বিশ্বের এমন
কোন প্রান্ত নেই যেখানে করোনার থাবা পৌঁছায়নি। উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে ইতোমধ্যেই করোনার ক্ষতির সক্ষমতা , মৃত্যুর হার ছড়ানোর মাধ্যম সম্পর্কে কম-বেশি সকলেই
জেনে যাচিছ। ছোঁয়াচে এ রোগের কোন
প্রতিষেধক এখনও আবিস্কৃত হয়নি, সচেতনতা এবং কিছু নিয়ম-কানুন মানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে গোটা বিষয়।স্বাস্থ্যবিধি যে সব সময়
মেনে চলতে হয়, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজ রাষ্ট্র তথা গোটা মানব জাতির জন্য সে বিষয়টি আমরা
বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। এখন বাধ্য হয়ে আমরা পরিষ্কার থাকার চেষ্টা করছি, থাকছি। এটি কি আমাদের জন্য
বিরাট এক শিক্ষণীয় বিষয়
নয়?
ঢাকা সিটি ছেড়ে মানুষ গ্রামের বাড়িতে গেছেন অনেকে, হাফ ছেড়ে বাঁচার জন্য, বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহন করার জন্য, নিরাপত্তার জন্য, আপনজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভয় হচেছ ক’জন বহন করছেন এই অদৃশ্য ভাইরাস, ক’জন অজান্তেই ছড়াচেছন গ্রামের পাড়াপ্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কে জানে। তবে, তাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কারণে গাড়ী-ঘোড়া ও অতিরিক্ত মানুষের কোলাহলে ব্যস্ত ঢাকায় বিরাজ করছে এখন সুনসান নীরবতা। এখন ঢাকার আকাশে পাখী উড়ছে, দালানের ছাদে পাখী বসছে, গাছে গাছে পাখীর মেলা! মানুষের কোলাহল, অস্থিরতা আর ভয়ে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত থাকতো প্রতিদিনকার বাজারের মতো। এখন নেই সেই অস্থিরতা, সেখানেও বিরাজ করছে নীরবতা আর তাই শান্তিপ্রিয় ডলফিনের পাল খেলা করছে সৈকতে। এ যেন প্রকৃতি নিজ হাতে ওদের জায়গা করে দিয়েছে, মানুষের অত্যচার জোর করে থামিয়ে রেখে। শুধু আমাদের দেশে নয় , পরাক্রমশালী দেশগুলোর মানুষও আজ স্বেচছায় গৃহবন্দী,স্বেচছা নির্বাসনে। তাই পশু পাখীর দল বেরিয়ে এসেছে তাদের নায্য পাওনা আদায় করতে যা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম যে, এই প্রকৃতি, এই গ্রহ সব আমাদের নয়। মানুষের জায়গায় সৈকতে এখন কুমীরের পাল রৌদ্রস্নান করছে!এখানে অধিকার রয়েছে সকল ধরনের প্রাণী ও সকল ধরনের ও সকল দেশের মানুষের। আমরা শুনে অবাক হই যে, দুবাইয়ের মানুষ এত ধনী যে, টাকা দিয়ে তারা ব্যক্তিগত গাড়ীতে স্বর্ণের প্রলেপ দেয় অথচ বিশে^র লক্ষ কোটি নিরন্ন মানুষ এখনও কত মানবেতর জীবন যাপন করছে! সৌদি আরবের মতো ধনী দেশে আমাদের দেশের নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষনের শিকার হচেছ অহরহ। এই কি মানবতার শিক্ষা!
প্রৃকতির ওপর আমরা নিজেদের স্বার্থে কত অত্যাচার করছি, প্রকৃতি যেন সবকিছু সহ্যই করছে। কিন্তু আর কত? এক কোটি ৩০ লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী নাকি ঢাকা ছেড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ’ এয়ার ভিজুয়াল’ বলেছে বায়ুমান সূচক ৩০০-এর উপরে গেলে তাকে দুর্যোগপূর্ন অবস্থা বলা হয়। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ঢাকার এ সূচক এখন মাত্র ৮৫।ক’মাস আগেও দিনের বেশিরভাগ সময় ঢাকা শহরের সূচক থাকতো ৩৯১ যা সর্বোচচ।এবার দেখুন প্রকৃতিকে আমরা কতটা ভারসাম্যহীন করে ফেলেছি নগর সভ্যতা, আধুনিক সভ্যতার নামে।আসলেই কি এই সভ্যতা আমাদের সভ্য হওয়ার শিক্ষা দেয়? আমরা যদি একে সভ্যতাই বলি তাহলে বিশে^ প্রতিটি প্রান্তেই এত হানাহানি, রক্তারক্তি কেন?প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯১৪সালে ইউরোপে। এই যুদ্ধে ৭০মিলিয়ন সামরিক বাহিনী অংশগ্রহন করেছিল এবং ঐ যুদ্ধে সরাসরি ১৮৬বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছিল আর পরোক্ষভাবে ব্যয় হয়েছিল ১৫১বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নিহত হয়েছিল ৯০লাখ যোদ্ধা আর ৫০লাখ নিরীহ মানুষ। আহত হয়েছিল ২ কোটি ১০ সাধারণ মানুষ আর কত নারী যে ধর্ষিতা হয়েছিল সে খবর কে রাখে? এতে ধবংস হয়েছিল চারটি অঙ্গরাজ্য। একইভাবে ১৯৩৯সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধেও ক্ষয়ক্ষতি প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি। সভ্য (?) মানুষরাই তো এই যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল? তবে, দুটি বিশ্ব যুদ্ধে যেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তেমনি পৃথিবী শিখেছেও কিছু যেমন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা আর জাপানের সভ্য হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে সেই অর্থে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েনি, জাপান ত্রাতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এভাবে করোনা যুদ্ধের শিক্ষাও আমাদের এক নতুন পৃথিবী উপহার দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস ।
সন্দেহ নেই আমরা ধনী গরীর, উন্নত-অনুন্নত, শিল্পোন্নত আর শিল্পে পিছিয়ে পড়া সকল দেশ ও জাতি এখন কাতারে এসে দাঁড়িয়েছি। বিজ্ঞানের যে চরম উন্নতির কথা বলছি তা প্রকৃতির কাছে ছেলেখেলা মাত্র! কিছু দেশ অজ সম্পদের মালিক হবে আর সেই সম্পদ দিয়ে গরীব দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের জন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে আধুনিক মারণাস্ত্র বানাবে এটি কোনভাবেই মানবতার শিক্ষা নয়।করোনা আমাদের শিখিয়েছে আমরা প্রকৃতির কাছে কত অসহায়! আমাদেরকে শিখিয়েছে আমাদের সম্পদ গোটা পৃথিবীতে একেবাবের সমভাবে না হলেও সন্মোষজনক অনুপাতে ভাগ করতে হবে সব জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে। প্রকৃতি কোন দেশের মাটির নীচে , কোন দেশের মাটির ওপর সম্পদ দিয়েছে নিজেরা যাতে সবকিছু সমভাবে বন্টন করে নেয়। মানবজাতি সেই হিসেব ভুলে গিয়ে বরং উল্টো খেলায় মত্ত। তাই করোনা শিক্ষা দিতে এসেছে তোমরা সবাই এক। তোমারা তোমাদের শত্রু নও। তোমাদের শত্রু দারিদ্র, রোগব্যাধি ও অমানবিকতা। অতএব তোমারা মানিবক হও।
দুটো বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও ছোটখাট অনেক যুদ্ধ ও কয়েকটি মহামারী পৃথিবীকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এর মধ্যে ১৩২০ সালের দ্য ব্ল্যাক ডেথ অফ বুবোনিক প্লেগ, ১৪২০ সালের দ্যা এওইডেনিক অব ব্ল্যাক ডেথ প্লেগ, ১৫২০ সালের গুটিবসন্ত , ১৬২০সালের মে ফ্লাওয়ার, ১৭২০সালের দ্য গ্রেট প্লেগ অব মার্শেই, ১৮২০সালের কলেরা মহামারি ও ১৯২০ সালের দ্য স্প্যানশি ফল উল্লেখযোগ্য। স্প্যানিশ ফলতই মারা গিয়েছিল ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ। দেখা যায় একশত বছর পর পর এক এক ধরনের মহামারী বিশ্ব কে নাড়া দিয়ে গিয়েছে। প্রতিটিতেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এসব ইতিহাস জেনে মানুষ যেন একটু বেশিই ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচেছ ভয় পেয়েও মানুষ অসৎ পথ এবং দুষ্কর্ম করা মোটেই থামায়নি। তার প্রমান হচেছ বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জন্য যে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে সেগুলো উধাও হয়ে যাওয়া, সেগুলো চুরি করা, লুকিয়ে রাখার মতো ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। তার মানে কি? আমরা এখনও কিছু শিখছিনা?
২০০২-২০০৩ সালে চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সার্স ভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। ২০০৯-২০১০ সালে হয়েছিল সোয়াইনফ্লু। এসব মহামারী পশ্চিমা জগত ছাড়া পৃথিবীর অন্যত্র কোথাও না কোথাও ভয়ংকর রূপ নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। এবার কভিড-১৯ ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। তাদের দম্ভ, অস্ত্রবল, অর্থবল যেন ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। ইটালির মতো শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টের মুখে শুনতে হয়, ‘আমরা সমসন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি। আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে মারা গিয়েছি। আর কি করতে হবে আমাদের আমরা জানিনা। পৃথিবীর সমস্ত সমাধান শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন একমাত্র সমাধান আকাশের কাছে। ’চীনের কমিউনিষ্ট প্রেসিডেন্ট মুসলিমদের মসজিদে গিয়ে স্্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেছেন। তার অর্থ হচেছ জাত-পাত, ধর্ম-অধর্ম, মান-অভিমান, ভুলে প্রত্যেকের পাশে প্রত্যেকে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। করোনা সেই শিক্ষা দিতেই এসেছে।
আমাদের দেশের মতো গরীব দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২১০১ কোটি টাকা অথচ স্বাস্থ্য খাতে ছিল ২৫৭৩২ কোটি টাকা, কৃষিতে বরাদ্দ ছিল ১৪০৫৩ কোটি টাকা। এই হলো আমাদের গরীব দেশের বাজেটের চিত্র। আর উন্নত বিশ্ব তো মেতেই আছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র বানানো নিয়ে। আমেরিকায় যেমন ডগলাস, লকহীড ও জেনারেল ডিনামিক্্েরর মতো বড় বড় অস্ত্রের কোম্পানী। যাদের কাজই হচেছ অস্ত্র বিক্রীর জন্য গোটা পৃথিবীকে সব সময় অস্থির করে রাখা। বিশে^র অধিকাংশ দেশে বিশেষ করে গরীব দেশে মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল সেই, আছে নামমাত্র। মানুষের শারীরিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, মানসিক চিকিৎসার জন সেই অর্থে ভাল লাইব্রেরি নেই, গবেষণাগার নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই কিন্তু এসব অর্থনৈতিকভাবে মাজাভাঙ্গা সবদেশেই রয়েছে বিশাল বিশাল সুনসান ও সুসজ্জিত ক্যান্টনমেন্ট! দেশের অর্ধেক মানুষকে না খাইয়ে রেখে কিংবা রাষ্ট্রীয় সব মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত রেখে তারা সামরিক খাতে মহাউল্লাসে দেশের সম্পদ ব্যয় কর চলছে। করোনা শিক্ষা দিতে এসেছে ‘তোমরা এগুলো করেনা’।
মাছুম বিল্লাহ
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ভাইস-প্রেসিডেন্ট
বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশেন( বেল্টা)
এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ,রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যিালয় শিক্ষক
masumbillah65@gmail.com










