রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্যে দেখা যাচ্ছে, নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৩০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে আরো ১৬৯ জন। বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও প্রাণ হারিয়েছেন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আসলে মন্তব্য করা কঠিন, তবে আমরা নীতিগত জায়গা থেকে এ দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করতে পারি। প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে হয়তো এ নিয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
প্রথম জীবনে বিমান বাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে তেজগাঁও বিমানবন্দর এলাকা থেকে বিমান উড্ডয়ন হতো। তখন সেখানে বর্তমানের মতো ঘনবসতি ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এ এলাকায় বহুতল বিল্ডিং গড়ে উঠল। এরপর বিমানবন্দর কুর্মিটোলায় স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও নিরাপদ ল্যান্ডিংয়ের সুযোগ কম। চারপাশে সুউচ্চ ভবন গড়ে উঠেছে। ইদানীং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সেটি আরো বেশি হচ্ছে।
ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর খুব বড় দেশ নয়। সেখানে মানব বসতির ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমান ওড়ে। ঝুঁকি সবক্ষেত্রেই রয়েছে। এফ-৭ জি সর্বশেষ ধাপে কেনা হয়েছে। এটা একেবারে পুরনো উড়োজাহাজ এটা বলতে পারব না। সাধারণত দুই কারণে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে। টেকনিক্যাল ফল্ট (প্রযুক্তিগত ত্রুটি) ও হিউম্যান এরর (মানবিক ভুল)। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের দুর্ঘটনাটি কেন ঘটেছে তা হয়তো তদন্ত শেষে জানা যাবে।
এ সময়ে হয়তো এটা অসংবেদনশীল আলাপ মনে হতে পারে কিন্তু আমাদের এ প্রশ্নও হয়তো করতে হবে, মাইলস্টোন কলেজটি রানওয়ে থেকে কত দূরে। কারণ রানওয়ে থেকে যেকোনো স্থাপনা একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে হওয়া প্রয়োজন। মাইলস্টোন যদি সে দূরত্ব না মেনে তৈরি করা হয়ে থাকে তাহলে সেখানে আইন অমান্য হয়েছে। এটি দুঃখজনকও। সিভিল এভিয়েশন অথরিটির নির্দেশনা অনেক ক্ষেত্রে পালিত হয় না।
মাইলস্টোন কলেজে বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে অনেকেই শুরুতে প্রশিক্ষণ বিমানের কথা বলছে। আসলে এটা প্রশিক্ষণ বিমান ছিল না, এটা যুদ্ধবিমান ছিল। বিমান বাহিনীতে যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষণ সবসময় চলতে থাকে। যুদ্ধবিমান এক সিটেরও হয়, দুই সিটেরও হয়। এক সিটের হওয়ার অর্থ হলো পাইলট একা বিমানটি উড়ান। অবশ্য একক বা দুই সিটের বিমানে কোনো পার্থক্য থাকে না।
কোনো ছাত্রকে যখন প্রথমবারের মতো বিমান চালনা করতে দেয়া হয়, তখন এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন যেন পুরোপুরি ফিট এয়ারক্রাফ্ট তাকে দেয়া হয়। যদিও যান্ত্রিক ত্রুটি যেকোনো সময় তৈরি হতে পারে বা মানুষও ভুল করতে পারে। এটি তদন্ত করা ছাড়া বের করা সম্ভব নয়।
বিমান বিধ্বস্তের এ ঘটনা থেকে আমরা দুই দিকে নজর দিতে পারি। এক. যে ত্রুটির কারণে এটি ঘটেছে সেদিকে আর দুই. রানওয়ের আশপাশে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান করা উচিত নয়। সিভিল এভিয়েশেনের নিয়ম ও বিল্ডিং কোড মেনে বিমানবন্দরের আশপাশে ভবন নির্মাণ করতে হবে। অন্তত এতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতি কম হবে বা প্রাণহানি কম হবে। অনেকেই বিমান ঘাঁটি সরানোর কথা বলছেন। কিন্তু বিমান ঘাঁটি সরানো কোনো সমাধান নয়। তাছাড়া এটি ব্যয়বহুলও। তাই সরকারই এর অনুমতি দেবে না।
তাছাড়া সামরিক ঘাঁটি ঢাকার আশপাশেই হতে হবে। কারণ ঢাকা আমাদের দেশের রাজধানী। ঢাকার আকাশ সুরক্ষার জন্য বিমান ঘাঁটির আশপাশেই হওয়া আবশ্যক। নয়তো বিমান বাহিনী প্রয়োজনের সময় দ্রুত এসে পৌঁছতে পারবে না। তবে এতে সরকারের কত টাকা ব্যয়, কতটা লাভজনক হবে সেটি দেখার বিষয়। কিন্তু এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধিমালা মানা উচিত। নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু বিমান উড্ডয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এটি জননিরাপত্তার জন্যও জরুরি। আমরা যদি নিরাপত্তা বিষয়টি মাথায় না রাখি তাহলে পৃথক ফাইটার বেজ তৈরি হলে সেখানেও কিছুদিন পর বহুতল বিল্ডিং উঠে যাবে। জায়গাটি জনবসতিপূর্ণ হয়ে যাবে। যেমনটা আমরা ফাইটার বেজ তেজগাঁও থেকে কুর্মিটোলায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দেখেছি। আর এটাও স্বাভাবিক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ফাইটার বেজের আশপাশে বসতি গড়ে উঠেছে। কমার্শিয়াল ভেল্যু থেকে এটি হয়। কিন্তু বিল্ডিং কোড মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আমাদের বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে কিন্তু তেমন বিল্ডিং নেই। কারণ সেদিকে ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস আছে। কেউ চাইলেও সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান সেদিকে স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন দেবে না। কিন্তু উত্তরার দিকে ভবন নির্মাতারা রাজউকের সঙ্গে চুক্তি করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলে। সিভিল এভিয়েশনে গেলে বুঝতে পারবেন এসব অবৈধ স্থাপনার সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে জড়িত হয়; কার কার স্বার্থ আছে তাও হয়তো জানা যেতে পারে।
বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ বিমান অনেক দুর্ঘটনায় পড়ে, আমাদেরও পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রেও অনেক দুর্ঘটনা হচ্ছে। সেগুলো দেখা যাচ্ছে জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় ভূপাতিত হচ্ছে। এতে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত দুর্ঘটনার কারণে হয়তো সেসব ঘটনা গণমাধ্যমে সে রকম আসেও না। আমাদের এখানে জনাকীর্ণ এলাকায় যুদ্ধবিমানটি পড়েছে বলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি। এতে মানুষের ক্ষোভও বেশি, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রতিরক্ষা খাতে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের মহড়া সাধারণত জনবিচ্ছিন্ন, নিরাপদ এলাকায় হয়ে থাকে। তবে অবতরণের জায়গাটি জনবসতির কাছাকাছি হতে পারে।
আরেকটা কথা চলছে, উড়োজাহাজটি অনেক পুরনো ছিল, ফ্লায়িংয়ের জন্য অনুপযোগী। এটা পুরনো নয়, ২০১৩ সালে এ ব্যাচের সর্বশেষ উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হয়েছে। ১২ বছর পার করেছে এগুলো। সাধারণত বিমান বাহিনীতে আট বছর থেকে ১৬ বছরের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো চালানো হয়। সর্বোচ্চ ২৪ বছর পর্যন্ত হয়তো কোনো কোনো উড়োজাহাজ বহরে থাকে। এরপর উড়োজাহাজগুলো বাতিল করা হয়ে থাকে। ৷
এবারের দুর্ঘটনাটি সব দিক থেকেই মর্মান্তিক। ভবিষ্যতে এসব এড়ানোর জন্য যা দরকার তা করা উচিত। অপরিকল্পিত নগরায়ণের রাশ টেনে না ধরলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন। এটা অস্বীকারের উপায় নেই রাজধানী ঢাকা সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় নিরাপত্তার জায়গা থেকেই আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য রাজধানীর আশপাশেই বিমান ঘাঁটি রাখা হয়েছিল। প্রশিক্ষণের জন্য হয়তো আরো বিকল্প ঘাঁটি করা যেতে পারে। তবে বিমানবন্দর ও কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটির আশপাশে নীতিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এরই মধ্যে নীতি-বহির্ভূতভাবে যেগুলো নির্মিত হয়েছে সে ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। যতদূর জানি, সিভিল এভিয়েশন অথরিটির বর্তমান চেয়ারম্যান নীতি-বহির্ভূত স্থাপনার পক্ষে নন। তাদের কথা ঠিকমতো মানা হলে হয়তো এমন ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে যেতে হতো না।
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন: সাবেক চেয়ারম্যান, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)










