(গতকালের পর)

কিছু গ্রুপের খেলাপি ঋণ এত বেশি হয়েছে যে তাদের জন্য তা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার কমাতে আপনার কী পরামর্শ থাকবে?

পত্রপত্রিকায় কিছু পরামর্শ এসেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, ঋণ পুনর্গঠন ইত্যাদি। এটি গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে এসেছে। হাজার কোটি টাকার উপরের ঋণগুলোকে পুনর্গঠন করা, রিশিডিউলিং নয়। রিশিডিউলিংয়ের একটা বিধান রয়েছে ব্যাংকিং কোম্পানির আইনের মধ্যেই। এটা সংসদ বা আইন মন্ত্রণালয় না ধরলে পরিবর্তন হবে না। সে সময় থেকে রিস্ট্রাকচারিং একটি গাইডলাইন দেয়া হলো। আমি যতদূর জানি, কিছুটা অনিচ্ছায় বা কিছুটা চাপে পড়ে পরবর্তী সেই গাইডলাইনকে একেবারে কাটাছেঁড়া করা হয়েছিল। কাজেই এখন বড় ধরনের কোনো আইনগত সংস্কার না করে আমি কোনো সমাধান দেখছি না। কারণ গণচীনে আমি যখন ব্যক্তিগতভাবে ডিউ ডিলিজেন্স করি, তখন আমরা দেখেছিলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এবং প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম কার্লাইল অনেক জায়গায় আরো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে তারা দুর্বল ও স্ট্রেসড অ্যাসেট যেসব ব্যাংকের রয়েছে, তাদের অ্যাসেট কিনেছিল। কিনে তারা সিকিউরিটি ইম্প্রুভ করেছিল, কোলাটেরাল ইম্প্রুভ করেছিল, রিস্ট্রাকচার করেছিল। তারপর সিটি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, জেপি মরগান প্রভৃতি ব্যাংকের কাছে পুনরায় বিক্রয় করে দিয়েছিল। অ্যাসেট কেনার জন্য যে ক্যাপিটাল, সেটি কে দিয়েছে। সেটি কিন্তু কার্লাইল নিজে দিয়েছে বা জেপি মরগান নিজে দিয়েছে। এসব কোম্পানি বাংলাদেশে আসবে। এটা একটা বড় ইস্যু। সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, যাদের আমরা এরই মধ্যে বাধ্য করেছি ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন পুনর্ভরণে, তা কতটুকু নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে নিজে বলেছেন, তার উচিত ছিল ওই ব্যাংককে মরতে দেয়া। সুতরাং আমাদের গ্লানির মধ্যে ফেলতে পারবেন না বা বলতে পারবেন না, আমরাই শুধু সমালোচনা করছি। সাবেক অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, তার উচিত ছিল ফারমার্স ব্যাংককে মরতে দেয়া। এ কারণে অতিরিক্ত ব্যাংক, প্রতিযোগিতা না দেখে, তারপর কাকে ঋণ দিচ্ছি, কনসেন্ট্রেশন রিস্ক রয়েছে, গুটিকয়েক গ্রুপকে ঋণ দেয়া হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। আমি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পরিপত্রটি দেখেছি। সেখানে আমি কিন্তু নতুন কিছু দেখিনি। সেখানে তারা স্পেন, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনের উদাহরণ দেয়া হয়েছে। আমরা অবশ্য এসব উদাহরণের বাংলাদেশে কোনো প্রপার সুইটেবিলিটি অ্যান্ড অ্যাপ্রোপ্রিয়েটনেস টেস্ট করিনি। আমাদের এখানে ১৯৯৭ সালের একটি দুর্বল দেউলিয়া আইন রয়েছে। আমরা এরই মধ্যে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে বলেছি, আলোচ্য আইনটি অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। তারাও কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আমাদের যে অর্থঋণ আদালত আইন, সেটিও অপর্যাপ্ত।

সামগ্রিকভাবে প্রথমত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত. আছে কনসেন্ট্রেশন রিস্ক, তৃতীয়ত. সরকারি আনুকূল্য, চতুর্থত. ব্যাংকগুলো নিজে দায়িত্ব না নিয়ে দুদকের ঘাড়ে দিয়ে দেয়া; পঞ্চমত. আমাদের বিচার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অপরাধের পর্যালোচনা বা বিচার দক্ষতার ঘাটতি। এ পরিপ্রেক্ষিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদন পড়ে মনে হয়েছে, এসব ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষণীয় পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।

ভারতের মতো কিছুটা অভিজ্ঞতা নিয়ে এগোতে হবে। দেশটি ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপসি কোর্ট (আইবিসি) করেছে। সেটার একটি সুইটেবিলিটি অ্যান্ড অ্যাপ্রোপ্রিয়েটনেস টেস্ট কিংবা রিভিউ করতে পারি কিনা, অথবা দক্ষিণ কোরিয়ায় কার্লাইলের অভিজ্ঞতা নিতে পারি কিনা কিংবা সিকিউরিটি কোলাটেরাল ইম্প্রুভ করতে পারি কিনা, তা ভাবার সময় এসেছে।

 

তারল্য সংকট বা খেলাপি ঋণের বিষয়ে আর কিছু বলবেন...

তারল্য সংকট বা খেলাপি ঋণের বিষয়ে একটি কথা বলতে চাই, বেশির ভাগ ব্যাংকের স্থিতিপত্র ব্যবস্থাপনা ভালো না। আমরা ১২ বছরের ঋণ দিচ্ছি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। আমাদের সর্বোচ্চ ফিক্সড ডিপোজিটের মেয়াদ হলো তিন বছরের। এই যে সময়ের/মেয়াদের অসংগতি (টেনিউর মিসম্যাচ) এটা সামলানোর জন্য ক’জন দক্ষ ট্রেজারি ম্যানেজার আছে ব্যাংকগুলোয়। আর যদি কেউ কেউ থাকেও, তাদের কথা কেউ শোনে না। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংক কে চালায়? এখানে ব্যাংক চালায় বোর্ড। আল্লাহকে ধন্যবাদ যে বেশকিছু ব্যাংকে দ্বিতীয় প্রজন্ম এসে গেছে। তারা প্রশ্ন করা শুরু করেছে। ওইসব ব্যাংক দৃশ্যমান উন্নতিও করছে।

 

ভারতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের একটি বার্তা দেয়া হয়েছে, বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, সরকার বা কর্তৃপক্ষ অর্থ আদায় করবে। বাংলাদেশ এমন বার্তা দিতে পারছে না কেন?

বাংলাদেশ স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইউএন চার্টারের একজন সিগনেটরি। কাজেই এখন যদি বাংলাদেশ ইচ্ছা করে, দুদক যদি ইচ্ছা করে (ব্যাংকগুলো পারবে না) এবং আইন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে যদি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়, তাহলে কিন্তু আমরা স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারিতে জাতিসংঘেরও সহায়তা পেতে পারি। এটি সম্ভব হলে যেখানেই থাকুক না কেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ঋণকৃত অর্থ আদায় সহজতর হবে।

 

দেশের ব্যাংকিং খাতে অনৈতিকতার চর্চা বাড়ল কেন? এটি কমানোর কি ব্যবস্থা আছে বলে মনে করেন?

আমরা পর্যালোচনায় দেখেছি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালকরা বেসরকারি ব্যাংকে ফোন করে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের জন্য তদবির করেছে। আমার কাছে প্রমাণ রয়েছে, অন্যের কাছ থেকে শুনেছি তা নয়। আমার সামনেই রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাংকের জনৈক পরিচালক, যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন, দক্ষিণাঞ্চলের এক বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কার্যরত এক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফোন করে ওই অঞ্চলের একজন গ্রাহকের খেলাপি ঋণকে পুনঃতফসিলীকরণের জন্য তদবির করেছেন। বাংলাদেশে সরকার, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যক্তির যে মাখামাখি হয়ে গেছে, এর কারণেও কিন্তু অনেক ঋণের অর্থ আর ফেরত আসছে না। সেই সঙ্গে একটি সত্যিকারের পেশাজীবী শ্রেণী বিকশিত হতে দেয়া হয়নি।

অন্যান্য দেশে খেলাপি ঋণ আদায় করা হয় আইনের আধুনিকায়ন করে কিংবা নতুন আইন করে বা পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা-বিচক্ষণতা ব্যবহার করে। বাংলাদেশে এমনটিই দেখা যাচ্ছে না। তদুপরি সরকার, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অত্যধিক মাখামাখির কারণে এখানে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীও জন্ম নিয়েছে। চীনের মতো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছাড়া খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করা সহজ হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে করি, যদি আইন সংস্কার করা যায়, প্রয়োজনীয় আইনগুলোকে ঢেলে সাজানো যায়, অ্যাসেট টেকওভার আইন করা যায়, যদি ইনসলভেন্সি আইন করা যায়, যদি ব্যাংকরাপসি আইন করা যায় এবং পেশাজীবীদের বিকাশ ঘটানো যায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করা যায়, আর্থিক খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায়, তাহলে খেলাপি ঋণ কমে আসবে। (শেষ)

 

মামুন রশীদ: বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক; পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার

 

সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এম এম মুসা

শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির