যুদ্ধ যত দূরেই সংঘটিত হোক না কেন, তার নেতিবাচক প্রভাব আর ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে থাকে না। বৈশ্বিক অর্থনীতির এ যুগে যুদ্ধ মানে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যয় ও ঝুঁকির বিস্তার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ সে বাস্তবতা নতুন করে সামনে আনতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। এ সংঘাতের ফলে জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবহন খাত একযোগে গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে, এটা অনেকাংশে নিশ্চিত।
মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস রাজনীতির কেন্দ্র। এ অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। সরবরাহ কমুক বা না-কমুক, ঝুঁকির মূল্যবৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর, যারা জ্বালানি আমদানিতে এ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
রূঢ় বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি? দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে দীর্ঘদিনের অবহেলা, সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে পেট্রোবাংলা কার্যকর বিকল্প গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে যুদ্ধ শুরু হলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ভর্তুকির চাপ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাড়তি মূল্য দিতে হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেবল ট্যারিফ সমন্বয় বা সাময়িক ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দেয়া একটি নীতিগত ব্যর্থতা, যার রাজনৈতিক মূল্য ভবিষ্যতে আরো বেশি আকারে দেয়া লাগতে পারে।
অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের বৈধতার সঙ্গে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক গম, ভোজ্যতেল ও সারের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, এটা বহুলাংশে নিশ্চিত। পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য আমদানির মোট ব্যয় বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বাজারে।
বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করে। অথচ কৌশলগত খাদ্য মজুদ, দেশীয় উৎপাদন জোরদার এবং আগাম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তাকে যদি এখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা না হয়, পরিণতি হতে পারে গুরুতর।
জ্বালানি ও খাদ্য সংকটকে আরো তীব্র করে তুলছে পরিবহন ও লজিস্টিক খাতের দুর্বলতা। যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং রুট ঝুঁকির মুখে পড়ে, বীমা প্রিমিয়াম ও ভাড়া বেড়ে যায়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো কৌশলগত নৌপথে অস্থিরতা মানেই বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি।
পরিবহন খাতকে এখনো জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা হয় না। এটাও এ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। বিকল্প রুট, কৌশলগত জাহাজ সক্ষমতা কিংবা লজিস্টিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—কোনোটিই যথাযথভাবে প্রস্তুত নয়।
জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন—এ তিন খাত বাস্তবে একটি চক্রের অংশ। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়ে, আর খাদ্যের দাম বাড়লে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। অথচ নীতিনির্ধারণে এ আন্তঃসম্পর্ক উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরবর্তী ঘটনা নয়; এটি আমাদের নীতিগত প্রস্তুতির দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। এ সংকটকে যদি আবারো সাময়িক বৈশ্বিক অজুহাত হিসেবে দেখা হয়, তবে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে আরো বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে।
আমি মনে করি, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির পুনর্মূল্যায়ন, দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দৃশ্যমান এবং জরুরি বিনিয়োগ, খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার স্তরে উন্নীত করা এবং পরিবহন ও লজিস্টিক খাতকে অনতিবিলম্বে কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় আনা খুবই জরুরি।
জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা কোনো কারিগরি বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে আগামী সংকটে তার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
মো. মুখলেছুর রহমান: পেট্রোএশিয়া গ্লোবাল এফজিইর বিপণন প্রতিনিধি










