দেশে গ্যাস সংকট
ক্রমে তীব্র
হচ্ছে, এর
আশু সমাধান
না হলে
অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ
হয়ে যাওয়ার
উপক্রম হয়েছে।
দীর্ঘদিন সংকটের
কারণে গৃহস্থালি কাজে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলে
শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়।
তবে ২০০৯
সাল থেকে
আবাসিক খাতে
নতুন গ্যাস
সংযোগ বন্ধ
থাকলেও এক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ থেমে
থাকেনি। এছাড়া
গ্যাস সংযোগ
প্রক্রিয়া ধীর
হওয়ায় নতুন
শিল্প-কারখানা
কম চালু
হচ্ছিল। পরবর্তী
সময়ে জাতীয়
গ্রিডে তরলীকৃত
প্রাকৃতিক গ্যাস
(এলএনজি) যোগ
হওয়ায় সরকার
শিল্প খাতে
গ্যাসের নতুন
সংযোগকে অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু এখন
নগদ অর্থ
সংকটে এলএনজি
আমদানি বাড়ানো
যাচ্ছে না,
যে কারণে
এলএনজিতে চলতি
সময়ে কোনো
সুখবরই নেই।
ফলে শিল্প-কারখানা বাঁচাতে
বাংলাদেশ বিনিয়োগ
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও তিতাস
বরাবর কারখানা
লে-অফের
(সাময়িকভাবে উৎপাদন
বন্ধ থাকার
দরুন শ্রমিকদের কর্ম অব্যাহতি) আশঙ্কা
জানিয়ে চিঠি
দিয়েছেন কারখানা
মালিকরা।
বণিক
বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা
যায়, শিল্প
অধ্যুষিত অঞ্চল
ময়মনসিংহের ভালুকায়
বর্তমানে সন্ধ্যার সময় কারখানায় গ্যাসের
চাপ একেবারেই শূন্যে নেমে আসছে।
গ্যাসের সমস্যা
এমন পর্যায়ে
এসেছে যে
কারখানা লে-অফ ছাড়া
কোনো উপায়
দেখতে পাচ্ছে
না কর্তৃপক্ষ। সেক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলোয় কর্মরত
হাজার হাজার
কর্মী বিপাকে
পড়তে পারেন।
শুধু ভালুকাই
নয়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার অনেক
কারখানায় এখন
গ্যাস সংকট
মারাত্মক আকার
ধারণ করেছে।
এর মধ্যে
তিতাসের ভালুকা
স্টেশনের অধীনে
গ্যাসের গ্রাহক
শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে
৫৭টি। কারখানাগুলোর প্রতিটিতেই গ্যাসের চাপ
শূন্য হওয়ায়
উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
তিতাসের পক্ষ থেকে কারখানাগুলোকে জানানো হয়েছে, মাত্র ১২ ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যাবে। কিন্তু কারখানার মালিকরা বলছেন, বয়লার নির্ধারিত তাপে নিয়ে আসতে এটি পর্যাপ্ত সময় নয়। ফলে ১০ ঘণ্টা কারখানায় উৎপাদনের সময় পাওয়া যায়। এছাড়া দিনের বেলায় গ্যাস না থাকায় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মূলত
বিদ্যুৎ খাতে
গ্যাস সরবরাহ
নিশ্চিত করতে
গিয়ে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব
হচ্ছে না।
গ্যাসের স্বল্প
চাপের কারণে
কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন
লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছা
সম্ভব না
হওয়ায় কারখানার মালিকদের ব্যবসায়িকভাবেও আর্থিক
ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
সব
মিলিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গ্যাসের সমস্যা এখন
স্থায়ী রূপ
নিয়েছে বলা
যায়। শীতকালের কারণে পরিস্থিতির কিছুটা
উন্নতি হলেও
সমস্যা কাটেনি।
এক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে
দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে
শিল্প-কারখানার মালিকরা আশাবাদ ব্যক্ত
করেছেন। এক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার ভাষ্য, স্থানীয়
বা বিদেশী
কোনো উৎস
থেকেই এখন
পর্যাপ্ত গ্যাস
সরবরাহের উপায়
নেই। স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান কূপ ও উন্নয়ন কূপ
খননের কাজ
জোরদার করা
হয়েছে, কিন্তু
তার ফল
এখনই আসবে
না। আবার
বিশ্ববাজারে এলএনজির
দাম ও মার্কিন ডলারের
দর বেড়ে
যাওয়ায় এলএনজি
আমদানিও আপাতত
বাড়ানো যাচ্ছে
না।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি প্রায় দেড় দশকের। টাইলস, সিরামিক শিল্প-কারখানাগুলোর পাশাপাশি বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং কারখানাগুলোর সংকট চরম আকার নিয়েছে। এক্ষেত্রে ঠিক সময়ে পণ্য দিতে না পারার ঝুঁকিতে থাকা রফতানিকারকরা ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কা করছেন। তাদের মতে, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান দরকার। আর এখনকার ঘাটতি দ্রুত মেটানো না গেলে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্য খাতে অনেকের কাজ হারানোর শঙ্কা থেকে যায়। রয়েছে বেকারত্ব বৃদ্ধির শঙ্কাও।
এখন শিল্প বাঁচানোর জন্য গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিজস্ব উৎস সন্ধানের প্রতি যে তাগিদ দেয়া হচ্ছে সেটির ফলও সহসা পাওয়া যাবে না। আমদানিনির্ভর এলএনজি দিয়েও চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে তার ধাক্কা জ্বালানি খাতেও এসে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। গৃহস্থালি কাজের জন্য নতুন গ্যাস সংযোগ আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে এলপিজির ব্যবহার বাড়লেও শিল্প খাতে এলএনজির ব্যবহার শুরু করেও সেটির ধারাবাহিকতা কাঙ্ক্ষিতভাবে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভর করেই দেশের শিল্প-কারখানাগুলো বাঁচানোর চেষ্টা হলেও শীতকাল চলে গেলে আবারো সেই সংকটের মুখে পড়তে হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এজন্য বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্বারোপ করে বাস্তবসম্মত জ্বালানি মহাপরিকল্পনা সাজানোর প্রতি বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন। এছাড়া পরিত্যক্ত গ্যাসকূপগুলোয় অনুসন্ধান, অনুসন্ধানে বিদেশী কোম্পানির পরিবর্তে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) কাজে লাগানো, নতুন নতুন গ্যাসের উৎস সন্ধান এবং স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগী হওয়া উচিত। কিন্তু এর সবকিছুই আসলে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। বর্তমানে গ্যাস সংকটের তাত্ক্ষণিক কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে কীভাবে শিল্প-কারখানাগুলোয় উৎপাদন সচল রাখা যায়, সেদিকে জ্বালানি বিভাগের জরুরি পদক্ষেপ জরুরি। যদি ব্যয়বহুল এলএনজির মাধ্যমেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হয়, সেক্ষেত্রে স্পট মার্কেট থেকে কীভাবে তুলনামূলক কম মূল্যে এলএনজি কেনা যায় সেটি যাচাই করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর সচল রাখার জন্য ডিজেলের পাইপলাইনে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মোদ্দাকথা, দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে দূরদর্শী পরিকল্পনার আলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সামান্য ভুলও অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসতে পারে। সরকার জ্বালানি খাতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। সংকটে বিচলিত না হয়ে সংকট কীভাবে নিরসন করা যাবে সেটি নিয়ে আগামীতে সতর্ক পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ ২০২৩ সালে সম্ভাব্য যে অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো নেতিবাচক হতে পারে। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে যেন অবনতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত। এজন্য জ্বালানি খাতে সিস্টেম লস কমানোসহ শিল্প খাতে যেন পর্যাপ্ত গ্যাস নিশ্চিত করা সম্ভব হয় সেদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।










