অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে অপরাধের ধরন বদলে গেছে। প্রচলিত অপরাধকর্মের পাশাপাশি অন্তর্জালের মাধ্যমে অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। যে কারণে অপরাধের পরিবর্তিত কৌশল ও কর্মপন্থা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধী শনাক্তে নিতে হচ্ছে উপযুক্ত প্রস্তুতি। বস্তুত অপরাধ যেমন ধরন বদলেছে, ঠিক তেমনি অপরাধী শনাক্তেরও নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এখন সাইবার অপরাধের বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ই-ট্রানজেকশন, হ্যাকিং ও অনলাইনে প্রতারণা। এসব অপরাধের মূল লক্ষ্য কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ, সেই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার করার বিষয়টিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন অপরাধ শনাক্তে বিলম্বের কারণে অর্থসংক্রান্ত অপরাধ বাড়ছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করতে ইচ্ছুক।

রাজধানী ঢাকার সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। ডিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিনিয়তই ডিজিটাল অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে।

এভাবে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে অর্ধেকেরই বেশি অর্থসংক্রান্ত কারণে হচ্ছে। অর্থাৎ এতদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানি, পর্নোগ্রাফিবিষয়ক মামলার যে আধিক্য ছিল সেটি আর্থিক অপরাধে রূপান্তরিত হয়েছে। মূলত প্রযুক্তির অল্প বিস্তারের সময়টিতেই অপরাধ প্রযুক্তির আশ্রয় নেয়। ল্যান্ডফোনের দিনগুলোতে বা মোবাইল ফোনের বিস্তারে এসব যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে। শুরুর দিকে এসব ক্ষেত্রে অপরাধীদের ধরতে বেগ পেতে হলেও ধীরে ধীরে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন এবং জিপিএস ট্রাক সুবিধার জন্য মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অপরাধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাই এখন ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ট্যাঙ্গো, বিগোসহ বিভিন্ন অনলাইন ডেটিং সাইটের মাধ্যমে অপরাধ হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রবাসীসহ দেশের উচ্চবিত্তদের টার্গেট করা হলেও সরলমনা মানুষও সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে পড়ছে।

অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হলেও তারা ঠিকই জামিনে বের হয়ে আবারো একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। তার মানে অন্যান্য অপরাধের মতো সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রেও কারাগার সংশোধনাগারের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এক্ষেত্রে যে শাস্তির ব্যবস্থা হচ্ছে তা আসলে কারাগারের বদ্ধ দেয়ালে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নির্দিষ্ট সময় দিনাতিপাত ছাড়া আর কিছুই হয় না।    

প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে, আর এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রযুক্তিকে আশ্রয় করে অপরাধের সংখ্যাও বাড়ছে। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সর্বশেষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত থাকা প্রয়োজন। এজন্য উন্নত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সিডিএমএস, সিআইএমএস ও এসআইভিএস প্লাসের মতো আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো উদাহরণ মিলছে না। অপরাধীদের ধরার পর জেল খেটে বের হয়ে আবারো একই অপরাধে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা যেন না ঘটে সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। অপরাধীদের সংশোধনে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য উন্নত বিশ্বের উদাহরণগুলো অনুসরণ করা প্রয়োজন।

এটা সত্য, বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সম্পদের বণ্টন সুষমভাবে বিভাজিত হচ্ছে না। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, এর বিপরীতে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের অবস্থান বেশি, সেখানে অপরাধও বেশি হচ্ছে।

আর এসব সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষ জড়িত থাকে। তাই অপরাধী শনাক্তে বহুমুখী তৎপরতা প্রয়োজন। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে। বিশেষ করে এমএফএসের মাধ্যমে যেভাবে প্রতারণা করা হয়, সেক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রচারণা হলেও প্রতারণা থামছে না। তাই মানুষের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এখন একটি ফোনেই ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এমএফএসসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপগুলো ব্যবহার করা যায়। এজন্য অনলাইনে থাকা অবস্থায় এর সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো লিংকেই ক্লিক করা যাবে না। ফেক আইডির বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে অনলাইনে আমরা যা কিছুই করি না কেন, তার সব তথ্যই সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাই অনলাইনে সবসময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পরিচিত বা অপরিচিত কারো সঙ্গেই একান্ত ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা উচিত না। পাসওয়ার্ড ব্যবহারে মনোযোগী থাকতে হবে। নিজের ফোনের পাসওয়ার্ড বা ডেবিট কার্ডের পিন কারো সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।

ইদানীং অনলাইন প্লাটফর্মে ভূঁইফোঁড় কোম্পানির আনাগোনা বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, বুমবুম, কিউকম, ধামাকাসহ বেশকিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তাই অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। বুঝেশুনে প্রয়োজনে পণ্য হাতে পেয়ে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ছাড়া অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করা মোটেও সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে না।  

জুয়ার কার্যক্রমও বর্তমানে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব জুয়ার ফাঁদে পড়লে সর্বস্বান্ত হওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকবে না। অভিভাবকদেরও উচিত সন্তান মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে কী করছে সেদিকে দেখভাল করা। আর সামগ্রিকভাবে নৈতিকতার চর্চা করা উচিত। এজন্য ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই। কেননা অন্তর্জালে অনৈতিক কার্যকলাপ এড়াতে উন্নত মানসিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্তর্জালজুড়ে অসংখ্য ইতিবাচক উপাদান ছড়িয়ে আছে। নিছক সময় কাটানোর জন্য হলেও অনলাইনে এলে তার মধ্য থেকে জীবন গড়ার অনুষঙ্গ খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু সেটি না করে অশালীনতার মুখোমুখি হলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হিসেবে হতাশা ছাড়া আর কিছুই জুটবে না।

প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করবে, কিন্তু সম্প্রতি অনলাইনে এমন সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা জানার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও হতবাক হয়ে যান। অনেকেই বিপুল অর্থ হারানোর পর পুলিশের দ্বারস্থ হন কিংবা কেউ কেউ লজ্জায় অভিযোগও জানাতে চান না। তাই আসলে এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আত্মসম্মানবোধ বজায় রাখলে এবং বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় এমন কাজে না জড়ালে অনলাইনে কেউ অনিরাপদ বোধ করেন না। এজন্য অনলাইনে যেকোনো আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখতে হবে। আর অর্থসংক্রান্ত এসব অপরাধ যেহেতু সংঘটিত হচ্ছে, তাই সাইবার অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ফরেনসিক তদন্তসংক্রান্ত দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিশেষায়িত ইউনিটের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধী শনাক্ত এবং সঠিক তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।