মহাকবি শেখ সাদির একটি অসাধারণ গল্প আছে। এক দরবেশ নেকড়ের মুখ থেকে ছাগল ছানাকে বাঁচিয়ে খুব আত্মতৃপ্তি লাভ করলেন। সারা দিন ছানাটিকে ভালো ভালো খাইয়ে রাতে নামাজ শেষে দরবেশ দেখলেন তার খাওয়ার কিছু নেই। ক্ষুধার জ্বালায় ছানাটিকেই ভুনা করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সকালে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ছানা যখন দেখল রাতে গলায় ছুরি পড়েছে, তখন সে কাকুতির সুরে বলল, তুমিই সেই দরবেশ, যে নেকড়ের মুখ থেকে আমাকে বাঁচিয়ে নিজেই নেকড়ে বনে গেলে! সঙ্গে সঙ্গে দরবেশের হুঁশ ফিরল। হাত থেকে ছুরি ফেলে ছানাটিকে ছেড়ে দিলেন। গল্পের এ দরবেশের মতোই এক কাণ্ড ঘটিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য কঠোর অবস্থানে ঘোষণা দেয়া ডিএসসিসি নিজেই ঐতিহ্যের গলায় ছুড়ি চালিয়ে দিল। আয় বাড়ানোর কথা বলে ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাহাদুর শাহ পার্কে দোকান বরাদ্দের মতো খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করল।

রাজধানী ঢাকার নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী লক্ষ্মীবাজারের বাহাদুর শাহ পার্ক। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারত বর্ষের শাসনভার গ্রহণের পর এ পার্কে রানীর শাসনভার গ্রহণসংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তখন থেকেই এর নাম রানী ভিক্টোরিয়া পার্ক করা হয়। এরও আগে আর্মেনীয় বণিকদের আড্ডা ও খেলাধুলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতো এটি। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর পার্কটির নাম হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। ইতিহাসের সাক্ষী এ ছোট্ট পার্কটি পুরান ঢাকার নাগরিকদের বিনোদন ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা। দীর্ঘদিন থেকেই পুরান ঢাকার মানুষ এখানে হাঁটাচলা ও অবকাশ যাপন করে আসছে। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ বাহাদুর শাহ পার্কে ‘ফুড ভ্যান’ নামে একটি দোকান ইজারা দেয় ডিএসসিসি। 

বছরখানেক আগে ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস সদরঘাটের রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য নিয়ে লড়াই করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার মিডিয়ার সামনে ঘোষণা করেছেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লি­উটিএ) নির্মিত অবকাঠামোর কারণে রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য মানুষ উপভোগ করতে পারছে না। বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বহির্বিশ্বে দেখেছি, মানুষ নদী থেকে ঐতিহাসিক স্থাপনার সৌন্দর্য উপভোগ করে। ঢাকাবাসীকেও সে সুযোগ করে দেয়ার জন্য রূপলাল হাউজ ও আহসান মঞ্জিলের সামনে থেকে সদরঘাটের অবকাঠামো সরিয়ে নেয়ার জন্য বিআইডব্লি­উটিএকে চিঠি দিয়েছি।’ চমৎকার এ উদ্যোগ নিয়ে বণিক বার্তা পরপর তিনবার বিভিন্ন আঙ্গিকে শেষের পাতায় লিড স্টোরি ছাপে। যদিও রূপলাল হাউজ অবহেলিতই পড়ে আছে এবং বিআইডব্লিউটিএ ওই বরাবর নতুন আরেকটি স্থাপনা নির্মাণ করেছে। তবুও ঐতিহ্যের সৌন্দর্যের জন্য ডিএসসিসির এ প্রচেষ্টা প্রশংসা পেতেই পারে।

কিন্তু প্রশংসার বদলে ডিএসসিসির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে পুরান ঢাকাবাসী যারপরনাই হতাশ। রূপলাল হাউজ থেকে মাত্র ৫ মিনিট হাঁটার দূরত্বে বাহাদুর শাহ পার্কে দোকান বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তারা। এরই মধ্যে সচেতন নাগরিক সমাজ বিষয়টি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, জনাকীর্ণ পুরান ঢাকার এ ছোট্ট স্বস্তির জায়গাটি নিয়ে বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে ফিরে সিটি করপোরেশনকে আসতেই হবে। এখানে বরাদ্দ দেয়া দোকান তুলে ফেলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো হোক। জবাবে সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে দোকান ইজারা দেয়া হয়েছে। ইজারা বাতিল করলে করপোরেশনের সাড়ে ৩ লাখ টাকা হাতছাড়া হয়ে যাবে। এলাকাবাসী পার্কটি রক্ষায় কত যে মরিয়া সেটা জানা যায় তাদের এ জবাব শুনে—‘প্রয়োজনে আমরা চাঁদা তুলে বছরে বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করপোরেশনকে দিয়ে দেব, তবুও পার্কটিকে যেন এভাবে মেরে না ফেলা হয়।’

পার্ক-গণপরিসর রক্ষার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু বাহাদুর শাহ পার্কের বেলায় ডিএসসিসি রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি। প্রথমত, পার্কের ভেতর একটি দোকান বরাদ্দ দেয়া মানে সেখানে অবৈধ আরো দোকান বসার সুযোগ করে দেয়া। অথবা সিটি করপোরেশনই আরো দোকান বরাদ্দ দিয়ে আরো আয়ের পথ খুঁজবে না সে নিশ্চয়তা কোথায়? এরই মধ্যে পার্কের অবয়ব নষ্ট করেছে বরাদ্দ পাওয়া দোকান কর্তৃপক্ষ। ‘ফুড ভ্যান’ নামে বরাদ্দ পেলেও দোকানটি বসানো হয়েছে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করে। আবার ধুলাবালির ওড়া বন্ধ করতে পার্কের ভেতরের মাটির ওপর দেয়া হয়েছে কংক্রিটের আচ্ছাদন! সম্প্রতি ধানমন্ডি লেক নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে জানতে পারি, মূল নকশায় ছোট্ট কয়েকটি ক্যাফের কথা থাকলেও ডিএসসিসি আয় বাড়াতে সেখানে বড় বড় রেস্টুরেন্ট বরাদ্দ দেয়। শুরুতে ভ্যান বসানোর অনুমতি দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সেগুলো দোকান আকারে বরাদ্দ দিয়ে দেয়। বাহাদুর শাহ পার্কের বেলায় ডিএসসিসি সে পথে হাঁটছে বলেই মনে হচ্ছে। কথায় আছে—‘ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়।’ আয় বাড়ানোর পাগলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ডিএসসিসির পার্ক-গণপরিসর ধ্বংসের যে নজির দেখাচ্ছে, নগরবাসী ভয়ে জড়োসড়ো।

পার্কে দোকান বরাদ্দের বিষয়ে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। পার্ক কর্তৃপক্ষের একাধিক ব্যক্তি বলেন, ‘নিউজ করে কোনো লাভ হবে না। সিটি করপোরেশন ইজারা দিয়েছে।’ বলার ভঙ্গিটাই ছিল অন্য রকম। এমন ভিন্ন রকম বলার স্টাইলের জন্য যে উৎস থেকে সাহসের প্রয়োজন হয় সেটাও বের করতে খুব বেশি অনুসন্ধান করা লাগেনি। এলাকাবাসীর মুখেই শোনা গেল কারা কীভাবে ঐতিহাসিক পার্কে দোকান বরাদ্দ পেল। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। খবরের জন্য ডিএসসিসির কমেন্ট প্রয়োজন। সম্পত্তি কর্মকর্তাকে ফোন করলে তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তিনি সম্পত্তি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এভাবে করতে করতে কমেন্টস ছাড়াই ইজারাপত্রের কাগজের সূত্র দিয়ে প্রতিবেদন সাবমিট করতে বাধ্য হই।

শেষ করছি একটা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। সেদিন সন্ধ্যায় বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে বসতেই চোখ ধাঁধানো আলোয় চারপাশটা ‘অন্ধকার’ হয়ে এল। ফুড ভ্যান নামক ‘অ-ভ্যান’ কর্তৃপক্ষের লাইটিং থেকে আলো নয় যেন পার্ক ধ্বংসের বীভৎস কালো রেখা ঠিকরে পড়ছে। এরই ফাঁকে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম। নিয়মিত এ পার্কে হাঁটতে আসেন এমন ১০ জনের সঙ্গে কথা হয়। ১০ জনই জানিয়েছেন, ‘এ পার্কে এখন আর নির্বিঘ্নে হাঁটার সুযোগ নেই।’ একজন বলল, ‘যারা পার্কে দোকান বরাদ্দ দিয়েছে তারা কেউই পুরান ঢাকার বাসিন্দা নয়। নগর ভবনের চার দেয়ালে বসে আমাদের কষ্ট কীভাবে বুঝবে তারা?’ আরেকজন বলল, ‘পার্কটিকে যারা শেষ করছে তাদের কারো সন্তানই দেশে নেই। তারা কীভাবে বুঝবে আমাদের সন্তানদের জন্যও এক টুকরো আকাশ, খেলার মাঠ আর গাছের ছায়া প্রয়োজন!’ আরো অনেক অনেক মন্তব্য শুনে নিজের ভেতরই একটি আফসোসমাখা প্রশ্ন উঁকি দিল—জনভারে নুয়ে পড়া ঢাকার মানুষকে রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য দেখানোর স্বপ্ন দেখিয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক নষ্ট করার জন্য ঢাকাবাসী সংশ্লিষ্টদের ক্ষমা করবে কি? উত্তর এল, কখনই না।


আল ফাতাহ মামুন: সাংবাদিক