শিশুর সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া হিসেবে পারিবারিক গণ্ডির বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর্ব শুরু হলেও এক পর্যায়ে শিক্ষা মানুষের ভেতর উচ্চশিক্ষিত বোধের সৃষ্টি করে। শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ধাপ পেরোনোর পরই সাধারণত শিক্ষার এ ফলাফল প্রত্যাশা করা হয়। যেমনটি প্রমথ চৌধুরীর ভাষ্যমতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষা গলাধঃকরণ নয় বরং শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি করে দেয়া। এর মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থী শিক্ষার প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করতে পারে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আদৌ কি এটা হয়? প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় আগে যেখানে ম্যাট্রিক বা অধুনা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াকেই সামাজিকভাবে সর্বস্তরে সাদরে গ্রহণ করা হতো, সেক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পাস করাকেই সামাজিক মর্যাদার সর্বজনীন নির্ণায়ক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫২টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মোট ১০৮টি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে আরো চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বস্তুত সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি জেলায় কমপক্ষে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তের কারণেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।
এভাবে বাড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক সনদধারী উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা। কিন্তু শিক্ষার যে উদ্দেশ্য সেটির সঙ্গে কর্মসংস্থানের যে চাহিদার কথা বিবেচনা করা হয়, সেটি কি মোটেও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আছে? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব মতে, দেশে বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী এ মুহূর্তে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা তিন কোটি। অবশ্য সরকারি পরিসংখ্যানগুলো সব সময় ইতিবাচক হয়—এ রকম একটা দৃশ্য আমরা সব সময়ই দেখে থাকি।
বেকারদের
মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা ক্রমাগত
বাড়ছে। বিআইডিএসের
এক জরিপে
দেখা গেছে, দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে
বেকারত্বের হার ৩৪ শতাংশ
এবং স্নাতক
পর্যায়ে এ হার ৩৭ শতাংশের কাছাকাছি।
ধারণা করা হয়ে থাকে, দেশে প্রতি
বছর ২০ লাখের বেশি জনশক্তি শ্রমবাজারের অন্তর্ভুক্ত হয়। যেখানে
কর্মসংস্থানের মাত্র
৫ শতাংশ
সরকারি খাতে আর ৯৫ শতাংশই বেসরকারি
উৎসে।
এক্ষেত্রে
সরকারি-বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী পাস করে শিক্ষাজীবন
সমাপ্ত করেন।
কিন্তু দেশে এত শিক্ষার্থীর চাকরির সুযোগ নেই, এটাই বাস্তবতা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক
এক জরিপ মতে, দেশে বর্তমানে ৪৭ শতাংশ শিক্ষিতই
বেকার।
এভাবে শিক্ষিতদের বেকারত্বের বিষয়টি একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ স্বল্প শিক্ষিতদের যতটা সহজে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়, উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে তা হয় না। এছাড়া যেকোনো কাজ না করার যে প্রবণতা শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কাজ করে সেটিও বেকারত্ব তৈরি হওয়ার কারণ। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ‘এমএ পাস চাওয়ালা’ নামক ভাইরাল হওয়া চায়ের দোকানের নামকরণও আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটায়। এর আগে এমএ পাস হকারের বিষয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
শুধু সেটিই নয় একজন চলচ্চিত্র
পরিচালক হোটেলে
ওয়েটার হিসেবে
কাজ করছেন,
এ বিষয়টি
নিয়ে গণমাধ্যমে
সংবাদ প্রচার
হয়। পরবর্তী
সময়ে বিষয়টি
তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের
নজরে এলে সে পরিচালককে
অর্থসহায়তা প্রদানের
সময় বিদেশে
পড়াশোনাকালীন নিজের
হোটেলে কাজ করার অভিজ্ঞতার
বিষয়টি জানান।
অর্থাৎ কাজের
প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষিত
তরুণদের যেকোনো
বৈধ কাজ করতে নিরুৎসাহিত
করে তোলে।
চলতি বছর চিত্রনায়ক হিসেবে
ডেব্যু হওয়া এক তরুণ পূর্বে ফাইভ স্টার হোটেলের
রিসিপশনিস্ট ছিলেন।
এটা নিয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো সংবাদের
শিরোনাম করেছিল
‘হোটেল রিসিপশনিস্ট থেকে চলচ্চিত্র নায়ক’। সংবাদটির
মাধ্যমে কার্যত
তার উন্নতির
জায়গাটি তুলে ধরা হলেও প্রকারান্তরে হোটেল
রিসিপশনিস্ট পদটিকে
কিন্তু ছোট করা হয়েছে।
কারণ একটি পাঁচ তারকা
হোটেলের রিসিপশনিস্ট হতে হলে উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তাকে যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হয়। মূলত এভাবে পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই বেকারত্বের জন্ম দেয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে দৃশ্যত
উচ্চশিক্ষার সঙ্গে
সামঞ্জস্যহীন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শিক্ষিত তরুণরা
ধাবিত হতে চাইবেন না এটিও স্বাভাবিক।
তাহলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কী পড়ানো
হয়ে থাকে এবং এটির কার্যকারিতা কি বেকারত্ব নির্মূলে
ভূমিকা রাখছে
না—এমন প্রশ্ন বেশ কয়েক দশক ধরেই উচ্চারিত
হচ্ছে। কিন্তু
এর পরও থেমে নেই নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের
কাজ, সরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে
পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রীতিমতো ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেতে হয়। আবার বিভাগভিত্তিক পড়াশোনার ক্ষেত্রে দেখা যায় শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারি চাকরির জন্যই সবার আগ্রহ ও ব্যতিব্যস্ততা। এজন্য কারো কারো তিন-চার বছর পর্যন্ত সময় চলে যায়, কিন্তু প্রত্যাশিত সরকারি চাকরি আর মেলে না। বিশেষ করে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো সেশনজট রয়েছে বা যারা নির্ধারিত ৩০ বছর বয়সেও সরকারি চাকরি পাননি তারা দাবি করছেন চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করতে। অর্থাৎ সরকারি চাকরিই এখন অধিকাংশ তরুণের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এজন্য এতগুলো বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করতেও তারা পিছ পা হচ্ছেন না। অবশ্য এর বিকল্প হিসেবে বেসরকারি চাকরির কথা খুব অল্পসংখ্যক তরুণই ভাবেন। দেখা যায়, কেউ দু-তিনটি বেসরকারি চাকরি করে তারপর সরকারি চাকরিতে যোগদান করছেন। আর বেসরকারি খাতে ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, ভালো মানের এনজিও এসব প্রতিষ্ঠানের চাকরিকে সম্মানজনক চাকরি বলে গণ্য করলেও জব সিকিউরিটির কথা ভেবে তরুণরা সরকারি চাকরিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। এজন্য সরকারি চাকরিতে দিনে দিনে প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে।
এভাবে একটা দেশের পুরো তরুণ সমাজ সরকারি চাকরির পেছনে ঝুঁকলে কীভাবে উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল উঠে আসবে? কিন্তু এ সময়ের তরুণদের ভাষ্য, এর বিকল্প তারা দেখতে পারছেন না। কারণ উচ্চশিক্ষা শেষে স্বল্প বেতনের বেসরকারি চাকরি করলে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে কীভাবে মুখ দেখাবেন—এটিই তরুণদের দুশ্চিন্তার বিষয়।
এখন মোদ্দাকথা হচ্ছে,
তরুণদের শিক্ষাজীবন
যথার্থ করার জন্য রাষ্ট্রের
উদ্যোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য
শিক্ষা কারিকুলামে
কর্মসংস্থানে ভূমিকা
রাখবে এমন সিলেবাস প্রণয়ন
জরুরি। এক্ষেত্রে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজারমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার
ওপর জোর দিলেও সরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো মৌলিক বিষয়গুলো
পড়ানো হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়কে আদি এবং মূল বিষয় হিসেবে
সাব্যস্ত করা হয় যেমন ইতিহাস, দর্শন,
ভাষাবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান
এসব বিষয় এখনো সরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে
রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে
এসব বিষয়কে
বাদ দেয়া যায় না, কিন্তু বিষয়গুলোকে
যুগোপযোগী করে তুলতে যে ভূমিকা থাকা দরকার সেটিও
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া
যায় না। দেখা যায় যে হাজার
বছরের পুরনো
দর্শন এখনো পড়ানো হয় কিন্তু সমসাময়িক
সময়ের যে চিন্তন, বর্তমান
সময়কে ধারণ করে এ রকম চিন্তার
বহিঃপ্রকাশ সিলেবাসে
নেই। মানে সব যেন বিমূর্ত এক সময়কে ধারণ করে মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে পরীক্ষার খাতায়
উগরে দেয়া।
এর মধ্যে
যেমন নেই সৃজনশীলতার বালাই,
তেমনি পাওয়া
যায় না সময়োপযোগিতার প্রলেপ।
অথচ যুগের
চাহিদার কথা চিন্তা করে এসব বিষয়কে
যেভাবে ঢেলে সাজানো দরকার
ছিল সেটি কিন্তু হচ্ছে
না। প্রযুক্তিকে এবং ব্যবহারিক শিক্ষার
ক্ষেত্রে প্রাধান্য
দিয়ে সিলেবাস
সংস্কারের বেলায়
অনেক দিন পর সিদ্ধান্ত
হয়, কিন্তু
শিক্ষার্থীর সংখ্যা
বেশি হওয়ায়
সেটিও আর শেষ পর্যন্ত
কার্যকর হয় না। মূলত আমাদের দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাশ্চাত্যের সেমিস্টার সিস্টেম
অনুকরণ করা হয়েছে, কিন্তু
পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও মানোন্নয়ন ছাড়াই
এ সিস্টেমে
পাঠদান করা হচ্ছে। যা দৃশ্যত পূর্বের
তিন বছর মেয়াদি স্নাতক
(সম্মান) কোর্সকে
চার বছর মেয়াদি স্নাতক
কোর্স করার পরও কোনো গুণগত পরিবর্তন
না হওয়ারই
সমার্থক বলে মনে হয়।
মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মৌলিক বিষয়গুলো থাকবে এবং এসব ডিসিপ্লিনে শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনেও যোগ্যতার পরিচয় দেবে—এটাই আমাদের উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কারিকুলামে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণের বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে যাওয়া উচিত। দেশের সব জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি দেশ উচ্চশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত জনশক্তির সমন্বয়েই পরিচালিত হবে। প্রায়োগিক জীবনে কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই অবদানের নিজস্ব মূল্য রয়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করে কর্মহীন বসে থাকা প্রজন্ম যেন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত না হয় আমরা সেটিই চাই। শিক্ষিত তরুণরা সময়মতো কর্মজীবনে প্রবেশ করুক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হোক। এজন্য আত্মনির্ভরশীল বা উদ্যোক্তা হওয়ার যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু আগেই জানিয়েছেন সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কর্মসৃজন পরিবেশ পাওয়া যাবে সেটি নিশ্চিত করা দরকার। মোদ্দাকথা দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে এমন অনুযোগ আমরা প্রত্যাশা করি না। সমাজে উচ্চশিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত হোক সেটিই সবার কাম্য।
তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক










