‘সামাজিক ন্যায়বিচারের সবচেয়ে শক্তিশালী এক শত্রু হচ্ছে নীরবতা’—অমর্ত্য সেন

এক. ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন ১৯৩৩ সালের নভেম্বরে শান্তিনিকেতনে জন্মগ্রহণ করেন। এখন বয়স ৮৮ বছর। অশীতিপর হলেও পড়াশোনা, অধ্যাপনা, গবেষণা ও লেখালেখি চলছে জোয়ানকালের মতোই অদমনীয়। পরম ইচ্ছা ছিল প্রিয় এই অর্থনীতিবিদের জন্মদিনে কিছু একটা লিখে ‘দায়মুক্ত’ হব, কারণ তার প্রতিটি লেখা কিংবা বই, বক্তৃতা আমার অনুসৃতি। শুধু তা নয়, আমি মনে করি, তিনি বাংলাদেশের একজন প্রকৃত শুভানুধ্যায়ী। কিন্তু আমার অসুস্থতার অলক্ষ্যে তার জন্মদিনটি কোন ফাঁকে চলে গেল টের পেলাম না, দুঃখ ওখানটায়।

বেটার লেট দ্যান নেভার বলে একটা কথা আছে। বিলম্বিত শুভ জন্মদিন প্রফেসর অমর্ত্য সেন, আমার এবং বাংলাদেশীদের পক্ষ থেকে।

দুই. তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর। একরাশ সোনালি স্বপ্ন নিয়ে যেমন কলেজে ভর্তি হয় তরুণ-তরুণী, ঠিক তেমনি একদিন অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ছুটে এসেছিলেন অংক আর অর্থনীতি নিয়ে পড়তে। শুরুতেই ক্যান্সার ধরা পড়লে বিরাট একটা ধাক্কা খেলেন। সেও এক গল্প। একদিন লক্ষ করলেন তার মুখের ভেতর যেন একটা লাম্প গজাচ্ছে। তাত্ক্ষণিক দুজন ডাক্তার দেখালেন কিন্তু উভয়ই তার সন্দেহ হেসে উড়িয়ে দিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এক মেডিকেল লাইব্রেরি থেকে ক্যান্সারের ওপর বেশকিছু বই সংগ্রহ করে বের করলেন যে ‘squamous cell–carcinoma’  নামে একটা টিউমার দানা বাঁধছে মুখের ভেতর। বায়োপ্সি রিপোর্টও তাই বলল। সেই মুহূর্তে অমর্ত্য সেন অবাক হয়ে ভাবলেন, বস্তুত এক নামে তার মধ্যে দুজন মানুষ বাস করে—একজন হচ্ছে রোগী, যাকে এইমাত্র জানানো হলো যে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং দুই. আবার সেই তিনি রোগ নির্ণয়ের দায়িত্বে থাকা এজেন্টও বটে। প্রতিজ্ঞা করলেন, তার মধ্যে থাকা রোগী এজেন্টকে বশ করবে তা কখনো হতে দেয়া যাবে না। আর তাই বোধহয় কেমোথেরাপি চলাকালে রেডিয়েশন রুমে নিবিষ্ট মনে কঠিন কঠিন বই পড়তেন।

তিন. মাত্র প্রথম ৩০ বছরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তার আত্মজীবনীমূলক বই এলেন লেইন কর্তৃক প্রকাশিত Home in the World- A Memoir (২০২১)।  বাংলায় সম্ভবত দাঁড়ায় ‘বিশ্বে বসত—স্মৃতিকথা’। তার বইয়ের শিরোনাম ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা The Home and the World (ঘরে বাইরে) উপন্যাসের কাছাকাছি দেখে মোটেও অবাক হইনি। বস্তুত, অমর্ত্য সেন রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য; দুজনে মানুষকে সীমানায় সীমিত রাখতে নারাজ, যেমন নারাজ ধর্ম-বর্ণ-জাতপাত ভেদে বিভাজন। দুজনের কাছেই মানবতা প্রথম, অন্য সবকিছু পরে আসে। তাছাড়া অমর্ত্য নামটি রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং—শান্তিনিকেতনে পড়ার উপদেশ তো দেয়াই ছিল।

বইয়ের ‘শিরোনাম বলে দেয় লেখক কী বলতে চান। হয়তো কিশোর কুমারের গানের মতো, ‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, আমার বাড়ি নেই’ অথবা অন্তর্নিহিত ভাব এমনটিও যে তিনি সব জায়গায় সব বাড়িতে সমান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ‘বাড়ি’ কোথায়? অমর্ত্য সেনের জীবন কেটেছে অনেক জায়গায়—বাংলাদেশের ঢাকায় শৈশবের শুরু; শান্তিনিকেতনের গ্রামে, যেখানে মা-বাবা, পিতামহ-মাতামহের আদর-যত্নে লালিত হয়েছেন; অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে কলকাতায়, ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী এবং তারপর ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড। প্রসঙ্গত, ফকির লালন শাহের সুরে বলতে পারতাম—‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝারে, লোকে বলে বলে রে, ঘর-বাড়ি ভালা না আমার’। কিন্তু অমর্ত্য সেন যে আপাদমস্তক বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানে বিশ্বাসের স্থান নেই।

বাড়ি বলতে কেবলই বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্ষণস্থায়ী বসতি। বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক এবং সেই সূত্রে ওয়ারী এলাকায় বাসা। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে শৈশবের একটা অংশ কেটেছে তার। খুব ভালো ছাত্র যে ছিলেন তা নয়, ৩৭ জনের মধ্যে ৩৩তম। কিন্তু চিন্তাশক্তি ছিল প্রখর, যা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাধারণত প্রকাশ পায় না; যুক্তিতর্কের আসরেই তার পাকা আসন। যাই হোক, দুর্ভাগ্যজনক দ্বিজাতি তত্ত্বের মাশুল দিতে গিয়ে পৈতৃক ভিটা ছেড়ে ব্যথিতচিত্তে এ দেশ ত্যাগে বাধ্য হয় তার পরিবার। ওপারে গিয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্থাপিত শান্তিনিকেতনের প্রশান্ত পল্লী প্রকৃতিসদৃশ ক্যাম্পাসে, যেখানে  শুরু হয় দেয়ালবিহীন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা:

‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির/জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর,

আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি।’

বলা বাহুল্য, কলকাতা, ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পড়াশোনা ও গবেষণার কাজে ছোটাছুটি—তার জীবন যেন যাপিত হতে থাকল ক্যাম্পাস ঘিরেই। 

চার. শৈশব থেকেই অমর্ত্য সেন বিদ্যমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধির কার্যকারণ নিয়ে ব্যাপ্ত হয়ে পড়েন। মানুষের দুর্দশায় তিনি চরম ব্যথিত হতেন, বিশেষত সংকট যখন মানুষেরই সৃষ্টি। দেখেছেন ইংরেজদের হাজতে বিনা বিচারে আটক তার একান্ত আপনজন। মাত্র দশ বছর বয়সে প্রত্যক্ষ করেছেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা এবং দেশভাগ হওয়ার ফলে ঢাকার পৈতৃক নিবাস ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়ার মতো হূদয়বিদারক ঘটনা। উদ্বিগ্ন হতেন কোনো এক বিকালে মার মুখে শোনা তথ্য নিয়ে—সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিমদের জমি দখলে নিচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠরা কিংবা মাছের বাজারে মাছের দামের ওঠানামা, তার অনুসন্ধিত্সু চোখ পড়ত  বুভুক্ষু মানুষের মিছিলে, যারা কলকাতামুখী একমুঠো অন্নের আশায় অথচ খাদ্যের অভাব নেই দেশে; কলকাতা ও এর আশপাশের বাইরে কেউ না খেয়ে মরে না।

এসব চিন্তা মাথায় নিয়ে কলকাতা থেকে বোম্বে (মুম্বাই) হয়ে ১৯৫৩ সালে তার লন্ডনে যাওয়া হয় জাহাজে চড়ে। জাহাজে নিজেকে কল্পনা করেন এক ‘নির্বোধ’ কলম্বাসের মতো। লন্ডনে নেমে অভিবাসী হিসেবে অগ্নিপরীক্ষা শুরু হলো—তার নাম উচ্চারণ করতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে থাকে ওই দেশের মানুষ; বাড়ির মালকিন ছানাবড়া চোখে ভাবে গোসলের সময় তার চামড়ার রঙ মেঝেতে পড়বে কিনা।

প্রথম দিনটায় কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের গেটের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার পবিত্র পূর্বসূরিদের কথা যেমন ভেবেছেন, আইজ্যাক নিউটন, জওহরলাল নেহরু, ফ্রান্সিস বেকন, তেমনি একই সঙ্গে তার অসামঞ্জস্য অবস্থানের কথা ভুলে যাননি। কলকাতায় ছিল কো-এডুকেশন আর খোদ লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজটি শুধুই ছেলেদের জন্য (১৯৭৬ সালে প্রথম ছাত্রী ভর্তি হয়)। কলকাতায় কলেজে থাকতেই বামধারায় দীক্ষিত ছিলেন, কেমব্রিজে এসেও দেখলেন দুই দল—মূল স্রোতের অর্থনীতিবিদ আর অপেক্ষাকৃত নমনীয়, যারা পুঁজিবাদের সমালোচক কিন্তু দারিদ্র্য, বৈষম্য ইত্যাদি ব্যাপারে ঠাণ্ডা। ইউনিভার্সিটির সোস্যালিস্ট ক্লাবে গিয়ে তার বিস্ময়ে মনে হলো মার্ক্সবাদী অনেকে মার্ক্সীয় তত্ত্ব ভালো করে পড়েননি। যাই হোক, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগে পিএইচডি শেষ করে তিনি দেশে ফেরেন।

পাঁচ. যে কথা বলছিলাম, সে কথায় ফিরে আসি।  শৈশবকালে দুই চোখে দেখা এবং অন্তরে দাগ কাটা ঘটনাপ্রবাহ তার ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনার চাকা ঘোরায়, কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। আমার জানামতে, পৃথিবীতে খুব কম পণ্ডিত আছেন, যারা শিশুকালের মনে জাগা প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছেন বড় হয়ে এবং একজন প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো খুঁড়ে খুঁড়ে বের করেছেন কার্যকারণ এবং করণীয়। যেমন ছোটবেলায় তিনি এক নাটকে পড়েছিলেন এক বিচারক তার প্রত্যাশিত হত্যাকারীকে মুক্ত করে দেন। দি আইডিয়া অব জাস্টিস বইটার সূত্রপাত নাকি ঘটে ওখান থেকেই। দশ বছর বয়সে এবং তার পরেও দুর্ভিক্ষের বিভীষিকাময় দৃশ্যাবলি বাধ্য করেছিল দুর্ভিক্ষের কারণ ও করণীয় নিয়ে গবেষণা  করতে—বেরোল ‘পভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস’ বইটি। তিনিই প্রথম জানালেন যে উদ্বৃত্ত খাদ্য থাকা সত্ত্বেও একটা দেশে মানুষ না খেয়ে মারা যেতে পারে; প্রাধিকার পাওয়া উচিত ক্রয়ক্ষমতা/প্রবেশগম্যতা, লভ্যতা নয়। যুগান্তকারী এ নীতি-পরামর্শ গ্রহণ করে অনেক দেশ, এমনকি বাংলাদেশ আজ সরব দুর্ভিক্ষের ছায়ার বাইরে অবস্থান করছে।

সম্ভবত অমর্ত্য সেন রচিত ‘ডেভেলপমেন্ট এজ ফ্রিডম’ বইটির  ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির উৎসে আছে বাংলাদেশের ঢাকার ওয়ারীতে থাকাকালীন এক সহিংস ঘটনা এবং আমার একান্তই ব্যক্তিগত মত যে ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে তার নোবেল বিজয়ের বীজ রোপিত হয়েছিল অমর্ত্য সেন দশ বছর বয়সে পৌঁছার আগেই এবং এই ঢাকার ওয়ারী থেকে। ঘটনা মোটামুটি এ রকম:

ঢাকায় তখন হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। আব্দুল কাদের নামে ছুরিকাহত, রক্তাক্ত এবং প্রায় অজ্ঞান এক লোক অমর্ত্য সেনের ওয়ারীর ‘জগত কুটির’ বাড়ির লনে ঢুকে পড়ে। শিশু অমর্ত্য চিত্কার করে বাবাকে ডাকতে থাকে এবং আব্দুল কাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পথিমধ্যে অস্পষ্ট ভাষায় কাদের যা বলেছিল, তার সারমর্ম হচ্ছে এ রকম—দাঙ্গার কারণে তার স্ত্রী বারবার বারণ করেছিলেন কাজে বেরুতে কিন্তু ঘরে খাবার নেই বলে সে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় কাজ নিতে বাধ্য হয়। ধর্মান্ধ অপরাধীরা তার পিঠে ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত করে।

অমর্ত্য সেন এ ধরনের ঘটনাকে আখ্যায়িত করেন ‘ইকোনমিক আনফ্রিডম’ (অর্থনৈতিক স্বাধীনতাহীনতা) হিসেবে এবং তার বিশ্ববিখ্যাত বই ‘ডেভেলপমেন্ট এজ ফ্রিডম’-এর মূল সূর ওটাই। উন্নয়ন মানে স্বাধীনতা।

ছয়. বাংলাদেশের প্রতি তার এতই টান যে নোবেল পুরস্কারের অর্থের একটা অংশ ব্যয় করছেন দুস্থদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রকল্প এবং গবেষণায়। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের, বিশেষত পাক-ভারতের তথ্যভিত্তিক তুলনায় বাংলাদেশকে প্রক্ষিপ্ত করে আমাদের ইতিবাচক সাফল্যকে বিশ্বব্যাপী প্রচার করে প্রমাণ করেছেন তিনি বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম শুভাকাঙ্ক্ষী।

সাত. যে কথা না বললেই নয়। তার সদ্য প্রকাশিত বইতে জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব মার্ক্স, কেইন্স এবং এরোর কথা যেমন আছে, তেমনি আছে জনগণ ও বিভিন্ন জায়গার উপভোগ্য বিবরণ—নৌপথে ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ যেতে নদীমাতৃক বাংলাদেশ এবং জীবন-জীবিকার উপস্থাপনা। আজকের অমর্ত্য সেন জন্ম দিয়েছে নিভৃত পল্লী শান্তিনিকেতনের মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ এবং কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজের সেই বৌদ্ধিক আড্ডাগুলো—বই পড়ে তাই মনে হয়েছে আমার।

আপনার দীর্ঘ উৎপাদনশীল জীবন কামনা করছি প্রফেসর অমর্ত্য সেন। আপনাকে নিয়ে আরো লেখার ইচ্ছা আছে।

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য

বর্তমানে ইষ্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন অধ্যাপক