সংবিধানে ‘নিরাপদ পণ্য ও সেবা’ লাভের সুযোগ একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য এসডিজিতেও ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ’ বিশেষ তাত্পর্যের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়েছে। সরকারের নীতি এজেন্ডায়ও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এজন্য রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার কমতি নেই। সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আলাদা কর্তৃপক্ষ। তবু ভোক্তা অধিকার অনেকটা অরক্ষিত। এখনো দেশে নানাভাবে ঠকছে ভোক্তা। পণ্য বিক্রিতে নিত্যনতুন কৌশলে প্রতারণা করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। একদিকে বিক্রি হচ্ছে নকল ও ভেজাল পণ্য, অন্যদিকে অর্থ নেয়ার পর ভোক্তাকে পণ্য ও সেবা না দেয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করছে প্রতারক চক্র। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশে সোমবার পালিত হলো বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। দিবসটি আবারো ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে আইনের প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

সন্দেহ নেই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ আগের চেয়ে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে প্রতিনিয়ত নানা অভিযোগ আসছে। দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানাও করছে সংস্থাটি। ভোক্তারাও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন। তবে সংস্থাটির কাঠামোগত কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। এখনো এর কার্যক্রম অনেকটা বড় শহরকেন্দ্রিক। বড় শহরে অভিযোগ বেশি পাওয়া গেলেও জেলা শহরগুলোয় তেমন সাড়া মিলছে না। এর পেছনে বড় কারণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আছে লোকবল ঘাটতিও। এখনো কিছু জেলায় প্রতিষ্ঠানটির অফিস চালানোর মতো জনবল নেই। সংস্থাটিকে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

বর্তমানে ব্যবসায়িক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশে অনলাইন ব্যবসা বা ই-কমার্সের বিস্তার সম্প্রসারণশীল। বিশেষ করে করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে অনলাইনে পণ্য ও সেবা কেনাবেচা বেড়েছে। এ সুযোগে প্রতারণাও বেশি হচ্ছে। পণ্য ও সেবা না দিয়েই অর্থ হাতিয়ে নিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন চক্র। ঠিকানা ব্যবহার না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পণ্য বিক্রির অফার দিচ্ছে। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব টাকা নিয়ে পণ্য দিচ্ছে না। কিন্তু ঠিকানা না থাকায় এসব ফেসবুক পেজ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ওয়েবসাইটভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ভোক্তা ঠকানোর অভিযোগ এন্তার। অথচ অনলাইনে পণ্যসেবা নিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ প্রতিকার দিতে পারছে না অধিদপ্তর। দেখা যাচ্ছে, অনলাইন প্লাটফর্মের বাইরে অভিযোগগুলো ভালোভাবে নিষ্পত্তি করতে পারলেও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা বা দণ্ড দিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সংস্থাটি। এর কারণ এসব প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইটে ইংরেজি ভাষায় নানা শর্ত দিয়ে রাখে। সেখানে পণ্য দেরিতে দেয়া, যেকোনো সময়ে ফরমাশ বা অর্ডার বাতিলসহ নানা সুযোগ তারা রেখে দেয়। ক্রেতা বা সেবাগ্রহীতা এসব শর্ত পড়ে না বিধায় অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হয়। বিধিগত সীমাবদ্ধতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া যায় না। এখন পর্যন্ত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কী কী শর্ত দিতে পারবে, তার কোনো নির্দেশিকা নেই। এ সুযোগে ইচ্ছামতো শর্ত জুড়ে দিচ্ছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। নির্দেশিকা থাকলে ব্যবস্থা নেয়া সহজ। কাজেই এ-সম্পর্কিত একটি নির্দেশিকা এখন সময়ের দাবি।

কেবল আইন প্রয়োগের ব্যাপার নয়, ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় ব্যক্তি সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সচেতনতা বেড়েছে। অধিদপ্তরে আসা অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি তারই প্রমাণ। তবে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা ঘাটতি প্রবল। এমনকি অনেকেই জানে না, পণ্য কিনে ঠকলে বা কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার পাওয়ার অধিকার তাদের আছে। সুতরাং ভোক্তা অধিকারবিষয়ক প্রচার-প্রচারণা আরো বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমে নিয়মিত বিরতিতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি অভিনব বিভিন্ন প্রচারাভিযান চালানো যেতে পারে। ভোক্তা অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো উদীয়মান চ্যালেঞ্জ। তাদের চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ট্র্যাকিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আনতে হবে আইনগত সময়োপযোগী পরিবর্তন। সীমিত সামর্থ্যে সংস্থাটি ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের একক প্রচেষ্টায় পুরোপুরি ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষা সম্ভব হবে না; সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এক্ষেত্রে উদ্যোগী হতে হবে। সম্মিলিত প্রয়াসে দেশে ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষিত হবে বলে প্রত্যাশা।