শিক্ষার আলো সমাজ ও দেশ থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূরে আলো ছড়াবে অর্থাৎ মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে, সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে। এখানে সমাজের অন্যান্য বিভাগের মতো মানুষকে জিম্মি করবে না, বরং উন্মুক্ত পথ দেখাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্যান্য বিভাগের দুর্নীতির সঙ্গে শিক্ষা বিভাগে সমানতালে পাল্লা দিয়ে চলছে যেন সব ঠিক আছে। অন্যায়, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রকৃত প্রাপকের ফাইল আটকে বিপদে ফেলে অর্থ আদায় যেন পুলিশকেও হার মানিয়েছে। শিক্ষকতা সে যে পর্যায়েরই হোক না কেন, তিনি সমাজের অভিভাবক, তিনি অনন্য ব্যক্তিত্ব, তাকে হতে হচ্ছে দুর্নীতির প্রধান শিকার, তিনি নিজেই এর হাতিয়ার। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কীভাবে শুরু করতে হবে কেউ যেন এর দিশা করতে পারছে না। সবাই যেন অসহায়। শিক্ষা ভবনের বড় বড় কর্মকর্তারা সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে, শিক্ষার আলো সারা জীবন ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মাঝে বণ্টন করে একটি সময়ে মাউশিতে শিক্ষা প্রশাসকের ভূমিকায় এসে বসেন। সাধারণ শিক্ষকের তাদের কাছে অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকে, কিন্তু দেখা যায় তারা পুরো অসহায়। কিন্তু তারা যতটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন প্রকৃতপক্ষে ততটা অসহায় নয়। এটা ঠিক তারা মাউশিকে স্বর্গে পরিণত করতে পারবেন না কিন্তু অনেক কিছুই করতে পারেন প্রচলিত নিয়মের মধ্যে থেকেও। কিন্তু আমাদের শিক্ষক সমাজ শিক্ষক থেকে প্রশাসক যারা হচ্ছেন তাদের সবার কাছ থেকে সে ধরনের আচরণ পান না। আবার যারা সৎ ও নিবেদিত কর্মকর্তা তারা অনেক সময় কোণঠাসা হয়ে পড়নে, এটিও ঠিক। দুর্নীতির কারণে উচ্চমান সহকারী কিংবা অন্য কোনো স্টাফকে কোথাও বদলি করা হলে তারা কয়েকদিন আবার বহালতবিয়তে পূর্ববর্তী জায়গায় চলে আসেন। এতে কোনো ধরনের সমাধান হয় না। দুর্নীতি কেন হয়, কীভাবে হয় তা শিক্ষা প্রশাসকগণ সবই জানেন। তারা জানেন, মন্ত্রণালয় থেকে অনেক বিষয় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে রাজনৈতিকভাবে অনেক বিষয় অবৈধ হলেও তাদের স্বীকার করে নিতে হয়। শিক্ষক সমাজ সেটিও জানে, তার পরও মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেয়ার মতো, মাউশির অভ্যন্তরে অনেক রিফর্ম ও পরিবর্তন মাউশির দুর্নীতিকে অনেকটাই কমাতে পারে, শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা হয়তো এসব শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষা প্রশাসকের দ্বারা সম্ভব নয়। তার পরও তাদের শুরু করতে হবে যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষকরা সঠিক সেবাটি পান, তাদের অর্থের বিনিময়ে যাতে কোনো কাজ করাতে না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, তারা শিক্ষক। তাদেরকেই যদি ঘুস দিতে হয় তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

আমরা প্রত্যক্ষ করি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান একটি প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে আসেন। তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তারা অনেক কিছু আশা করেন, বরণের দিন কত কত মধুর মধুর ও কত সুন্দর কথা আলোচনা করা হয়। অথচ জেনে অবাক হলাম, ৩-১৫ লাখ টাকা ঘুস দিয়ে এসব বদলির ব্যবস্থা করা হয়, তাদের পুরো বিষয়টিই অন্ধকারাচ্ছন্ন সেটি মানসচক্ষে দেখা যায় না বলে অনেক কথা বলা হয়। এনটিআরসি কর্তৃক সুপারিশ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদেরও নাকি ঘুস দিয়ে কাজে যোগ দিতে হয়। আমরা পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, মাউশিতে কর্মরত দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের আয়ের সঙ্গে তাদের বিত্ত-বৈভব পুরোপুরি সঙ্গতিহীন। অনেকেই ঢাকায় কয়েকটি বাড়ির মালিক, অফিসে আসেন নিজ গাড়িতে, মনে হচ্ছে যেমন আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা, এসব দেশে যে যে কাজই করুক না কেন, সবারই গাড়ি আছে। আমরাও কি তাই হয়ে গেলাম? শিক্ষা বিভাগে যেখানে প্রশাসন থেকে কোনো কর্মকর্তা নেই, শিক্ষকগণই সবকিছু ম্যানেজ করেন সেখানকার কর্মচারীরা যদি এতটু দুর্নীতিপরায়ণ হয়, তাহলে কী হবে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরের?

মাউশির তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা বেতন পান ৩০-৩৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে রাজধানী শহর ঢাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়ার কথা কিন্তু তারা নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি করে অফিসে আসেন ও বাসায় যান। ধরা পড়ার ভয়ে গাড়ি অফিসের কিছুটা দূরে রেখে হেঁটে অফিসে আসেন। শুধু তাই নয়, তাদের অনেকেরই রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। ঢাকার বাইরেও নাকি রয়েছে ফ্ল্যাট, ভূ-সম্পত্তিসহ অনেক কিছু। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, মাউশির ১০৫ তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর মধ্যে কমপক্ষে ১৮ জনই নাকি কোটিপতি। এ কোটিপতি হতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। কারণ তারা নাকি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে মাউশিতে আছেন। অনিয়ম-দুর্নীতি, শিক্ষকদের বিপদে ফেলে, ভয় দেখিয়ে, হাইকোর্ট দেখিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন অনেকেই। তাদের বাণিজ্য হচ্ছে বদলি, পদায়ন, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের নাম সংশোধন, পদবি সংশোধন, বিভিন্ন অভিযোগ নিষ্পত্তি, বকেয়া বেতন পরিশোধ ইত্যাদি কাজ করিয়ে দিয়ে আদায় করেন মোটা অংকের ঘুস। এজন্য অফিশিয়াল কাগজপত্রে এত ভুল থাকে, বোঝা যাচ্ছে সবই ইচ্ছাকৃত ভুল।

মাউশিতে নানা পর্যায়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ এমনকি মামলা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। যে কর্মচারীরা এমন দুর্নীতি করেন, ঘুষ নেন তারা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখেন, যাতে দায় কেবল কর্মচারীদের ওপর নয়, কর্মকর্তাদের ওপরও পড়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তির খুব একটা নজির নেই। শাস্তির মধ্যে হচ্ছে বদলি, যা কোনো শাস্তিই নয়। সেবা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে ২০১৫ সালে এমপিও ব্যবস্থা মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর হাতে ছেড়ে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ছয় বছর পর দেখা গেছে দুর্নীতি কমেনি, বরং জটিলতা বেড়েছে। নানা সময়ে ১৮৪টি অভিযোগ তদন্তে মাউশিকে দায়িত্ব দিয়েছিল দুদক। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন পাঠাতে মাউশিকে ৪০টি চিঠি পাঠিয়েও জবাব না পাওয়ায় মহাপরিচালককে তলব করেছিল দুদক। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সারা দেশের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং সরকারি স্কুল-কলেজের কর্মচারীদের বদলি হয় অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে। এ কারণে এ শাখার পিএদের ক্ষমতা অনেক কর্মকর্তার চেয়েও বেশি। এ শাখার সহকারী পরিচালকের পিএ হিসেবে কর্মরত আছেন একজন ক্লার্ক। স্কুল-কলেজের কর্মচারী বদলি-পদায়ন সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা তিনি। তার আয়বহির্ভূত অনেক সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে।

শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ হলে তার প্রভাব যে কত গভীর সেটি কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হচ্ছে মাউশি, এখানকার দুর্নীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব গোটা শিক্ষা সমাজের ওপর পড়ে। কাজেই এটিকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। এ দুর্নীতিবাজরা কিন্তু এক, সংঘবদ্ধ স্বার্থের কারণে। কিন্তু সৎ কর্মকর্তা দু-চারজন যে আছেন তারা কিন্তু সংঘবদ্ধ নয়। তারা নিজ উদ্যোগে মাঝে মাঝে এ পাহাড়সম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে, কাজ করতে গিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অনেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যান। ডিগ্রি পর্যায়ের ৮৩১ জন তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষাভবনে বড় অংকের টাকা লেনদেন হয়েছে। শিক্ষকপ্রতি নেয়া হয়েছে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা। শেরপুরের এক শিক্ষকের কাছ থেকে বিদ্যালয়ের বেতন-ভাতা ছাড় করার জন্য ৫ লাখ টাকা ঘুস নেয়া হয়। পরে কাজ না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে ওই শিক্ষককে হুমকি দেয়া হয়, ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

বছরের পর বছর একই জায়গায় চাকরি করছেন খুঁটির জোরে। কখনো বদলি করা হলে আবার কয়েকদিন পর যথাস্থানে হাজির। অর্থের শক্তি, অর্থ দিয়ে, পার্টির জোর দিয়ে সব ম্যানেজ করা হয়। কারণ এদের সবারই ঢাকার বাইরে বহু ধরনের সম্পদ, ব্যবসা, ব্যাংক ব্যালান্স আছে বিভিন্ন নামে। দেশের শিক্ষক সমাজ যদি এ ধরনের অসাধু  কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের কাছে ধরা থাকে, বাধ্য থাকে, তাহলে শিক্ষার কী হবে? আজ শিক্ষা নেই পাস আছে, পড়াশোনা নেই জিপিএ আছে, খাতা খালি অথচ পাস। যাদের সন্দেহ আছে কিছু বিদ্যালয় ঘুরে আসুন দেখুন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের অবস্থা, শিক্ষকদের অবস্থা। শিক্ষকরা কেন পড়াশোনা করবেন? শিক্ষার্থীরা কেন পড়বে যখন এমনিতেই পাস? এ অবস্থা কি চলতে থাকবে? শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়, তারা যাতে শ্রেণীকক্ষে আসে এবং শিক্ষকরা যাতে মনোযোগ দিয়ে পড়াতে পারেন—রাষ্ট্রকে সেই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ থাকল।

 

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক