থাকে এবং অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে এমন ঝুঁকি মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতিও সেসব জায়গায় থাকে না। বাজার থেকে শুরু করে কারখানা কিংবা বসতবাড়ি বা মজুদাগারের নির্মাণশৈলী এবং অগ্নিনির্বাপণসহ সামগ্রিক নিরাপত্তা দায়সারা গোছেরই থাকে। কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয় না। এমন প্রবণতা অগ্নিদুর্ঘটনার জন্য কোনো অংশে কম দায়ী নয়। প্রতিবার অগ্নিকাণ্ড ঘটার পর নানা ত্রুটির বিষয় উঠে আসে কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো আর আলোচনায় থাকে না। ফলে অন্যান্য বাজার, মার্কেট, ভবন আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ থেকে যায়। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরো সতর্ক, দায়বদ্ধ ও সক্রিয় হতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার সঙ্গে আগুন নেভানোর যথাযথ ব্যবস্থাও থাকতে হবে। 

মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড এড়াতে ভারতের কলকাতায় কয়েকটি মার্কেটের মাটির তলা দিয়ে তার নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুধু মাটির তলা দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নয়, প্রতিটি প্রেমিসেসের মিটারও পৃথক হবে। ব্লক মিটার অর্থাৎ একটি মিটার থেকে একসঙ্গে অনেক লাইন দেয়া হবে না। দ্রুত আগুন নেভাতে প্রতিটি বাজারে গভীর নলকূপ বসাতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পৌরসভা এরই মধ্যে শহরে ৯০টি গভীর নলকূপ বসিয়েছে। বাকি পাঁচটি বসানোর কাজ চলছে। প্রতিটি নলকূপের সঙ্গে ১০০ মিটার লম্বা হোস পাইপ দিয়ে প্রায় পাঁচতলা পর্যন্ত উঁচুতে জল তোলা যাবে। অগ্নিকাণ্ডে ওই গভীর নলকূপ থেকে জলের সংস্থান হবে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দ্রুত আগুন নেভাতে এমন কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। কলকাতায়ও রাস্তার পাশে আগুন নেভাতে পানির লাইন বসানো হয়েছে। উন্নত প্রতিটি দেশে এমন ব্যবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনাতেই এটি নেই। এটি নগর পরিকল্পনার দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ। নতুন গড়ে ওঠা অঞ্চলেও অগ্নিনিরাপত্তার জন্য উন্নত কেন্দ্রীয় কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদাসীনতায় প্রায় প্রতিদিনই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগের উদাসীনতার কারণে জন্ম নিচ্ছে একের পর এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে রাজধানীর শপিং মল ও মার্কেট সম্পূর্ণ অনিরাপদ অবস্থায় থাকায় যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে আরো বড় দুর্ঘটনা।

প্রতিটি ঘটনা আমাদের নতুন বার্তা দেয়। সে বার্তা থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন ও জীবিকা বিকাশের নতুন প্রস্তুতি নিতে হয়। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড থেকে আদতেই সরকার কি কোনো শিক্ষা নিচ্ছে? অগ্নিকাণ্ড ঝুঁকি তৈরি করে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের মতো আপদ-বিপদ সামলে আমাদের দক্ষতা ও প্রস্তুতিকে সামগ্রিকভাবে সক্রিয় করা জরুরি। ভবন, মার্কেট বা গুদামে অগ্নিকাণ্ড বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার। রাসায়নিক বা কাপড়ের মতো দাহ্য পদার্থ দরকার, কারখানা বা মার্কেট ও গুদামও প্রয়োজন। কিন্তু এসব স্থাপনায় কেন অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকবে না? কেন মার্কেট বঙ্গবাজারের মতো ঘিঞ্জি হবে? প্রতিটি অগ্নিনির্বাপণের ঘটনায় বড় অভাব হয় পানির। আগুন লাগা ভবন, কারখানা বা গুদামে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকে না। এমনকি এসব জনবহুল স্থাপনার আশপাশে কোনো উন্মুক্ত অঞ্চল বা জলাধারও থাকে না। কেবল পানির ব্যবস্থা করতে করতেই অনেক কিছু পুড়ে যায়। বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীসহ দমকল বাহিনীর ৫০টি ইউনিটকে সেখানে কাজ করতে হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সেটি সামাল দেয়ার সক্ষমতা কি বাংলাদেশের গড়ে উঠেছে? 

পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ হতাহত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক গুদাম এবং বিভিন্ন কারখানা সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো সরানো হয়নি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। ওই ঘটনায় স্পষ্ট হয়, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ সম্পর্কে গতানুগতিক ভাবনা পরিহার করে আমাদের আরো সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের পর তা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়েন তা হলো পানি সংকট। কাজেই সারা দেশের জলাধারগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটে, সেহেতু সারা দেশের জলাধারগুলোয় শুষ্ক মৌসুমেও পর্যাপ্ত পানি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

নগরের বিপণিবিতানগুলোকে অগ্নিঝুঁকি অনুযায়ী শ্রেণীবিন্যাস করে সাধারণ মানুষকে যথাযথভাবে অবগত করার মাধ্যমে সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি দরকার। বিদ্যমান অগ্নিনির্বাপণ আইন, বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক মার্কেটগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও মার্কেটগুলোর ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে অগ্নিঝুঁকিতে থাকা বিপণিবিতানগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ নির্দেশনার পাশাপাশি সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলোকে যথাযথ নোটিস দেয়ার পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ আইন অনুসারে ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থাকে আইন ও বিধি দিয়ে নির্ধারিত ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিপণিবিতানের মালিক, ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের সরকারি সংস্থাগুলো ও সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদাসীনতা দেখানো যাবে না। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার ও দুর্যোগ প্রতিরোধে পুকুর-জলাশয়-জলাধার সংরক্ষণ করা দরকার। নগর এলাকায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপনে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি মার্কেটের জন্য ইলেকট্রিক্যাল সেফটি অডিটিংয়ের পাশাপাশি অগ্নি প্রতিরোধ ও ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেমকে উন্নত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি মার্কেটে ফায়ার কন্ট্রোল রুম স্থাপনের পাশাপাশি ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও জরুরি নির্গমন প্ল্যান থাকা জরুরি। প্রতিটি বিপণিবিতানের ফায়ার ও ডিজাস্টার ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জনগণের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে মার্কেটের স্বত্বাধিকারী হিসেবে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ছিল মার্কেটের অগ্নিনিরাপত্তার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা নেয়া। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতা এবং উদাসীনতারও দায় আছে, যা দোকান মালিক সমিতি ও ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ২০১৭ সাল থেকে দশবারের মতো নোটিস দেয়ার পরও বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনা ও আইনের শাসনের ভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতার পরিচয় বহন করে। এ অবস্থার লাগাম টানা না গেলে আগামী দিনগুলোয় নগর এলাকার মার্কেট-বিপণিবিতান কিংবা বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডসহ এ ধরনের বিপর্যয় আরো বাড়তে থাকবে। এক্ষেত্রে মার্কেট ও বিপণিবিতানের অভ্যন্তরীণ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা; ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা; ঘনবসতিপূর্ণ, সংকীর্ণ রাস্তা ও অপরিকল্পিত নগর এলাকার জন্য ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা; অগ্নিনিরাপত্তাকর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা; মার্কেটের ফায়ার ও দুর্যোগ স্বেচ্ছাসেবী তৈরি এবং ফায়ার সেফটি কমিটি ও ফায়ার সেফটি প্ল্যান তৈরি; নিয়মিত ফায়ার ড্রিল বা মহড়া আয়োজন প্রভৃতি। ব্যবসায়ী ও নগর সংস্থাগুলোর মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের জায়গা তৈরি হলে মার্কেটগুলোকে নিরাপদ করে অর্থনীতিতে তাদের কার্যকর অবদান নিশ্চিত করা কঠিন নয়।