আক্ষরিক অর্থে ‘মাৎস্যন্যায়’ শব্দের অর্থ মাছের ন্যায়। অর্থাৎ বড় মাছেরা ছোট ছোট মাছকে গিলে খায়। মৎস্যজগতে সেটাই নিয়ম। ফলে তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মানুষ নিজেদের সভ্য বলে দাবি করে। তাই কখনো কোনো স্থানে মাছের রীতি মানুষ চর্চা করলে তাকে ব্যঙ্গার্থে বলা হয় মাৎস্যন্যায়।

বাংলার প্রথম স্বাধীন নরপতি শশাঙ্কের মৃত্যুর কিছুকাল পর থেকে পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপাল সিংহাসনে আরোহণ করা (৭৫০ খ্রি.) পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছর সময়কে মাৎস্যন্যায় বলা হতো। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা, দুর্বলের ওপর সবলদের অত্যাচার এবং সামগ্রিক অরাজকতা বোঝাতে সেই সময়কে ইতিহাসে ‘মাৎস্যন্যায় যুগ’ বলে উল্লেখ করা হয়।

এ নিবন্ধে আক্ষরিক অর্থেই মাৎস্যন্যায় কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ গোটা দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে এমন এক ধারা শুরু হয়েছে তাতে ক্রমেই ছোটদের পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ছে। বড় ও প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো ছোট সম্ভাবনাময় বা উদীয়মান প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে দলে ভেড়াতে চেষ্টা করছে।

সেই প্রস্তাবে ভালোয় ভালোয় রাজি না হলে তার পুরো ব্যবসা কিনে নেয়ার ফন্দি আঁটছে। সেটাও সম্ভব না হলে তাকে মার্কেট থেকে উচ্ছেদ করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করছে। ফলে প্রত্যেক ইন্ডাস্ট্রিতে এক একটা জায়ান্ট ফার্মের উদ্ভব হচ্ছে। অন্যরা ক্রমেই নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত টেলিকম খাতের কথাই ধরা যাক। এক যুগ আগেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী কোম্পানি পরস্পর প্রতিযোগিতা করছিল। এমনকি একপর্যায়ে তারা কাস্টমারদের রাতভর ফ্রি কথা বলার অফার দিয়েছিল। এখন সেই ধারা আরো তীব্র হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমরা দেখছি নিক্তির কাঁটা ক্রমেই একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেলফোন অপারেটর টেলিনর ও গ্রামীণ টেলিকমের যৌথ প্রয়াস গ্রামীণফোন একাই মার্কেটের প্রায় অর্ধেক (৪৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ) দখলে নিয়েছে! সিটিসেল, ওয়ারিদ এমনকি এয়ারটেল মার্কেট থেকে হারিয়ে গেছে। প্রতিযোগীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

এমন চর্চা যে শুধু আমাদের দেশে হচ্ছে ব্যাপারটা তেমন নয়। টেক জায়ান্ট ‘গুগল’ একের পর এক (সমধর্মী বা কাছাকাছি সেবা অফারকৃত) যাকেই সম্ভাবনাময় মনে করেছে, তাকেই কিনে নিয়েছে। এভাবে তারা ইউটিউব, অ্যান্ড্রয়েড, এইচটিসি স্মার্টফোনসহ অসংখ্য ভেঞ্চারকে টেকওভার করেছে।

মাইক্রোসফট কিনেছে লিংকডইনকে। অ্যাপল কিনেছে মিউজিক, মুভি ও বিভিন্ন শোর স্ট্রিমিংয়ের জন্য পপুলার ব্র্যান্ড শাজামকে। অ্যামাজন অর্গানিক খাদ্যের চেইন ‘হোল ফুডস’কে একই কায়দায় কব্জা করেছে। ২০১৪ সালে ফেসবুকের ‘হোয়াটসঅ্যাপ’ কিনে নেয়ার গল্প আমরা কম-বেশি সবাই জানি।

আমাদের দেশে বিশেষত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যবহার্য ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডসের (এফএমসিজি) ক্ষেত্রে ইউনিলিভার একচেটিয়া অবস্থানে রয়েছে। তারা লিভার ব্রাদার্স থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকতর শক্তিশালী হয়েছে। দেশী-বিদেশী কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের অফারকৃত দু-চারটা পণ্য দিয়ে হয়তো সীমিত পরিসরে প্রতিযোগিতায় আছে। কিন্তু মোটের ওপর তাদের কাছাকাছিও কোনো কোম্পানি নেই।

একসময় অ্যারোমেটিক, যমুনা বা কেয়া কসমেটিকস যে সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করেছিল; কখন যে তারা পথ হারিয়েছে, ক্রেতারা তা ভুলতে বসেছে। স্কয়ার নিজেদের প্রডাক্ট লাইন নানাদিকে বিস্তৃত করে সরাসরি প্রতিযোগিতার পথ পরিহার করেছে। প্রাণের টার্গেট গ্রুপও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলাদা। ফলে তারা সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেই বললেই চলে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বড় দুই প্রতিষ্ঠান গ্ল্যাক্সো ওয়েলকাম এবং স্মিথক্লাইন ২০০০ সালে এক হয়ে গড়ে তুলে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে)। এখন তারা নিজ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবল আধিপত্য বজায় রেখে ব্যবসা করছে। ঠিক তেমনিভাবে ওয়ার্নার ল্যাম্বার্ট কেনার মাধ্যমে ফাইজার হয়েছে অধিকতর শক্তিশালী। অন্যান্য শিল্পেও এ ধারা ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো, মাঝেমধ্যে মার্কেট লিডার ও চ্যালেঞ্জার একীভূত হয়ে যাচ্ছে! অর্থাৎ রেড ওসেনকে তারা একটা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্লু ওশেনে রূপান্তর করছে। নিজেরা ফাইট করে রক্তারক্তি হওয়ার চেয়ে দুই শক্তিধর এক হয়ে কাস্টমারদের গলা কাটার আয়োজন করছে! রয়াল ডাচ পেট্রোলিয়াম ও শেল কোম্পানি (২০০৪ সালে) একত্র হয়ে যাওয়া তার সর্বোত্তম উদাহরণ। তার কিছুদিন আগেই একীভূত হয়েছিল এক্সন ও মবিল।

এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বোঝার সুবিধার্থে শুধু কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা হলো। তাছাড়া প্রায় সব শিল্পেই তেমনটা ঘটছে। যেমন মুভি জগতের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়াল্ট ডিজনি ও টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফক্স একাকার হয়ে গেছে ২০১৭ সালে। হেইঞ্জ ও ক্রাফট পরস্পরের প্রতিযোগী থেকে ২০১৫ সালে তারা গঠন করেছে ক্রাফট হেইঞ্জ। তার কিছুদিন আগে ভেরাইজন ও ভোডাফোনের একত্রিত হওয়া ছিল আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

লাফার্জ ও হোলসিম একত্রিত হওয়া কিংবা ডাও কেমিক্যাল এবং ডুপন্ট যৌথভাবে কাজ করায় তারা অধিকতর শক্তিশালী হয়েছে। তবে এমন উদ্যোগ সবসময় সফলতা বয়ে আনবে তেমনটা নাও হতে পারে। খ্যাতিমান ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-বে, স্কাইপি কেনার পরে যেমন ব্যবসা আশা করেছিল, বাস্তবে তা হয়নি। বরং তারা নিজেরা দুর্বল হয়ে গেছে। কিংবা টেলিনরের মতো খ্যাতিমান কোম্পানি আমাদের দেশে ‘এখানেই ডট কম’ কেনার পরও তা চালাতে ব্যর্থ হয়। ২০১৭ সালে আকস্মিক এক ঘোষণা দিয়ে তারা সেটার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

আমাদের দেশে ২০১৬ সালে রবি-এয়ারটেল একীভূত হয়েছে। অন্যদিকে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল আকিজ গ্রুপের টোব্যাকো বিজনেস টেকওভার করেছে। বছর দুয়েক আগে রহিমআফরোজ গ্রুপের (দেশে সুপারশপের ফাস্ট মুভার) ‘আগোরা’র মালিকানা বদলের কথা উঠেছিল। কেনার কথা ছিল তারই প্রতিদ্বন্দ্বী ‘মীনা বাজার’ (জেমকন গ্রুপ)-এর। শেষ পর্যন্ত ব্যাটে-বলে না মেলায় সম্প্রতি এটা বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে শ্রীলংকাভিত্তিক ‘সফটলজিক রিটেইল’-এর কাছে। প্রাণ এবং আরএফএল আলাদাভাবে পথচলা শুরু করলেও কৌশলগত কারণে তারা এক হয়ে অধিকতর শক্তিশালী হয়েছে।

এখন কথা হলো, এ প্রবণতা ভালো নাকি মন্দ? ব্যবসায়ে পরিবর্তন অতি স্বাভাবিক ঘটনা। এখানে উত্থান-পতন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একসময়ের নামি কোম্পানিগুলো কখন হারিয়ে গেছে আমরা খেয়ালই করিনি। আবার তুলনামূলকভাবে নবীন অনেক (বিকাশ, স্বপ্ন, পাঠাও প্রভৃতি) ব্র্যান্ডের অগ্রগতি সহজেই নজর কাড়ে।

এমন ভাঙা-গড়ার খেলা চলবে সেটাই স্বাভাবিক। বিশেষত নিত্যনতুন প্রযুক্তি অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির অস্তিত্বে আঘাত হানছে। রিডার্স ডাইজেস্টের মতো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শতবর্ষী ম্যাগাজিন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে! জেফ বেজোসের মতো টেক-উদ্যোক্তা যখন ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকা কেনে তখন সেখানে বিশেষ কোনো ইঙ্গিত থাকে কি?

এখন প্রশ্ন হলো অ্যামাজন, ওয়ালমার্ট, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, ফেসবুক, টেসলা এমনকি আমাদের দেশে গ্রামীণফোন, বিকাশ, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, ইউনিলিভারের নিজ নিজ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবল আধিপত্য কি কোনো ঝুঁকির উদ্ভব করছে? প্রত্যেক ব্যবসায় খাতে একেকটা জায়ান্ট দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রধান সমস্যা হলো তারা ছোটদের গিলে খাওয়া শুরু করবে। স্থূল মানুষ চাইলেও খাবারের পরিমাণ হ্রাস করতে পারে না। কারণ তাদের শরীরের চাহিদা বাড়ে। টিকে থাকার স্বার্থেই বারবার খেতে হয়, বেশি পরিমাণে খেতে হয়।

ঠিক তেমনিভাবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসায় বিস্তারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ খরচের খাত উন্মুক্ত করে। ব্যাপকসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেয়। তারা আগ্রাসী কায়দায় ব্যবসায় বিস্তারে মনোযোগী হয়। সেখানে মুনাফা না হলেও তারা পয়সা ঢালতে থাকে। এতে এমন এক ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, স্থানীয় ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে দাঁড়াতেই পারে না।

জায়ান্টদের প্রবল আধিপত্য পুরো সিস্টেমকে প্রভাবিত করার সামর্থ্য অর্জন করে। এমনকি আগামীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেশি শক্তিশালী নাকি গুগলের সিইও—সেই প্রশ্ন উঠলে কেউ তা অবজ্ঞা করতে পারবে না! গত নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ দখলে রাখার ঘোষণা দেন। তখন সমগ্র মার্কিন প্রশাসন তাকে যতটা ঘায়েল করতে না পেরেছে, এক টুইটার অ্যাকাউন্ট বন্ধের মাধ্যমে তাকে বেশি বেকায়দায় ফেলা গেছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন! তার মানে তাদের হাতে সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চলে যাচ্ছে!

শুধু কল্পনা করুন, আগামী ২৪ ঘণ্টার জন্য যদি গুগলের সব ধরনের সেবা বন্ধ থাকে। কিংবা মাইক্রোসফটের সব সফটওয়্যার অকার্যকর হয়ে পড়ে। আপনি-আমি কি সুরক্ষিত থাকব? আর যদি অ্যান্ড্রয়েড তার সার্ভিস না দেয়? ফেসবুকের মতো শৌখিন ও বিনোদনমূলক সেবা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলেই অনেকের দম বন্ধ হয়ে আসে। সেখানে উল্লিখিত সেবাগুলো বন্ধ হওয়ার মানে কি আমরা সত্যিই বুঝতে পারছি?

গোটা দুনিয়ার অফিস-আদালত স্থবির হয়ে পড়বে। আকাশে কোনো বিমান উড়বে না। কোনো হাসপাতাল সার্জারি করতে পারবে না। সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকি এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষক পর্যন্ত বিপদে পড়ে যাবেন। কারণ সে তার পণ্যের ক্রেতার সঙ্গে স্মার্টফোনে যোগাযোগ করতে পারবেন না!

তাই গোটা দুনিয়াকে স্থবির করে দেয়ার মতো ক্ষমতা এরই মধ্যে বিশেষ কিছু কোম্পানি অর্জন করে ফেলেছে। হয়তো সে কারণেই সম্প্রতি বারাক ওবামা বলেছেন, মানবকল্যাণের স্বার্থেই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর অসীম ক্ষমতার রাশ টেনে ধরা এবং সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। মানুষ তাদের ওপর নির্ভর করছে, তাদের বিশ্বাস করছে। তাই তাদের দায়বদ্ধতাকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।

মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ না থাকলে যেকোনো সময় বড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে। যাহোক, ছোটবেলা শোনা এক গল্প দিয়ে শেষ করি।

এক গ্রামের দুই পাড়ার মধ্যে ফুটবল খেলা হচ্ছে। গ্রামের মোড়লের বাড়ি যে পাড়ায় সেই দলের ছেলেরা ভালোই খেলছে। কিন্তু গোল করতে পারছে না। কারণ প্রতিপক্ষ দলের গোলরক্ষক খুব ভালো। একপর্যায়ে মোড়ল ক্ষিপ্ত হয়ে ঘোষণা দিলেন, ওই গোলরক্ষককে গোলপোস্টের সঙ্গে বেঁধে রাখতে! তিনি এলাকার মোড়ল। ফলে তার কথাই শেষ কথা। আবার খেলা শুরু হলো... আমরা বোধ হয় এরই মধ্যে এমন খেলার অংশ হয়ে গেছি!

 

ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মার্কেটিংয়ের সহজপাঠ’ বইয়ের লেখক