আমাদের দেশে শিপ ব্রেকিং (জাহাজ ভাঙা) শিল্প ১৯৬০-এর দশকে কার্যক্রম শুরু করে। দারিদ্র্যপীড়িত উন্নয়নশীল বাংলাদেশের সামষ্টিক ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিপ ব্রেকিং শিল্পটি বৃহৎ পরিসরে বিশ্বের বৃহত্তম অব্যাহতিপ্রাপ্ত জাহাজগুলোর ভাঙার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অর্থাৎ চট্টগ্রাম শহরের ঠিক উত্তরে অবস্থিত সীতাকুণ্ডে (ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায়)।
বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ১৯৬০-এর দশকে শিপ ব্রেকিং শিল্পের কার্যক্রম শুরু হয়, যখন একটি গ্রিক জাহাজ ‘এমডি আলপাইন’ একটি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের পর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বঙ্গোপসাগরের তীরে আটকা পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের পরে জাহাজটি ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় চিটাগং স্টিল হাউজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান জাহাজটি ভাঙার কাজ শুরু করে। তখন থেকে সীতাকুণ্ডে জাহাজ ভাঙা শিল্পের কার্যক্রম শুরু হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি জাহাজ ‘আল আব্বাস’ বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এটি উদ্ধার করে ফৌজদারহাট সমুদ্রতীরে আনা হয়। ১৯৭৪ সালে কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কস লিমিটেড এটিকে স্ক্র্যাপ হিসেবে কেনে এবং বাংলাদেশে বাণিজ্যিক শিপ ব্রেকিং চালু করে।
শিপ ব্রেকিং আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইস্পাতের মতো কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এ তত্পরতা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
১৯৬০-এর দশকে যাত্রা করলেও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে এ শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। ১৯৮০ সালের পর থেকে মূলত জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমটি শিল্পে পরিণত হয়। দেশের উদ্যোক্তারা এ শিল্পে বিনিয়োগ শুরু করেন। বাংলাদেশের জন্য এটি আজ একটি বড় ও লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে প্রায় ৬০-৭০ হাজার লোক সরাসরি কর্মরত। আরো ৩০ লাখ পরোক্ষভাবে এ ব্যবসায় জড়িত। জাহাজের আকারের ওপর ভিত্তি করে ৩০০ থেকে ১০০০ লোক অস্থায়ী ভিত্তিতে একটি জাহাজ ভেঙে ফেলার জন্য নিযুক্ত করা হয় এবং আরো অনেককে জাহাজ থেকে সব ধরনের উপকরণ পুনর্ব্যবহারের জন্য ক্রিয়াকলাপে নিযুক্ত হয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কিছু সামগ্রী রফতানি করা হয় এবং বাকিগুলো বিক্রি হয় বা বাংলাদেশে পুনরায় ব্যবহার করা হয়।
অনেক উপকরণ স্থানীয় অর্থনীতির জন্য উচ্চ মূল্যবান। বিশেষ করে নির্মাণের জন্য লোহার রড, নতুন জাহাজের প্লেট বা অন্যান্য অনেক কাজের জন্য ইস্পাতের পুনর্ব্যবহার একটি লাভজনক ব্যবসা। চট্টগ্রামের উত্তর উপকূলে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে প্রায় ১৫৮টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে, এর মধ্যে ৩০-৪০টি সারা বছর সক্রিয় থাকে।
জাহাজ ভাঙা দেশের স্টিলের উল্লেখযোগ্য কাঁচামালের উৎস হিসেবে কাজ করে। কেননা বর্তমানে বাংলাদেশের স্টিলের প্রচুর চাহিদা আছে, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো লোহার আকরিক উৎস বা খনি নেই। এ জাহাজ ভাঙা কাঁচামালের অনিবার্য ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে ইস্পাত সামগ্রীর কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়।
আমাদের দেশে বর্তমানে ৩৫০টির বেশি ছোট-বড় স্টিল রি-রোলিং মিল রয়েছে এবং তাদের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে জাহাজের স্ক্র্যাপ ব্যবহার করা হয়। এ শিল্প থেকে প্রতি বছর ৩০-৩৫ লাখ টন স্ক্র্যাপ পাওয়া যায়, যা বর্তমানে স্থানীয় ইস্পাত শিল্পের ৭০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল সরবরাহ করছে। এছাড়া স্থানীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পও মূলত এর ওপর নির্ভর করে, কারণ এর কাঁচামালের বেশির ভাগই স্ক্র্যাপ স্টিল থেকে ব্যবহূত হচ্ছে।
জাহাজ ভাঙা শিল্পের ওপর নির্ভর করে এরই মধ্যে ভারী ও হালকা প্রকৌশলসহ বেশ কয়েকটি স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠেছে, যেমন জাহাজ নির্মাণ শিল্প।
এ শিল্প প্রতি বছর বিভিন্ন কর প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রদান করে। প্রতি বছর সরকার আমদানি শুল্ক এবং অন্যান্য করের মাধ্যমে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে প্রতি বছর ১২০০-১৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করে।
আমাদের দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প প্রায় ৪৭.২ শতাংশ বিশ্বের অব্যাহতিপ্রাপ্ত জাহাজ ভেঙে বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থান দখল করেছে। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারত ২৫.৬ শতাংশ, পাকিস্তান ২১.৫, তুরস্ক ২.৩ ও চীন ২ শতাংশ জাহাজ ভেঙেছে। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারত শীর্ষস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা পরিচালিত জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আমরা এরই মধ্যে আমাদের উপকূলীয় পরিবেশ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের শিপইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন শিপইয়ার্ডে পরিণত করার কাজ করছি।
ইয়ার্ডগুলোর চারপাশে পর্যাপ্ত গাছ লাগানো, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, থাকা-খাওয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের নীতিমালা মানা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুটি শিপইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। আরো ১৬-১৮টি শিপইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন আছে। আমরা আমাদের শিপইয়ার্ডগুলোতে ম্যানুয়াল ভাঙার পদ্ধতি ধীরে ধীরে বাদ দিচ্ছি। এখন অনেক অত্যাধুনিক মেশিনের মাধ্যমে ভাঙার কাজটি করা হচ্ছে। স্ক্র্যাপ ওঠানামার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ম্যাগনেট ক্রেন।
শিল্পটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, পক্ষান্তরে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আমাদের জাহাজ আনার ক্ষেত্রে আগাম কর প্রদান করতে হয়। সরকারি নীতিমালায় এ আগাম কর ফেরতযোগ্য হলেও দুই বছর ধরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার মতো আগাম কর সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আটকে আছে। এ কারণে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিপ ব্রেকিং শিল্পটি এবং ফলে গত বছর জাহাজ আমদানির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। দেশের ধারাবাহিক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
মোহাম্মদ সরওয়ার আলম: পরিচালক, মোস্তফা হাকিম গ্রুপ










