কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বৈশ্বিক মন্দার পর ব্যক্তি ও সরকারি পর্যায়ের প্রাক্কলনকারীরা আশাবাদী যে বৈশ্বিক উৎপাদন এ বছর এবং তার পরে শক্তিশালীভাবে পুনরুদ্ধার হবে। তবে আসন্ন সম্প্রসারণ দেশগুলোর অভ্যন্তরে ও আন্তঃঅর্থনীতির মধ্যে অসমভাবে বণ্টিত হবে। পুনরুদ্ধার ভি আকৃতির (আগের প্রবৃদ্ধিতে শক্তিশালীভাবে ফিরে আসা), ইউ আকৃতির (ভি-এর অধিক বিবর্ণ ভার্সন) কিংবা ডব্লিউ আকৃতির (গভীরতর মন্দা) হবে কিনা, তা নির্ভর করবে বিভিন্ন অর্থনীতি ও অঞ্চলের মধ্যকার বিভিন্ন ফ্যাক্টরের ওপর।

অনেক দেশে করোনাভাইরাস এখনো ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্ন হলো, সাংঘাতিক নতুন ধরনগুলো বারবার স্টপ অ্যান্ড গো সাইকেলের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে কিনা, কিছু ক্ষেত্রে আমরা  যেমনটা  দেখেছি। বিশেষ করে যেখানে অর্থনীতিগুলো শিগগিরই খুলে দেয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে একটি খারাপ আশঙ্কা এই যে, অধিক টিকারোধী ধরনের আবির্ভাব টিকাদান প্রচেষ্টার জরুরত বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা অনেক অঞ্চলে এখনো খুব ধীরগতিতে চলছে। 

ভাইরাসের বাইরেও সম্পর্কিত কয়েকটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। একটি ঝুঁকি হলো, মন্থর বা অপর্যাপ্তভাবে জোরালো পুনরুদ্ধার দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের কারণ হবে, যদি অনেক প্রতিষ্ঠানই ব্যর্থ হয় এবং শ্রমবাজার হিস্টেরিসেস (দক্ষতা সমস্যার  কারণে যখন দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব শ্রমিকদের  অকর্মনিয়োজনযোগ্য করে  তোলে) দেখানো শুরু করে। দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো, ব্যাপকভাবে ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো (ছোট-বড় উভয়ই) এবং পরিবারগুলো কতটা ঋণের বোঝা কমাতে পারবে এবং এ প্রভাব দমিত চাহিদার স্বস্তি দ্বারা পুরোপুরি বদলাবে কিনা, সেটিও এক বড় প্রশ্ন।

আরেকটি উদ্বেগের ক্ষেত্র হলো সামাজিক-রাজনৈতিক। আর তা হলো, বেড়ে চলা অসমতা অস্থিরতা ও দমিত সামষ্টিক চাহিদার আরো লক্ষণীয় উৎস হয় কিনা। এর অনেকটাই নির্ভর করবে পিছিয়ে পড়াদের আয় সমর্থন ও তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ানোর নীতিগুলোর মাত্রা, পরিধি ও অন্তর্ভুক্তিতার ওপর। একইভাবে এটা দেখাটা বাকি আছে যে সামষ্টিক নীতি প্রণোদনাগুলো (মুদ্রাগত, ঋণ ও রাজস্বগত) যতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা কিছু ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা বাড়াবে।

এসব অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেও মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং চীনা বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এশীয় উদীয়মান বাজারগুলোয় বর্তমান পুনরুদ্ধার শক্তিশালী হবে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সংক্রমণ হার কমা, উচ্চ টিকা হার ভোক্তা ও ব্যবসায়িক আস্থা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক ও মুদ্রাগত সম্প্রসারণের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সেখানে এ বছর একটি জোরালো পুনরুদ্ধার চালিত করবে। 

এখানে প্রধান ঝুঁকি হলো, বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতিতে সাম্প্রতিক বৃদ্ধি ইউএস ফেডারেল রিজার্ভের প্রত্যাশার চেয়ে অধিক ধারাবাহিক ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং আজকের ফেনিল, বুদ্বুদময় আর্থিক বাজারগুলো একটা সংশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। ফলে আস্থা বিনষ্ট হতে পারে।

ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের সাফল্য ও সামষ্টিক প্রণোদনার প্রভাব (যার সবটাই অর্থনীতি দ্রুত খুলে দেয়া ও ব্যবসায়িক আস্থা ফেরানোর সুযোগ দিয়েছে) চীন এবং দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অর্থনীতিগুলোর পুনরুদ্ধার শক্তিশালী করছে। তবে উচ্চমাত্রার  দেনা এবং চীনা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় খাতের কিছু অংশে লেভারেজ ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, অত্যধিক ঋণে রাশ টেনে চীন যেহেতু শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো,  যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী যেকোনো বৈরিতার (শীতল যুদ্ধ) আশঙ্কা চীন ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হুমকিতে ফেলবে, বিশেষ করে যদি এটা পুরোপুরি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও নতুন করে সুরক্ষাবাদের উন্মেষ ঘটায়।

এদিকে ইউরোপের অবস্থাও খারাপ। ২০২০ সালের শেষ প্রান্তিক এবং ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে অঞ্চলটি গভীরতর মন্দায় ভুগেছে। এটা হয়েছে সংক্রমণের নতুন ঢেউ ও লকডাউনের কারণে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে অঞ্চলটির পুনরুদ্ধার হবে দুর্বল, তবে টিকার হার বাড়লে এবং সামষ্টিক নীতি সম্প্রসারণমূলক হলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রবৃদ্ধি বেগবান হতে পারে। কিন্তু কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণ নিশ্চয়তাগুলো খুব তাড়াতাড়ি অবসায়ন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা ও হিস্টেরিসেস পরিস্থিতি ঘটানোর কারণ হতে পারে।  

এছাড়া বহুল প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ইউরোজোনের কিছু অংশে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ সরকারি দেনার অনুপাত বজায় থাকবে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যতক্ষণ সম্পদ কেনা বজায় রাখবে, ততক্ষণ সভরেন  স্প্রেড (যেমন জার্মান ও ইতালীয় বন্ড ইল্ডের মধ্যকার পার্থক্য) নিম্নমুখী থাকতে পারে। তবে মুদ্রাগত সমর্থন চূড়ান্তভাবে অবসায়িত করতে হবে এবং ঘাটতি কমাতে হবে। তদুপরি সংকটকে পুঁজি করার দিকে নজর রাখা জনতুষ্টবাদী ইউরোসংশয়ী দলগুলোর ভূত পরিস্থিতির তাত্ক্ষণিক অবনমন ঘটাবে বৈকি।

এদিকে জাপানের অর্থনীতিরও অনেক ধীর পুনঃউন্মোচন হয়েছে। নতুন  ঢেউ  ঠেকাতে  নেয়া লকডাউনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি গ্রীষ্মে  টোকিওতে অলিম্পিক  গেমস আয়োজনের ট্র্যাকে ফেরার চেষ্টা করছে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে এবং চূড়ান্ত আর্থিক সংহতির সুযোগ করে দিতে জাপানেরও কাঠামোগত সংস্কারের ভীষণ প্রয়োজন। তদুপরি ব্যাংক অব জাপানের ধারাবাহিক আর্থিকীকরণ নীতি (মনিটাইজেশন) সত্ত্বেও দেশটির ব্যাপকমাত্রার সরকারি ঋণ চূড়ান্তভাবে অস্থিতিশীল হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, অনেক উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো ভঙ্গুর—যেখানে জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও নিম্ন টিকাহারের কারণে ভাইরাসের বিস্তার অব্যাহত থাকবে। এসব দেশের অনেকগুলোয় ব্যবসা ও ভোক্তাদের মনোভাব অবদমিত, পর্যটন ও রেমিট্যান্স থেকে আসা আয় কমেছে, ঋণ অনুপাত এরই মধ্যে বেশি এবং সম্ভবত তা অস্থায়িত্বশীল হবে এবং উচ্চ ঋণব্যয় ও দুর্বল মুদ্রার কারণে আর্থিক অবস্থা সংকটজনক। অধিকন্তু, সেখানে নীতি সহজীকরণের সুযোগ কম এবং কিছু ক্ষেত্রে জনতুষ্টবাদী রাজনীতির কারণে নীতি বিশ্বাসযোগ্যতা অবমূল্যায়িত হতে পারে। 

সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্ত অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে ভারত, রাশিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকার অনেক অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অধিক ভঙ্গুর তেল আমদানিকারক দেশগুলো। অনেক দেশ অর্থনৈতিক সংকোচন নয়, অধোগতির মুখোমুখি। ২০০ মিলিয়নের অধিক লোক হতদারিদ্র্যে নিপতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব অসমতা মিলে ক্ষুধা ও রোগে সবচেয়ে নাজুক দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় হুমকিরও মুখোমুখি হতে পারে। এটা বৈশ্বিকভাবে অস্থিতিশীলতার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বজায় থাকবে।

সার্বিক আস্থা ফিরে এলেও কিছু আর্থিক বাজার অযৌক্তিকভাবে পুলকিত এবং এখানেই ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বেশি নিহিত। কভিড-১৯ সংকট দেশগুলোর অভ্যন্তরে ও আন্তঃদেশগুলোর মধ্যে অসমতা বাড়াতে পারে। নাজুক জনগোষ্ঠী যত পিছিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তত বেশি থাকবে।  

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

নুরিয়েল রুবিনি: মার্কিন অর্থনীতিবিদ, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক, রুবিনি ম্যাক্রো অ্যাসোসিয়েটসের  চেয়ারম্যান

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির