গত ৫-৯ সেপ্টেম্বরে সম্পন্ন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকে ওয়াকিবহাল মহল একেবারেই ব্যর্থ একটি সফর হিসেবে অভিহিত করছেন। প্রধানমন্ত্রী তার সংবাদ সম্মেলনে ‘খালি হাতে ফেরত আসেননি’ বলে দাবি করলেও বলতেই হবে এবারের সফরটি বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাপ্তি নিয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে একটি জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে আগামী জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তিস্তা প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে নাকি ভারত আর বাধা দেবে না। ওই খবরে দুজন প্রতিমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করা হয়েছিল। খবরটির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করার কোনো কারণ ছিল না। খবরটি যদি সঠিক হয় তাহলে এ দীর্ঘ অপেক্ষমাণ ইস্যুর জট খুলবে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু দুই মাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকটি খবর বেরিয়েছে যে ভারতের গণমাধ্যমে (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমে) দাবি করা হচ্ছে, ভারত পর্দার আড়ালে চীনকে এ প্রকল্পে জড়ানোর বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিং মিং প্রকল্প এলাকা সফরে গিয়েও প্রকল্পটিকে ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ আখ্যা দিয়ে এসেছেন। তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও ওয়াকিবহাল মহল ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে তিনি ভারতের বিরোধিতার বিষয়টিকেই ফোকাস করতে চেয়েছেন। তার সফরের পর প্রকল্পটির ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের আর কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। বরং, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নতুন করে বলেছেন যে অদূর ভবিষ্যতে সরকার আর কোনো মেগা প্রকল্প শুরু করবে না। এখানে কি তিস্তা প্রকল্পও ঝুলে যাওয়ার কথা বলা হলো?
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি তিস্তা
পারের জনগণের
মধ্যে প্রবল
আগ্রহ সৃষ্টি
করেছে। কারণ
এটির বাস্তবায়ন
হলে নীলফামারী,
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম
ও গাইবান্ধার মানুষের জীবনের গতিধারা
অনেকখানি বদলে
যাবে, তাদের
অমানুষিক ভোগান্তির
অবসান হবে।
কয়েক বছর ধরে জানা
ছিল যে প্রস্তাবিত তিস্তা
প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়ে যাওয়া
সত্ত্বেও ভারতের
প্রবল আপত্তির
মুখে সেটা
অনুমোদনের জন্য
একনেকে উপস্থাপন
করা হচ্ছে
না। প্রায়
চার বছর আগে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্প প্রণয়নের
জন্য চীনের
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অনুরোধ
জানিয়েছিলেন, যাতে
‘চীনের দুঃখ’
হিসেবে একদা
বিশ্বে বহুল
পরিচিত হোয়াংহো
নদী বা ইয়েলো রিভারকে
চীন যেভাবে
‘চীনের আশীর্বাদে’
পরিণত করেছে
ওই একই কায়দায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর
জনগণের জন্য
প্রতি বছর সর্বনাশ ডেকে
আনা তিস্তা
নদীর পানি
ব্যবস্থাপনাকেও একটি
বহুমুখী প্রকল্পের
মাধ্যমে আধুনিকায়ন
করা যায়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে
সম্পূর্ণ চীনা
অর্থায়নে প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ
ও বাস্তবায়নের পর প্রকল্প প্রস্তাবটি চীনের পক্ষ থেকে
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার প্রস্তাব
দেয়, বাংলাদেশও
ওই প্রস্তাব
গ্রহণ করে।
প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশের সীমানার ভেতর দিয়ে
প্রবাহিত তিস্তা
নদীর ১১৫ কিলোমিটারে ব্যাপক
খনন চালিয়ে
নদীর মাঝখানের
গভীরতাকে দশ মিটারে বাড়িয়ে
ফেলা হবে এবং নদীর
প্রশস্ততাকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে ফেলা হবে।
একই সঙ্গে
রিভার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক ভূমি
উদ্ধার করে চাষাবাদের সুযোগ
সৃষ্টি করা হবে। নদীর
দুই তীর বরাবর ১১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের
চার লেনের
সড়ক নির্মাণ
করা হবে।
উপযুক্ত স্থানে
বেশ কয়েকটি
ব্যারেজ কাম রোড নির্মাণ
করে নদীর
উভয় তীরের
যোগাযোগ নিশ্চিত
করা হবে।
পাশাপাশি বর্ষাকালে
প্রবাহিত নদীর
বিপুল উদ্বৃত্ত
জলরাশি সংরক্ষণের
জন্য জলাধার
সৃষ্টি করা হবে এবং খাল খননের
মাধ্যমে নদীর
উভয় তীরের
চাষযোগ্য জমিতে
শুষ্ক মৌসুমে
সেচের ব্যবস্থা
গড়ে তোলা
হবে। এছাড়া
নদীর উভয় তীরের সড়কের
পাশে ব্যাপক
শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সুবিধাদি
গড়ে তোলা
হবে। ইন্টারনেটে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির বর্ণনা
জেনে আমার
মনে হয়েছে,
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন
হলে সত্যি
সত্যিই তিস্তা
প্রকল্প বাংলাদেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর
জনজীবনে একটা
যুগান্তকারী বিপ্লব
ঘটাতে সমর্থ
হবে। আমি প্রকল্প প্রস্তাবের অনুমোদন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি
সেজন্যই অত্যন্ত
আগ্রহ নিয়ে
পর্যবেক্ষণ করছিলাম।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিব
এবং পানি
উন্নয়ন বোর্ডের
চেয়ারম্যান ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আশাবাদ
ব্যক্ত করেছিলেন
যে ২০২০
সালের ডিসেম্বর
নাগাদ প্রকল্পটির অনুমোদন হয়ে যাবে।
কিন্তু দীর্ঘদিন
প্রকল্প প্রস্তাবের কোনো নড়াচড়া পরিলক্ষিত
হচ্ছে না। কারণ ভারত
নাকি এ প্রকল্পে চীনের
অংশগ্রহণকে তাদের
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ঘোষণা
করে বাংলাদেশকে প্রকল্প বাতিল করার
জন্য অনুরোধ
করে চলছিল।
ভারতের দাবি,
তাদের শিলিগুড়ি
করিডোরের ‘চিকেন
নেকের’ এত কাছাকাছি তিস্তা
প্রকল্পে কয়েকশ
বা হাজারের
বেশি চীনা
নাগরিকের অবস্থান
তারা মেনে
নেবে না। একটা নদী খনন প্রকল্পে
নিয়োজিত চীনা
প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানরা কেন ভারতের রাষ্ট্রীয়
নিরাপত্তার জন্য
হুমকি হবে? তারা কি তাহলে প্রকৌশলীর
ছদ্মবেশে চীনা
সৈন্য-সামন্ত-গোয়েন্দা? যে এলাকা দিয়ে
তিস্তা নদী ভারত থেকে
বাংলাদেশে প্রবেশ
করেছে সেখান
থেকে ‘শিলিগুড়ি
চিকেন নেক করিডোর’ অনেক
দূরে। আর বাংলাদেশ-ভারত
সীমান্ত থেকে
বেশ কয়েক
কিলোমিটার অভ্যন্তরে
প্রকল্প এলাকায়
অবস্থানরত চীনা
নাগরিকরা ভারতে
কীভাবে গোয়েন্দা
তত্পরতা চালাবে?
তিস্তা নদীর
দক্ষিণ-পূর্বদিকের ভাটিতে যতই প্রকল্পের
কাজ এগোবে
ততই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত
এলাকা থেকে
প্রকল্প এলাকার
দূরত্ব বাড়তে
থাকবে। (এমনও
শোনা গিয়েছিল
যে ভারত
সীমান্তের নিকটবর্তী
১৬ কিলোমিটার
এলাকায় বাংলাদেশ
নিজস্ব অর্থায়নে
নদী খননকার্য
সম্পন্ন করবে,
যাতে চীনের
লোকজনের উপস্থিতি
সম্পর্কে ভারতের
স্পর্শকাতরতা এবং আপত্তিকে এড়ানো
যায়। এটা যদি সত্য
হয়, তাহলে
তো স্বীকার
করতে হবে যে বাংলাদেশ
সরকার ভারতের
‘সেভেন সিস্টার্সের’ নিরাপত্তা স্পর্শকাতরতাকে শ্রদ্ধা
দেখিয়েছে)। চীনের সঙ্গে
ভারতের সীমান্ত
বিরোধ সত্ত্বেও
ভারত চীনের
সঙ্গে ২০২০
ও ২০২১
সালে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের
বেশি বৈদেশিক
বাণিজ্য চালিয়েছে।
অথচ বাংলাদেশ
নিজের অর্থনৈতিক
অবকাঠামো উন্নয়নের
জন্য চীন থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিতে গেলেই
ভারত বারবার
নানা অজুহাতে
বাধা দিয়ে
চলেছে।
তিস্তা নদী ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং খামখেয়ালি আচরণের একটি নদী, যার বন্যার কবলে পড়ে প্রায় প্রতি বছর বর্ষায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল একাধিকবার বিধ্বস্ত হয়ে চলেছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলকভাবে খরাগ্রস্ত এ এলাকার মানুষ তিস্তা নদীর পানিস্বল্পতার কারণে সেচ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত থাকে। তাই বলা হয়, এলাকার জনগণের জীবন ও জীবিকার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তিস্তা নদী। তিস্তা নদীর উজানে সিকিম বেশ কয়েকটি ব্যারেজ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করে একতরফা পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। এরপর পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় ভারত একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি সম্পূর্ণভাবে আটকে দেয়ার পর তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশ বছরের বেশির ভাগ সময় প্রায় পানিশূন্য থাকছে। বাংলাদেশ বন্ধুরাষ্ট্র হলেও একটি আন্তর্জাতিক নদীর উজানে এমন একতরফা বাঁধ নির্মাণের আগে ভারত একবারও বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং দীর্ঘ তিন দশকের কূটনৈতিক আলোচনার পথ ধরে যখন ২০১১ সালে দুই দেশ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অন্যায় আবদারের কাছে নতিস্বীকার করে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং চুক্তি স্বাক্ষর থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। দুটি সার্বভৌম দেশের সম্পর্ক একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিলতার কাছে জিম্মি হতে পারে না। অথচ ভারত এ অজুহাতেই ১১ বছর ধরে এই ইস্যুতে বাংলাদেশকে বঞ্চিত রেখেছে। এবারের ভারত সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষর হলেও দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় নাকি তিস্তা চুক্তির বিষয়টি উত্থাপিতই হয়নি, দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় তিস্তা চুক্তির কোনো আশ্বাস পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হয়নি! ওয়াকিবহাল মহলের দৃঢ় অভিমত হলো, পশ্চিমবঙ্গে যত দিন মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী পদে ক্ষমতাসীন থাকবেন তত দিন তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।
কিন্তু
সবার জানা
উচিত যে তিস্তা চুক্তি
আর প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প মোটেও
সাংঘর্ষিক নয়। তিস্তা চুক্তি
হোক বা না হোক, তিস্তা প্রকল্প
ওই অঞ্চলের
জনগণের জীবন
ও জীবিকায়
যুগান্তকারী পরিবর্তন
আনবে। চুক্তি
হলে শুষ্ক
মৌসুমে নদীর
পানিপ্রবাহ খানিকটা
হয়তো বাড়বে,
কিন্তু বর্ষায়
গজলডোবা ব্যারেজের
সব গেট খুলে দেয়ায়
এ অঞ্চলের
জনগণ যে একাধিকবার বন্যায়
ডুবছে তার তো কোনো
সমাধান হবে না! প্রস্তাবিত প্রকল্পের জলাধারগুলোর সংরক্ষিত
পানি পরিকল্পিত
সেচ ব্যবস্থায়
ব্যবহূত হলে এ সমস্যার
টেকসই সমাধান
মিলবে। এ প্রকল্পের বিভিন্ন
ডাইমেনশনের বর্ণনা
জানাজানি হওয়ার
পর এলাকার
জনগণের মধ্যে
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের
স্বপ্ন গেড়ে
বসেছে, খুশিতে
মাতোয়ারা তারা।
প্রকল্পটির আশু বাস্তবায়নের জন্য
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গত কয়েক বছরে
বেশ কয়েকটি
মানববন্ধন ও মিছিল হয়েছে।
সেজন্যই মাননীয়
প্রধানমন্ত্রীর কাছে
আকুল আবেদন,
তিস্তা প্রকল্প
অনুমোদনে আর বিলম্ব করবেন
না।
ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি; একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










