করোনা
প্রাদুর্ভাব অর্থনীতিকে
যতটা আঘাত
করেছে, তার
চেয়ে বেশি
করেছে শিক্ষা
ব্যবস্থাকে। আপাতদৃষ্টিতে
আর্থিক ধকলটা
বেশি অনুভূত
হলেও শিক্ষা
খাতের বিপর্যয়কে
ছোট করে
দেখার সুযোগ
নেই। কেননা
শিক্ষা খাতের
ক্ষতি মানে
ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে
ধোঁয়াশায় পরিণত
করা। গত
বছরের ১৭
মার্চ থেকে
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
বন্ধ করা
হয়। করোনাকালে
অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি
বিবেচনায় সব
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান
খুলে দেয়া
হয়। এমনকি
খুলে দেয়া
হয় রিসোর্ট
ও বিনোদন
কেন্দ্রগুলোও। এদিকে
অনলাইন শিক্ষা
কার্যক্রমকে দুর্যোগপূর্ণ
পরিস্থিতিতে একটি
সুষ্ঠু পরিবর্তিত
পাঠদানের মাধ্যম
বিবেচনায় এবং
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
স্বাস্থ্য সুরক্ষার
বিষয়টি মাথায়
রেখে সম্পূর্ণরূপে
বন্ধ রাখা
হয় সব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু
দুর্ভাগ্যজনক হলেও
সত্য, আমাদের
দেশের প্রেক্ষাপটে
অনলাইনের মাধ্যমে
শিক্ষা কার্যক্রম
ব্যাপকভাবে সীমিত
হয়ে পড়ে।
প্রথমত, অনলাইনে
শিক্ষা প্রযুক্তিনির্ভর
ও আধুনিক
হলেও বাংলাদেশে
অনলাইন নেটওয়ার্ক
অনেক দুর্বল।
ইন্টারনেট গতি
মাপার আন্তর্জাতিক
প্রতিষ্ঠান ওকলার
এক প্রতিবেদনে
(২০২১) দেখানো হয়েছে,
মোবাইল ইন্টারনেট
গতিতে বিশ্বের
১৪০টি দেশের
মধ্যে বাংলাদেশের
অবস্থান ১৩৬
নম্বরে। তদুপরি,
অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর
বসবাস গ্রামাঞ্চলে
থাকার পরিপ্রেক্ষিতে
ছাত্র-ছাত্রীদের
পক্ষে অনলাইনের
দুর্বল গতির
সঙ্গে মানিয়ে
চলা সম্ভব
হচ্ছে না।
এদিকে করোনাকালের
আর্থিক পরিস্থিতির
অবনতির প্রভাব
অনলাইন শিক্ষার
ওপর পড়েছে।
অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর
অভিভাবক নিম্ন
ও নিম্নমধ্যবিত্তের,
ফলে তাদের
পক্ষে অনলাইনের
এমবি খরচ
বহন করা
কঠিন হয়ে
পড়েছে। স্বাভাবিক
সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের
অনেক ছাত্রছাত্রীর
শিক্ষার ব্যয়ভার
বহন করা
হতো তাদেরই
টিউশনের আয়
থেকে। সেই
আয়ের উৎস
বন্ধ থাকার
কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্র-ছাত্রীদের
পক্ষে অনলাইন
শিক্ষা কার্যক্রমের
সঙ্গে খাপ
খেয়ে চলা
অনেকটাই দুরূহ
ব্যাপার হয়ে
দাঁড়িয়েছে। এই
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে
স্কুল, কলেজ
ও বিশ্ববিদ্যালয়ের
অনলাইন ক্লাস
কার্যক্রম এগিয়েছে
সত্য কিন্তু
শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা
কার্যক্রম বন্ধ
থাকে।
সব ফাইনাল
পরীক্ষা প্রায়
দেড় বছর
ধরে বন্ধ
থাকার ফলে
ছাত্র-ছাত্রীদের
মধ্যে হতাশা
আর উদ্বিগ্নতা
বেড়ে গেছে।
ইউনেস্কো বলছে,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ
থাকার ফলে
বৈশ্বিকভাবে ৯৪
শতাংশ শিক্ষার্থী
আর স্বল্প
আয়ের দেশগুলোয়
৯৯ শতাংশ
শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছে। তাছাড়া
প্রাথমিক শিক্ষারত
একটা উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক
শিশু ঝরে
পড়তে পারে।
ইউনিসেফ এক
প্রতিবেদনে প্রকাশ
করে, করোনাকালে
লম্বা সময়
ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
বন্ধ থাকায়
প্রাক-প্রাথমিক
থেকে উচ্চশিক্ষার
স্তর পর্যন্ত
বাংলাদেশে চার
কোটিরও বেশি
শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত।
ইউনিসেফ এও
বলেছে, বাংলাদেশ
দীর্ঘ ছুটির
দেশ হিসেবে
বিশ্বে দ্বিতীয়।
এ চিত্রই
বলে দেয়
শিক্ষার্থীদের জীবন
প্রক্রিয়ায় গতিহীনতা
চলছে। এ
গতিহীনতার সঙ্গে
যুক্ত হয়
অত্যধিক স্মার্টফোন
নির্ভরতা। ফলে
মানসিক বিকাশের
চিত্তবিনোদন থেকে
শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত
হয়। এ
অবস্থায় শিক্ষার্থীরা
তিন ধরনের
বঞ্চনার শিকার—এক.
ভবিষ্যৎ উন্নতির
স্বপ্ন দেখার
বঞ্চনা; দুই.
গতিশীলতা থেকে
বঞ্চনা; তিন.
মানসিক প্রশান্তি
থেকে বঞ্চনা।
এ তিন
ধরনের বঞ্চনা
বিভিন্ন ধরনের
মানসিক ও
সামাজিক সমস্যা
বাড়িয়ে তুলছে।
প্রথমত, স্বায়ত্তশাসিত-সরকারি-বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত
প্রায় পাঁচ
লাখ শিক্ষার্থী
(বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী
কমিশনের তথ্যমতে)
তাদের ভবিষ্যৎ
নিয়ে উদ্বিগ্ন।
কীভাবে তাদের
পরীক্ষা হবে,
কবে হবে,
কবে চাকরি
হবে, কবে
সংসার হবে—এসব
নিয়ে চিন্তা-দুশ্চিন্তা
থাকাটাই স্বাভাবিক।
এখানে আশঙ্কাটা
ভবিষ্যৎ নিয়ে।
এভাবে চলতে
থাকলে ছাত্র-ছাত্রীদের
বেকারত্ব দ্রুত
বাড়বে। মেয়েদের
বাল্যবিবাহ আরো
বাড়বে, কারণ
চাকরিলাভের আশা
ছেড়ে দেবে।
এতে যৌতুক
আর নারী
নিপীড়ন বাড়তে
পারে। বেড়ে
যেতে পারে
অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধ।
চাকরি পাওয়ার
জন্য ঘুষের
মূল্যস্ফীতি বাড়তে
পারে। এদিক
বিবেচনায় সবার
আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে
সশরীরে পরীক্ষা
ও ক্লাস
কার্যক্রম কীভাবে
নেয়া যায়,
সেদিকে গুরুত্ব
দিতে হবে।
যদিও স্কুল-কলেজ
খোলা ও
সীমিত পরিসরে
পাঠদান এবং
পরীক্ষা গ্রহণের
ব্যাপারে নীতিগত
সিদ্ধান্ত হয়,
তার স্থায়িত্ব
নির্ভর করে
করোনা পরিস্থিতির
ওপর। কিন্তু
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা
ও ক্লাস
চালু করার
বিষয়টিকে অগ্রাধিকার
দেয়া প্রয়োজন।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীদের নিজস্ব
একটা উপলব্ধি
আছে, যা
কাজে লাগিয়ে
স্বাস্থ্য সুরক্ষার
সম্ভাবনা অধিক।
এক্ষেত্রে দ্রুততার
সঙ্গে বিভিন্ন
পদক্ষেপ নিতে
হবে।
১. প্রতিটি
পাবলিক ও
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়
খুলে দিয়ে
মাস্টার্স ও
অনার্সের পরীক্ষা
দ্রুত শেষ
করতে হবে।
কিছুু প্রাইভেট
বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনভিত্তিক
পরীক্ষা নিয়েছে
সত্য কিন্তু
অন্তত অনার্স
ও মাস্টার্সের
পুনর্মূল্যায়ন ফাইনাল
পরীক্ষা নেয়া
প্রয়োজন। তা
না হলে
এর প্রভাব
চাকরি ক্ষেত্রে
পড়তে পারে।
২. বিভিন্ন
শিফটে হলেও
সব বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি পরীক্ষা
দ্রুততার সঙ্গে
নিতে হবে।
এক্ষেত্রে কীভাবে
শারীরিক দূরত্ব
বজায় রেখে
ভর্তি পরীক্ষা
নেয়া যায়,
সেজন্য সুনির্দিষ্ট
কলাকৌশল প্রণয়ন
ও প্রয়োগ
জরুরি। সব
ভর্তি পরীক্ষার্থীর
মাস্ক পরিধান
ও শারীরিক
দূরত্ব নিশ্চিত
করতে হবে।
৩. সব
বিশ্ববিদ্যালয় খুলে
দিয়ে প্রত্যেক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভ্যাকসিন
প্রদান সেল
গঠন করতে
পারলে এক
সপ্তাহের মধ্যে
সব শিক্ষার্থীদের
টিকা প্রদান
সম্ভব।
৪. প্রত্যেক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য
বিভাগ থাকবে।
ট্রেনিং প্রাপ্ত
স্বাস্থ্যসেবক ও
আনুষঙ্গিক সুবিধাদি
প্রদান করতে
হবে। এক্ষেত্রে
জরুরি মনিটরিং
সেল গঠন
করতে হবে।
ছাত্র-ছাত্রীদের
জন্য প্রত্যেক
প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য
সুরক্ষার প্রশিক্ষক
হিসেবে শিক্ষক
নিয়োগ দিতে
হবে।
৫. প্রত্যেক
প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর
আনুপাতিক হার
বিবেচনায় মনোরোগ
বিশেষজ্ঞ ও
মানসিক কনসালট্যান্ট
নিয়োগ দিতে
হবে।
৬. টিকা
প্রদানই একমাত্র
সমাধান নয়।
কারণ টিকা
গ্রহণের পরেও
কভিড আক্রান্তের
নজির রয়েছে।
তাই প্রয়োজন
কঠিনভাবে স্বাস্থ্যবিধি
মেনে চলা।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
ক্লাসরুমে রীতিমতো
ঠাসাঠাসি করে
বসে ক্লাস
করতে হয়
শিক্ষার্থীদের। এ
সংকট নিরসনে,
শ্রেণী শাখা
বাড়িয়ে ছাত্র
সংখ্যা কমিয়ে
সামাজিক দূরত্ব
নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক।
৭. এছাড়া
প্রতিটি ক্লাসরুমে
মাইক্রোফোনের ব্যবস্থা
করতে পারলে
মাস্ক পরে
ক্লাস নেয়া
শিক্ষকের জন্য
অনুকূল হবে।
৮. অনেক
শিক্ষার্থীর মধ্যে
তারুণ্যের উচ্ছলতায়
গা ভাসিয়ে
স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার
প্রবণতা বাড়াতে
পারে। এটা
যেন না
হয়, সেজন্য
তাদের উদ্বুদ্ধ
করতে হবে।
আমাদের ভুলে
গেলে চলবে
না, একজন
বয়স্ক মানুষ
আক্রান্ত হলে
আক্রান্ত হয়
একটি মাত্র
মানুষ কিন্তু
একজন স্কুল-কলেজ,
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া
ছাত্র আক্রান্ত
হলে আক্রান্ত
হয় একটি
পরিবার। কারণ
অনেক সময়ই
কোমলমতি মন
আইসোলেশন ভেঙে
বেরিয়ে আসে
পরিবারের সদস্যদের
কাছে। তাই
মাস্ক পরিধানের
বিষয়টি নিশ্চিত
করতে না
পারলে এবং
তার যথাযথ
মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা
না করলে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার
বিষয়টি ধাবিত
করবে নিশ্চিত
অন্ধকারের দিকে।
তবে শিক্ষার্থীদের
আর্থিক অসচ্ছলতার
বিষয়টি মাথায়
রেখে তাদের
কাপড়ের মাস্ক
সরবরাহ করতে
হবে। মাস্ক
ছাড়া যাতে
কোনো শিক্ষার্থী
ক্যাম্পাসে ঢুকে
পড়তে না
পারে তা
নিশ্চিত করতে
হবে। আমরা
চাই, করোনা
মোকাবেলা করে
শিক্ষা কার্যক্রম
ফিরে আসুক
স্বাভাবিক গতিতে,
আমরা চাই
উচ্চশিক্ষার উচ্চমান
ও উচ্চগতি।
আমরাই পারব
আগামীর উজ্জ্বল
ভবিষ্যৎ রচনা
করতে—এ
প্রত্যাশা হোক
আমাদের সবার।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী
অধ্যাপক
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়










