নিজস্ব সংস্কৃতিকে উপলব্ধি এবং এর নিরন্তর চর্চা করা যেকোনো জাতির জন্যই গৌরবের। এ গৌরব বাঙালি জাতিরও রয়েছে। হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি আমাদের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বাঙালি। এ বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত রূপ ফুটে ওঠে বাংলা নববর্ষের দিন। বাংলা নববর্ষ বাঙালির সমগ্র সত্তা, অস্তিত্ব ও অনুভবের সঙ্গে মিশে আছে। এটা বাঙালি সংস্কৃতির উজ্জ্বল দিক। পহেলা বৈশাখ, বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরাসহ দেশ-বিদেশে বসবাসরত প্রত্যেকটি বাঙালি নববর্ষ হিসেবে পালন করে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন প্রাণের উৎসব। বাঙালির এ প্রাণের উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে আবহমান বাংলার কৃষি। গ্রামীণ মেলাগুলো পরিণত হয় উৎসবে। এ উৎসবের রঙ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে বারবার। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। 

বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও নাগরিক জীবন ও সরকারি কর্মকাণ্ডের সবকিছু চলে ইংরেজি ক্যালেন্ডার হিসেবে। তার পরও বাঙালির গভীর মানসে বাংলা নববর্ষের স্থান অনেক উঁচুতে। বাঙালির মন-প্রাণজুড়ে রয়েছে বাংলা নববর্ষ। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমারসহ নানা পেশার মানুষ যুগ যুগ ধরে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে আনন্দ-উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ব্যবসায়ীরা এখনো হিসাবের নতুন খাতা ‘‌হালখাতা’ খোলেন বৈশাখের প্রথম দিনে। ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন বছরে নতুন গতি পায়।

পহেলা বৈশাখের উৎসব সর্বজনীনতায় রূপ নিলেও বর্তমান সময়ে বিষাদের রেশ রয়ে গেছে দেশবাসীর মনে। উচ্চমূল্যস্ফীতিতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ চাপে রয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) খাবারের ট্রাকে মানুষের সারি দিনে দিনে বড় হচ্ছে। ডলার সংকটে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটে শিল্পের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ছে। কিছুদিন আগেই বঙ্গবাজারের আগুনে বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ীরা। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সুসংবাদ নেই। প্রবাসে বাংলাদেশীদের জন্য নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গতি আসেনি। বৈশাখকেন্দ্রিক যে অর্থনীতির জোয়ার বয়ে যাওয়ার কথা, সেটিও চলতি বছর কিছুটা স্তিমিত হয়ে আছে। 

বিশ্ববাজারে এক ধরনের মন্দাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে যে বৃহৎ আন্তর্জাতিক বাজারগুলো, বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোয় মন্দাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি চীনের মতো অর্থনীতিতেও সংকোচনের পরিস্থিতি দেখছি। এ অবস্থায় একদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে যেহেতু বাংলাদেশের রফতানি বাজারের দুটো বড় কেন্দ্র হচ্ছে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ। এসব দেশে যদি মন্দাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘদিন বিরাজ করে, তাহলে বাংলাদেশের রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা নিয়ে এক ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। তবে মন্দাবস্থার একটা উল্টো দিকও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটা বড় সময়জুড়ে আমরা দেখেছি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তার একটা বড় কারণ ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার ফলে বিশ্ববাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে—পরিবহন খরচ বেড়েছে, অনিশ্চয়তা বেড়েছে। সরকারের যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, সেটির ব্যাপক প্রসারের প্রয়োজন রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা আছে, বিশেষ করে দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, তালিকাভুক্তীকরণে ভুল—এগুলো সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব সমস্যা বিরাজ করছে, সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। কর খাত, ব্যাংক খাত, বাণিজ্যনীতি, মুদ্রার বিনিময় হার—এসব খাতে আমরা কীভাবে সংস্কার করব এবং যৌক্তিকভাবে এসব সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেদিকে আমাদের গভীরভাবে নজর দেয়া দরকার।

তবু মানুষ নববর্ষের আনন্দ উদযাপন করবেন। মানুষের সমুচ্চারিত আনন্দের ঢেউয়ের দেখা মিলবে দেশজুড়ে। নানা বিবর্ণ সময়ের মধ্যেও বাঙালি উৎসবের আমেজ খুঁজে নিতে চায়। এটিই জাতি হিসেবে আমাদের অনেক বড় পাওয়া। যেহেতু নতুন বছরে পুরনোকে পেছনে ঠেলে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, তাই নব উদ্যমে জীবনের জয়গান গাওয়ার এটিই উপযুক্ত সময়। 

নাগরিক জীবনেও নববর্ষের আবেদন কম নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল থেকেই ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখবরণ উৎসব শুরু হয় মহাসমারোহে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উদ্যোগে বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। রঙবেরঙের মুখোশ পরে নানা সাজে সজ্জিত হয়ে এতে অংশ নেয় সব শ্রেণীর মানুষ। বৈশাখ উপলক্ষে ফ্যাশন হাউজগুলোতেও থাকে নানা আয়োজন। এভাবে বৈশাখ আসে প্রাণের উৎসব হয়ে। বাংলা সনের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িত এ দেশের সংস্কৃতির জীবনধারা এবং প্রকৃতির অবস্থার সঙ্গে ফসলের মৌসুম এবং খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন-তারিখ তথা পঞ্জিকার প্রবর্তন হলেও এ নববর্ষ উৎসব বাঙালির চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে। এটা এমন একটা উৎসব যাকে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীসহ সবাই সর্বজনীনভাবে আনন্দে বরণ করে নেয়। নতুন বছরে প্রত্যাশা থাকবে অর্থনীতিতে গতি আসবে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘব হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ছন্দ ফিরবে।

বাংলা নববর্ষ আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সংকল্পের প্রেরণা জোগায়। দুঃখ-গ্লানি, অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে তাই এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়ার দিনও পহেলা বৈশাখ। প্রত্যাশা থাকবে নতুন বছরে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থনীতির যেসব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে কিছু কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। জাতীয় নির্বাচন সমাগত। অর্থনীতির এমন টালমাটাল অবস্থায় দেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে তা হবে আরো ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। সম্প্রীতির পথে উৎসবের আনন্দ সবার জীবনে ছড়িয়ে পড়ুক আমরা সে প্রত্যাশাই করি। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্বাগত ১৪৩০।