ষাটের দশকে বাংলাদেশে যত নদী ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক-চতুর্থাংশে। ৫০ বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ৫২০টি নদী। ২৩০টির মতো যে নদী টিকে আছে, শুকনো মৌসুমে তার বেশির ভাগেই পর্যাপ্ত পানি থাকে না। প্রতিনিয়ত দখল ও দূষণের কারণে নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। নদী রক্ষা ও উদ্ধারে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। নদী রক্ষা কমিশনের রয়েছে শত সুপারিশ। নদীদূষণ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায় হিসেবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা দিয়েছেন আদালত। তবে নদী রক্ষায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকার কারণে অবস্থা ক্রমে নাজুক হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নদী রক্ষায় আইনের শক্ত প্রয়োগ জরুরি।
ভারত, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টায় নিয়োজিত। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। শ্রীলংকার আদালত যেমন নদী থেকে বালি উত্তোলনের ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সরকারি পর্যায় থেকে বালি উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও নদী রক্ষার কারণ দেখিয়ে গত বছর অংশীজনদের আবেদন মঞ্জুর করেন দেশটির আদালত। পরিবেশ ও নদীর বাস্তুতন্ত্রের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আদালতের পক্ষ থেকে বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পরিবেশ আইন অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরাসরি নির্দেশনা দেয়া হয় পুলিশকে। ২০১৮ সালে থাইল্যান্ডের একটি প্রাকৃতিক জলাভূমিকে ব্যবসায়ীদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার বিষয়টি রুখে দেয় স্থানীয় জনগোষ্ঠী। জলাভূমিটি প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সবাই একজোট হয়ে প্রচারণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ফলে তারা সফল হয়।
আমাদের গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের প্রায় সব নদীই দখল ও দূষণের শিকার। শিল্প-কারখানার বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতেই। ময়লা-আবর্জনার কারণে একদিকে যেমন জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একমাত্র প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে বিষয়গুলোর সমাধান টানতে। শিল্পবর্জ্যের দূষণ থেকে নদী রক্ষায় শিল্প-কারখানায় ২৪ ঘণ্টা ইটিপি চালু রাখার বিষয়টি যেমন নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি অভিযুক্ত কারখানা মালিকদের যথাযথ শাস্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দৃষ্টি দিতে হবে নদী ভরাট সমস্যার দিকে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা কিংবা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দখল ও দূষণ রোধে নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। আদালত রায় ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে দখলকারীদের নানা উদ্যোগে ও আইনি জটিলতায় নির্দেশনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। নানামুখী চাপে অনেক জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান বেশি দূর এগোয়নি। ঢাকার বাইরেরও একই অবস্থা বিদ্যমান। দখলমুক্ত করার পর অনেক জায়গা এরই মধ্যে আবারো অবৈধ দখলে চলে গেছে। জেলা পর্যায়ে নদী রক্ষা কমিটি রয়েছে। তারা নদী ভরাট ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের নিয়ে কাজ করতে পারে। নদী খননের প্রশাসনিক কার্যাদি সম্পাদন ও নদী রক্ষায় নানা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা জরুরি। তবে শুধু জেলা প্রশাসন অথবা পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী বাঁচাতে পারবে না। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দায়ীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি ঘটানো জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে নদীর দূষণ ও দখল রোধ করা সম্ভব। প্রয়োজনে নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নদীদূষণ রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় শিল্পবর্জ্য শোধনাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগার তৈরিতে জোর দেয়া চাই। পাশাপাশি হারানো নদীগুলোকে ফিরে পেতে সরকারি উদ্যোগে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়া জরুরি। উজান থেকে নেমে আসা পলি নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তাই ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীগুলোয় পানিপ্রবাহ ধারাবাহিক রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর এর ব্যবস্থাপনা ও তদারক করতে হবে। প্রয়োজনে নদী রক্ষায় স্থায়ী সার্ভে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যারা কয়েক মাস অন্তর নদীর পাড় সরেজমিন পরিদর্শন করে নৌ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশবাদী সংগঠনের কাছে রিপোর্ট জমা দেবে। এভাবে নদীপ্রবাহ সচল রাখা ও নদী রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বড় রকমের ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের। নদীর অস্তিত্বও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা এককভাবে আমাদের নেই। তবে দেশের নদ-নদী রক্ষার মাধ্যমে আমরা সম্ভবত পরিস্থিতির অবনতির মাত্রা কমিয়ে আনতে পারি। সরকারের বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে সারা দেশের মরে যাওয়া, নাম হারানো নদীগুলো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য টেকসই পরিকল্পনাভিত্তিক প্রকল্প নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নদীর ন্যায্য পানি প্রাপ্তির জন্য ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও টেকসই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।










