ভৌগোলিক অবস্থান এবং বদ্বীপপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি-৫) তথ্যানুযায়ী বিশ্বের ছয়টি দুর্যোগপ্রবণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা, নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। আগামী শতকগুলোয় বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদির জন্য বন্যা, খরা, সাইক্লোন, লবণাক্ততা—এগুলোর ঝুঁকি বৃদ্ধির জোরালো পূর্বাভাস রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন উপাদান এ দেশের উন্নয়নে ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। গত পাঁচ দশকে ঢাকা শহরের তাপমাত্রা বেড়েছে এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক কমেছে। ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ২৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ গত ৪৫ বছরে ঢাকা শহরের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ছিল ৬৪০ মিলিমিটার, যা ২০১৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ মিলিমিটারে, যেটি পরিবর্তনশীল জলবায়ু পরিবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত। অদ্ভুতভাবে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে।
তাছাড়া প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্প উন্নয়নের কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর ক্রমে চাপ বাড়ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করা এবং দেশের উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তার জন্য প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০।
জাতীয়
উন্নয়নে পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ, প্রতিবেশগত ভারসাম্য, কৃষি, ভূমি ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ একটি অভিযোজনভিত্তিক, সামগ্রিক এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মহাপরিকল্পনা। জলবায়ু পরিবর্তন ও তার ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা এবং ঝুঁকি প্রশমনের জন্য বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-তে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাছাড়া পানি ও পরিবেশবিষয়ক লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে এ পরিকল্পনায় আরো সময়ভিত্তিক সুনির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে। এ মহাপরিকল্পনার ছয়টি নির্দিষ্ট অভীষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। অভীষ্টগুলো হচ্ছে:
অভীষ্ট ১. বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; অভীষ্ট ২. পানির নিরাপত্তা এবং পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা বৃদ্ধি করা; অভীষ্ট ৩. সমন্বিত ও টেকসই নদী অঞ্চল এবং মোহনা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা; অভীষ্ট ৪. জলাভূমি এবং বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং তাদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা; অভীষ্ট ৫. অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়সংগত সুশাসন গড়ে তোলা এবং অভীষ্ট ৬, ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
পৃথিবীর
গড় তাপমাত্রা এরই মধ্যে প্রাক-শিল্পস্তরের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপর পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল ছিল মানবেতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। এটা থেকে স্পট প্রতীয়মান হয় যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা প্রকট হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের গত দুই দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৪ মিলিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যেতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৪ শতাংশ এলাকা বন্যা প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সাইক্লোনের মাত্রা ও গতি ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। এসব উপাদানের দ্বারা
দেশের অধিকাংশ খাত প্রভাবিত হয়ে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ক্ষতিসাধন করবে।
আগামী
২০৩০ সালের মধ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০ শতাংশ এবং ২০৭৫ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশ বাড়তে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ১ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এসব উপাদানের দ্বারা দেশের অধিকাংশ খাত প্রভাবিত হয়ে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ক্ষতিসাধন করবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত হলো কৃষি। উচ্চ তাপমাত্রায় আউশ, গম, আমন ও বোরো ধানের উচ্চফলনশীল জাতের ফলন হ্রাস হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বিকিরণ কীটপতঙ্গ, রোগ-জীবাণু ও অনুজীবের বৃদ্ধি ঘটায়। ধারণা করা হচ্ছে, ২১০০ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশের তাপমাত্রা আরো ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে শতাব্দী শেষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা একটি ভয়াবহ বার্তা। সবকিছু অক্ষুণ্ন রেখে যদি দেশের তাপমাত্রা বর্তমানের চেয়ে ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায়, তবে ধানের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ এবং গম উৎপাদন ৬১ শতাংশ কমে যাবে। ধান উৎপাদন ২০৫০ সালের মধ্যে ২০০২ সালের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন হ্রাস পাবে। মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় ধানের ফলন কমে গেছে। বিশেষত পটুয়াখালী জেলার ধানের গড় ফলন জাতীয় গড়ের চেয়ে ৪০ শতাংশ এবং নওগাঁর তুলনায় ৫০ শতাংশ কম। সহনীয় পর্যায়ের জলবায়ু পরিবর্তন দৃশ্যকল্পে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের কারণে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ফসল নষ্ট হচ্ছে। পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, স্থিতাবস্থার পরিস্থিতিতে ফলন হ্রাসের ফলে বার্ষিক ধান উৎপাদন ২০৫০ সালে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ২১০০ সালে আরো ৫ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পুনঃপুনঃ বন্যায় কৃষি খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরিবেশ
ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-তে বাংলাদেশকে মোট ছয়টি হটস্পটে ভাগ করা হয়েছে। হটস্পটগুলো হচ্ছে: ১. উপকূলীয় অঞ্চল, ২. বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, ৩. হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলো, ৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম, ৫. নদী অঞ্চল এবং মোহনা এবং ৬. নগর এলাকাগুলো। এতে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব জেলা সমুদ্র উপকূল বা মোহনা, বড় বড় নদীসংলগ্ন বা খরাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় তাদের প্রত্যেকটির আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ মূলত একটি অভিযোজনভিত্তিক প্রকৃতি সহায়ক কারিগরি এবং অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা, যা উন্নয়ন ফলাফলের ওপর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমি ব্যবহার, প্রতিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এদের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে বিবেচনা করে প্রণয়ন করা হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-তে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সে অঞ্চলের পানি প্রাপ্যতা ও এর ব্যবস্থাপনা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। দেশের আটটি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির মাত্রার ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলোকে একেকটি গ্রুপের আওতায় আনা হয়েছে, যাকে ‘হট স্পট’ (পানি
ও জলবায়ু উদ্ভূত প্রায় অভিন্ন সমস্যাবহুল অঞ্চল) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মূলত হটস্পট শব্দটি পরিবেশবিদ্যা থেকে নেয়া হয়েছে।
বদ্বীপ
পরিকল্পনা-২১০০-তে কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন ও প্রশমন দুটি কৌশলগত নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু অভিযোজন নীতি হলো, জলবায়ুসংক্রান্ত আগাম তথ্য-উপাত্ত প্রদান, উন্নত ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ ও গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল পদ্ধতির উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর জন্য উন্নত খামার ও প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বাদু পানি ও উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ চাষ এবং চিংড়ি চাষে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ক্ষতি সম্পর্কে গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু মত্স্য সম্পদ প্রজাতির উদ্ভাবন। কৃষিতে অভিযোজন নীতি সাধারণত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি হয়ে থাকে। অন্যদিকে এ মহাপরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রশমন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। যেমন ক্লাইমেট স্মার্ট কিংবা সংরক্ষণ কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস মিথেনের নিঃসরণ কমানো। কৃষিতে অভিযোজন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেক্টর (পানিসম্পদ, কৃষি, ভূমি, জোনিং ইত্যাদি) এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে।
বাংলাদেশ
ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে সক্রিয় রয়েছে এবং গত ২০০ বছরে অনেক বড় বড় ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়েছে। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনায় কতিপয় কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কৌশলগুলো হচ্ছে: ১. ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং ভূমিকম্প মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ানো; ২. বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড বা অন্য অনুমোদিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাঁধ, নিয়ন্ত্রক, সুইচ, ক্রস-বাঁধ, সড়ক, সেতু, ভবন ইত্যাদি অবকাঠামোর ভূমিকম্পরোধক নকশা তৈরি; ৩. পৌর এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য যথাযথ ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ৪. স্তরচ্যুতি (fault) এবং ভূপৃষ্ঠ বরাবর ভূগর্ভে ভূমিকম্পের উৎস (এপিসেন্টার) শনাক্তকরণে বিস্তারিত গবেষণা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিপর্যয় রোধে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা ও স্তর নির্ণয়ে সারা দেশে হালনাগাদ ম্যাপিংও প্রয়োজন।
বদ্বীপ
বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বাস্তবায়নের জন্য মোট ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ভৌত অবকাঠামোসংক্রান্ত প্রকল্প এবং ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণাবিষয়ক প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট মূলধন বিনিয়োগ ব্যয় ২ হাজার ৯৭৮ বিলিয়ন টাকা (প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার)। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর কতিপয়ের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যদিও বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মসূচির প্রকৃতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন পরবর্তী এক দশকে সম্প্রসারিত হবে। মোট ৮০টি প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ১২টি প্রকল্প দুর্যোগ মোকাবেলাসংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ
বদ্বীপ পরিকল্পনায় যেসব দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলগুলো থেকে বেশি লোক উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোন কোন এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কম, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে ওই এলাকায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা উল্লেখ করা হয়েছে। যদি বদ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হয়, হটস্পটভিত্তিক কত লোক উদ্বাস্তু হবে, সে হিসাব পরিকল্পনায় রয়েছে। বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-তে প্রচুর বৈজ্ঞানিক তথ্যের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে এবং তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত তথ্যবহুল ও বিজ্ঞানভিত্তিক একটি কার্যোপযোগী পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের সামনে আসলে বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
জাতীয়ভাবে
বদ্বীপ পরিকল্পনা নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব যথেষ্ট হ্রাস পাবে। ২০৩১ অর্থবছরে চরম দারিদ্র্য প্রায় ৪ শতাংশ এবং ২০৪১ অর্থবছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। অন্যদিকে বদ্বীপ পরিকল্পনা নীতি গ্রহণ করা হলে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে চরম দারিদ্র্য হ্রাস পেয়ে প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছবে এবং ২০৪১ অর্থবছরে কোনো চরম দারিদ্র্য থাকবে না। স্থিতাবস্থা নীতির অধীনে গড় বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৯ শতাংশ অর্জন এবং তা ধরে রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে এটি সহায়তা করবে। ফলে কৃষি খাতে আয় হ্রাস এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার ক্ষয়ক্ষতি পরিহারসহ উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূর করা এবং ২০৪১ কিংবা এর নিকটবর্তী সময়ে উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদা লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ রূপকল্প ২০৪১-এর লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে।
ড. শামসুল
আলম:
সদস্য (সিনিয়র সচিব)
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন










