ডাক্তার এসএ মালেক (১৯৩৫-২০২২) আমার মামা। আমার মায়ের চাচাত ভাই। বয়সে মা ছিলেন মামার বড়। আমার মা হালিমা বেগম পেশায় ছিলেন শিক্ষক, আর বাবা রেলওয়ের কর্মকর্তা। আমরা চট্টগ্রামে থাকতাম। চট্টগ্রামেই বেড়ে ওঠা। চট্টগ্রামে থাকাকালীন মামার সঙ্গে আমার গভীর এক স্মৃতি রয়েছে, যা আমার ওপর গভীর প্রভাব রেখে যায়। প্রথম ঘটনাটি অবশ্য মামা ও পারিবারিকভাবে শোনা। তবে বয়সে ছোট হওয়ার কারণে সে স্মৃতি আমি চোখে ভাসাতে পারি না। মনেও করতে পারি না। এ ঘটনাটি ষাটের দশকের শেষের দিকে, মালেক মামার বাবা, আমার মায়ের ছোট চাচা শেখ রাজ্জাক আলী অর্থাত্ আমাদের ছোট নানা, চট্টগ্রাম  থেকে জাহাজে করে হজে যান। মামার কাছে শোনা, হজ থেকে ফেরার পথে নানা জাহাজে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। 


নানাকে জাহাজ থেকে নামানোর জন্য মা তার আর এক খালাত ভাই ডাক্তার কাসেমকে মালেক মামার সঙ্গে পাঠান। আমাদের এ মামা নেভির ডাক্তার ছিলেন। মাকে মামা খুব ভালোবাসতেন। কাসেম মামা বয়সে মায়ের বড় ছিলেন। আমরা তাকে ছোট মামা ডাকতাম। চট্টগ্রামে থাকার কারণে নানি, মা ও আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাদের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ও আসা-যাওয়া ছিল। মামা চিটাগং ক্লাবের উল্টো দিকে নেভির মেরিন হাউজে থাকতেন। নানা হজ থেকে ফেরার এ কাহিনী মালেক মামার কাছে শোনা। ‘জাহাজ থেকে একে একে সব হজ যাত্রী নেমে এলো। বাবা নামেন না। আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম। কাশেম ভাই আমার উদ্বেগ দেখে আমাকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি যেহেতু নেভিতে উঁচু পদে ছিলেন, তিনি জাহাজের ভেতরে গিয়ে বাবাকে কোলে করে নিয়ে ফিরলেন। তার সারা শরীর ছিল মলমূত্র মাখানো। কাশেম ভাই গোটা জাহাজ ঘুরে তোমার নানাকে না  পেয়ে যখন উদ্বিগ্ন, তখন জাহাজে এক রুমে অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে পান। তোমার কাশেম মামা দেখতে ছিলেন লম্বা চওড়া। উনি একা কোলেকাঁধে করে জাহাজ থেকে বাবাকে নিয়ে বেরুলেন। আর তোমার মা-নানির সেবায় বাবা সহসা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। আমি সুস্থ বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।’ তবে বিরাট সময়ের দূরত্বে, আমি নানা ও মামাকে ঘিরে সেই স্মৃতি মনে করতে পারি না। আমার আমেরিকাপ্রবাসী বড় বোনের স্মৃতিতে অবশ্য ঘটনা এখনো জীবন্ত। 


দ্বিতীয় ঘটনার স্মৃতি আজো আমার মনে প্রবলভাবে সজীব ও জীবন্ত। ঘটনাটি আমার জীবনে বড় প্রভাব রেখে গেছে। আমার জীবনের মোড় ঘোরাতে যা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর মামা আমাদের চট্টগ্রামে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ঢাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সংগঠকের ভূমিকা রেখেছিলেন। এরপর চট্টগ্রামে আসেন তা ছড়িয়ে দিতে। আমাদের বাসায় থেকে মায়ের সহযোগিতা নিয়ে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা নেন। মামাকে আমাদের বাড়ির যে অংশে রাখা হয় তা ভাড়া ছিল। উল্লেখ্য, এ বাড়িতে সেই সময়ে ভাড়া থাকতেন ঊনসত্তরের ছাত্রনেতা ও পরবর্তী সময়ে তত্কালীন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিরও নেতা শামসুদ্দোহা। শামসুদ্দোহা ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর প্রথম নিজে ও পরে তার পরিবারকে নিয়ে পালিয়ে যান। মা মামাকে এ বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। আমার বয়স তখন ১০ বছর। সে সময় থেকে আমি মামার ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠি। তিনি হয়ে ওঠেন আমার গভীর ভালোবাসার মানুষ। আমার এক ধরনের আশ্রয়। অভিজ্ঞতার আঁধার। তাই তার সঙ্গে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে নানা আলোচনা করা যেত। 

এক

আমি ১৯৯৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়া শেষ করে কাজের সূত্রে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি। মাঝখানে নানা ঘটনা ঘটেছে আমার জীবনে। মা-বাবা ও নানিকে হারিয়েছি। মাথায় আঘাত পেয়ে পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। ১৯৯৬ সালে আমি পার্টির সদস্য পদ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে গবেষণাকাজে পূর্ণ মনোযোগ দিই। মামা আমার সব খবর রাখতেন। এভাবে ঢাকায় আসার পর ধাপে ধাপে আমি মামার আরো নিবিড় ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠি। এভাবেই মামার সঙ্গে আমার ২৮ বছরের এক গভীর যোগাযোগ, নিয়মিত আলাপ ও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমাদের এ সম্পর্ক, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। মামা আমার সম্পর্কটি ছিল, এক ধরনের রাজনৈতিক দার্শনিক বন্ধুত্ব। আমার এক অপ্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়। 

ডা. এসএ মালেক

ডা. এসএ মালেকের জীবনচক্রকে আমি চারটি অধ্যায়ে দেখি। তার জীবনের কেন্দ্রে সবসময় ছিল রাজনীতি, মানুষ ও দেশের মঙ্গল চিন্তা। প্রথম অধ্যায়টি পড়াশোনা, রাজনৈতিক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, অর্থাত্ পঞ্চাশের দশক থেকে ষাটের মাঝামাঝি; দ্বিতীয় অধ্যায়টি হলো বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বিলেতে এফসিএস পড়তে না গিয়ে, গভীরভাবে রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া। সেজন্য রাজবাড়ীতে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন; তৃতীয় পর্যায়টিতে তিনি ১৯৭৩ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন হন। এ সংসদেই বাহাত্তরের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল; চতুর্থ পর্যায়ে পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর দর্শন পুনরুদ্ধারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে আনা ও গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে আনার সংগ্রামে ব্রত ছিলেন। তারপর ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন, যা তার রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা গড়ে দেয়েছিল। 

দুই

অনুরূপভাবে ডা. এস এ মালেকের মাঝে আমি তিনটি সত্তা দেখতে পাই। প্রথমত, চিকিত্সক। নিজের পেশা ও রোগীদের প্রতি তার বিশেষ মনোযোগ ছিল। নিজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করার পরও পঁচাত্তর-পরবর্তী ভারত থেকে ফিরে আশির দশক থেকে হোমিওপ্যাথি চিকিত্সা শুরু করনে, পরবর্তী সময়ে এক ধরনের চিকিত্সাবিজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন; দ্বিতীয়ত তার রাজনৈতিক সত্তা। রাজনীতিতে তিনি মূলত কৌশলগত ভূমিকা পালন করে গেছেন; এ ব্যাপারে জীবনের দুই অধ্যায় দুই ব্যক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। প্রথম পর্যায়ে কাজ করেছেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, বঙ্গবন্ধুর জন্য। দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য। ডা. মালেকের তৃতীয় সত্তাটি ছিল, তার লেখকসত্তা। আশির দশক থেকে তিনি দুই হাতে লিখে গেছেন। রাজনীতি, রাজনৈতিক-অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়ে তিনি অনবরত লিখেছেন। 

৬৫ বছর রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক জীবন্ত রাজনৈতিক এনসাইক্লোপেডিয়া। তার ওপর গান্ধী ও মুজিবের দর্শনের গভীর প্রভাব ছিল। যার প্রভাব আমরা দেখি তার জীবনদর্শন ও রাজনীতি চর্চায়। ধার্মিক হয়েই তিনি ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক, বহুমতের ও গণতন্ত্রের প্রতি ছিল তার আস্থা, বাঙালি সংস্কৃতি ছিল তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, সমাজতন্ত্র তার কাছে শোষিতের গণতন্ত্রের বাস্তবরূপ। তার লেখাজুড়ে বারবার এ প্রসঙ্গগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। বিষয়গুলো নিয়ে বারবার লিখেছেন, মূলত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের ভিত্তিকাঠামোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইতিহাসের মশাল বহন করার যেন ব্রত নিয়েছিলেন। নিজেকে জারি রেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একজন প্রচারক হিসেবে। তিনি ছিলেন সময় আর ইতিহাসের সন্তান। 

তাই ডা. এসএ মালেকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি কালের অবসান হলো। দৃঢ়চেতা, আদর্শবাদী, নির্লোভ-সাহসী ও সত্ এ মানুষটি আমার জীবনে বিশেষ মূল্যবান ছিল। আমার দৃষ্টিতে ডা. এসএ মালেক নেপথ্যচারী এক রাজনৈতিক কর্মী। যিনি পেছনে বসেই গোটা জীবন রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে যেতে চেষ্টা করেছেন। কাজ করে গেছেন মানুষ, দেশ ও রাজনৈতিক দর্শনের জন্য। আমরা দুজন মন খুলে দেশ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে আলাপ করতে পারতাম, যা ছিল পরস্পরের জন্য আনন্দদায়ক ও কার্যকর। দ্বিমত করা ও একমত হওয়া দুটিই আমরা করতে পারতাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এমন এক ব্যক্তিক সম্পর্ক তিনি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন এবং আজীবন তা রক্ষা করে গেছেন। যার ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি শেখ হাসিনা ও ডা. এসএ মালেকের মধ্যে, যা এক রাজনৈতিক দর্শনেরই পরম্পরার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

আমার সঙ্গে মামার এ দীর্ঘ সম্পর্কের বিভিন্ন সময়ের, তিনটি ঘটনা এ লেখায় আমি তুলে ধরতে চাই। যার সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি সরাসরি যুক্ত।

ঘটনা-১

১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম থেকে অ্যালবাম গণআন্দোলন নামে একটি বই প্রকাশ হয়। বইটি সম্পাদনা করেন ইউসুফ মুহাম্মদ, যা ছিল নব্বইয়ের গণআন্দোলনের একটি নিবিড় ডকুমেন্টেশন করার উদ্যোগ। বইটির ধারণা ও বিন্যাসে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা পাল্টেছে। ইউসুফ মুহাম্মদ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে একটি ভালো ডকুমেন্টেশনের জন্য যা করণীয় তার সব ধরনের সহযোগিতা তিনি আমায় জুগিয়েছেন। আর পেছন থেকে সব বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন আমি তাকে জুগিয়েছিলাম। সে সুযোগ তিনি আমায় দিয়েছিলেন, যা আমার জন্য ছিল আনন্দায়ক।   

‘অ্যালবাম গণআন্দোলন: ১৯৮৩-১৯৯০’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর ইউসুফ মুহাম্মদ আমাকে সঙ্গে নিয়ে বইটি জাতীয় নেতৃবৃন্দকে দেয়ার জন্য নিয়ে ঢাকায় আসেন। আমরা বইটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদীয় বিরোধী দলের বাসভবনে গিয়ে তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল বইটির দ্বিতীয় খণ্ডে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ওরাল হিস্টোরিকে মূল ইতিহাসের অংশ হিসেবে ধরে রাখা, কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমার ঢাকায় চলে আসার কারণে দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। 

আমি গণআন্দোলন বিষয়ে শেখ হাসিনার একক সাক্ষাত্কার নিতে চাই। উনি তার পরিবর্তে আমির হোসেন আমুকে সাক্ষাত্কার গ্রহণ করতে বলেন। আমি তাকে (অর্থাত্ শেখ হাসিনার) সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করি। আমি ছিলাম এ ব্যাপারে নাছোড়বান্দা। আমাদের মধ্যে পরস্পর কথোপকথনের সময় তিনি আমার পরিচয় জানতে চায়। খুবই স্নেহশীল স্বরে তিনি বললেন, ‘এই ছেলেটি কে (তখন আমার বয়স ২৫ বছর) যে আমার সঙ্গে তর্ক করছে।’ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি করো, কোথায় থাকো।’ আমি তার কথার জবাব দিলাম। ‘আমি চট্টগ্রামে থাকি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব নিয়ে মাস্টার্সে লেখাপড়া করছি।’ এরপর ওনার সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন ‘কী রাজনীতি করো?’ আমি জবাব দিলাম, এক শব্দে ‘কমিউনিস্ট পার্টি’। উনি স্বতঃস্ফর্তভাবে বলে উঠেছিলেন, ‘তাই বল’। 

সেদিন রুমে আমি ও ইউসুফ মুহাম্মদ ছাড়া ছিলেন ইউসুফ মুহাম্মদের স্ত্রী। রুমে থাকা আরো দুজনের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। তারা হলেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু আর বিএমএর নেতা ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন। ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন শেখ হাসিনাকে উপলক্ষ করে বললেন, ‘আপা ও আমাদের মালেক ভাইয়ের ভাগ্নে। ওর ভগ্নিপতি ডাক্তার আউবুর রহমান আমাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল। আমার ঘনিষ্ঠ।’ শেখ হাসিনা স্বভাবসিদ্ধ হাসি মুখে বললেন, ‘মালেক ভাই কী করলেন, ওর মতো ছেলেকে আমাদের পার্টিতে টানতে পারল না। শোন, তুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। তুমি বঙ্গবন্ধু মিউজিয়ামের কাজে আমাকে সাহায্য করবে।’ জবাবে আমি বলেছিলাম, ‘আমি পড়াশোনা শেষ করি, আপনি ডাকলে আমি নিশ্চিয় সময় দেব।’    

এ বিষয়টি নিয়ে আমার মামার সঙ্গে কথা হয়েছে। মামার অবস্থান খুবই সুস্পষ্ট। তার মতে, যেকোনো ব্যক্তির নিজস্ব রাজনীতি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা আছে। তাই পছন্দের স্বাধীনতা যার যার। নিজেকে তিনি বহুমতের বিশ্বাসী একজন ভাবতেন। বাস্তবে তা চর্চাও করে গেছেন আজীবন। আমিই তার বাস্তব উদাহরণ। 

কাজের সূত্রে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস শুরু করার পর মামার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ক্রমাগত আরো গভীর হতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। মামাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হলো। মামা আমাকে কাছে টানলেন, আমিও তার কাছে ভিড়লাম। উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখলাম, নানাভাবে মামা সর্বক্ষণ দক্ষ আর সত্ মানুষ খুঁজছেন। তার সেই লোক নির্বাচন ও বাছাই প্রক্রিয়ায়, ক্ষেত্রে বিশেষে আমার সহায়তা নিতেন। কয়েকটা মানুষের ব্যাপারে আমি তার সাক্ষী। এ তালিকা আরো বিশাল হবে যারা পরবর্তী সময়ে টেনোক্র্যাট পদে ও মন্ত্রী হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

অ্যারোমা গুনকে বেছে নিয়েছিলেন এনজিও খাতের ব্যাপারে। খুশি কবীর, আতিউর রহমান ও দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এদের সবাইকে যুক্ত করলেন ব্যাংক পরিচালনায়। এদের মধ্য থেকে আতিউর রহমানকে ব্যাংক পরিচালক থেকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবাদিক, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য নানা শ্রেণী-পেশার  নেতৃস্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। মেধাবী, পেশাদার, সত্, সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ও দেশপ্রেমিক মানুষদের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাদের দেশের কাজে লাগানোর চেষ্টা ছিল। মেধাবী, পড়াশোনা ও দক্ষ মানুষের প্রতি ডা. এসএ মালেকের প্রবল আকর্ষণ ছিল। 

মামার এ মনোভাব ও চেষ্টা আমি সারা জীবন খানিকটা কাছ থেকে দেখেছি। তাই আমার চোখে তিনি নেতার নেতা, যা খুবই বিশেষায়িত গুণ। বাতেনি ধারার এক বিরল প্রজাতির মানুষ ও নেতা। যেমনটা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধুর পর তাজউদ্দিনের প্রতি ছিল তার বিশেষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। 

মামার এ বিশেষ রাজনৈতিক কৌশল ছিল আমার জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষা। এ শিক্ষা ও জীবনাচরণ মামার শারীরিক অস্তিত্বের অনুপস্থিতে আমার চোখে মামাকে আজ গান্ধী চলচ্চিত্রের প্রফেসর গোখলে বলে মনে হয়। ডা. এসএ মালেক নিজেকে আড়ালে রেখে, দেশ সেবায় ব্রতী ছিলেন। তার বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা যায়, নেপথ্যচারী একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে। তাকে নিয়ে তাই পৃথক গবেষণার দাবি রাখে। 

ঘটনা-২

দ্বিতীয় ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার (১৯৪২-২০০৯) মৃত্যুকে ঘিরে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান পরমাণু ও পদার্থ বিজ্ঞানী। মামার সঙ্গে শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদের সর্ম্পক ছিল নিবিড় ও আস্থার। উভয়ের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবক স্থানীয়। ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়কালীন জীবনে তিনি ছিলেন পরিবারের একজন। কোনো ধরনের প্রত্যাশা ছাড়া দেশ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার জন্য সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি রাজনীতি করে গেছেন। ২০০১ সালের পর থেকে মামা নিজেকে যেন ক্রমাগত ঘরবন্দী করে ফেলেছিলেন। বাড়ির বাইরে খুব একটা বের হতেন না। 

তার কাছে আসার সুযোগ পাওয়ার কারণে, তার মনোভাব ও মানসিকতা কিছুটা বোঝার সুযোগ আমার হয়েছে। রাজনীতিতে আদর্শের অনুপস্থিতির বিষয়টি, নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছেন। এ অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক ও জাতীয় উভয় ক্ষেত্রেই সত্য। জনকল্যাণমূলক দেশপ্রেমিক  জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শেষ অধ্যায়ের তিনি যেন ছিলেন শেষ চিহ্ন। নিজেকে এ আড়াল করার মধ্যে হয়েতো এক ধরনের অভিমান ও প্রতিবাদ দুটিই লুকিয়ে ছিল। 

ড. ওয়াজেদের অসুস্থতা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। দারুণ অস্থিরতা কাজ করছিল তার মধ্যে। কারো কাছে প্রকাশ করতে পারছিলেন না। আমার সঙ্গে তিনি সব কথা প্রকাশ করার ও বলার একটি সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। আমিও তাকে সব কথা বলতে পারতাম। কলাবাগান বশিরউদ্দিন রোডে আমার নিয়মিত আশা-যাওয়া ছিল। সপ্তাহে একবার মামা আমার অপেক্ষা করতেন। যদি না যেতাম, ফোন করে কেবল জিজ্ঞাস করতেন, ‘নাসিম তোমার সবকিছু ঠিক আছে তো।’ এ ফোনটি ছিল আমার প্রতি তার ভালোবাসার সরল প্রকাশ। 

ড. ওয়াজেদের স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি খারাপের দিকে আগাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তাকে দেখতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন। টেলিভিশনে এ সংবাদ দেখে মামাকে আমি দেখতে আসি। দিন কয়েক আগে ড. ওয়াজেদের অসুস্থতা নিয়ে মামার মন খারাপ দেখে গেছি। সন্ধ্যার পর আমি কাজ শেষে মামাকে দেখতে আসি। চেম্বারে ঢুকে দেখি মামা রোগী দেখে চেম্বারে বসে বই পড়ছেন। খুব মন খারাপ। মুখটা কালো হয়ে আছে। আমাকে দেখে খুশি হলেন। বলে উঠলেন, ‘ভালো হলো তুমি এসে। মনটা ভালো নেই, মনে হয় না ওয়াজেদকে আর দেখতে পাব।’ 

আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শক্তভাবে মামার হাতটা ধরলাম। বললাম চলেন হাসপাতালে। আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি। না হলে পরে আরো মন খারাপ হবে। মামা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন তোর সঙ্গে গাড়ি আছে। আমি বললাম হ্যাঁ আছে। আমার সঙ্গে মামা দোতলা থেকে নেমে এলেন। গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে উঠে কোনো কথা বললেন না। একেবারে চুপ করে রইলেন। আমরা স্কয়ার হাসপাতালে এসে নামলাম। উনি গাড়ি থেকে নেমে সোজা হাসপাতালের ভেতরে এগোতে থাকলেন। হাসপাতালের কর্মকর্তারা তাকে অনুসরণ করল। কেউ একজন তাকে বলার চেষ্টা করলেন, প্রধানমন্ত্রী ভিজিটর যেতে নিষেধ করেছেন। তিনি লিফটের দিকে এগোতে এগোতে কেবল ইংরেজিতে বললেন, ‘হি ইজ মাই প্যাশেন্ট, আই হ্যাভ টু ভিজিট হিম।’ মামাকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আমি নিচে অপেক্ষা করছিলাম। ২০-২৫ মিনিট পর তিনি ফিরে এলেন। 

মামাকে সঙ্গে নিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে আমরা পাশাপাশি বসা। আমার হাতটি তিনি শক্তভাবে ধরলেন। মনটা তার ভেতরে ভেতরে কান্নায় ভিজে গেছে। আমাকে বললেন, ‘তুমি আজ একটা বড় দায়িত্ব পালন করলে। আজ না এলে আর হয়তো ওয়াজেদকে দেখা হতো না।’ গাড়ি ফিরতে ফিরতে শেখ হাসিনা, ড. ওয়াজেদ ও বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে নানা স্মৃতিচারণা করলেন। যা বলার জায়গা এটা নয়। একান্তই ব্যক্তিগত ও আবেগঘন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তার অবস্থান একটি কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘ও হয়েছে ঠিক ওর বাবার মতো। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, গরিব মানুষের প্রতি ওর দরদ ছিল—সবসময়।’

ঘটনা-৩

শেষ স্মৃতিটি মৃত্যুর কয়েকদিন আগের। মামার মৃত্যুর ঠিক সপ্তাহ তিনেক আগের। মামার সঙ্গে শেষ আলাপ। এ আলাপে মামা যেন আমাকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে গেলেন। নানা আলাপে যাওয়ার সুযোগ সেদিন ছিল না। শরীর ছিল খুবই খারাপ। খুব বেশি কথা বলতে পারলেন না। তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘অ্যাই হ্যাভ নো রিগ্রেট ফর মাই পাস্ট, অ্যাই হ্যাভ নো রিগ্রেট ফর মাই প্রেজেন্ট, আই বিলিভ আই উইল হ্যাভ নো রিগ্রেট ফর মাই ফিউচার।’ মামা তার এ ছোট কথার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক দর্শন, জীবনাচরণ ও যাপিত জীবনের স্পষ্ট অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি যেন প্রকাশ করে গেলেন। লোভ আর ভোগের বিরুদ্ধে মামার এ উচ্চারণ মানুষ আর ভবিষ্যত্ পৃথিবীর নতুন বাস্তবতার কথা যেন স্মরণ করিয়ে দিলেন। তার পর বললেন, ‘আমি আমার জীবনের পূর্ণ সময়কাল আনন্দের সঙ্গে পূরণ করলাম। আমার এ দীর্ঘ জীবন নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।’ 

মামাকে কবরে নামিয়ে, উঠে আসতে গিয়ে একটি বাক্য মনে ঢেউ খেলে যায়। মনে মনে উচ্চারণ করি: গুডবাই মামা, গুডবাই আমাদের প্রফেসর গোখলে, গুডবাই কমরেড...।   

খন্দকার সাখাওয়াত আলী: সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা নলেজ অ্যালায়েন্স