জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সরকার স্থানীয় কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা করছে। শুক্রবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনাজপুরের দীঘিপাড়া কয়লা খনি থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ করেছে জার্মানিভিত্তিক মিবরাগ কনসাল্টিং ইন্টারন্যাশনাল, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ফুগরো এবং অস্ট্রেলিয়ার রাঞ্জ নিকক মিনারকোর যৌথ কনসোর্টিয়াম। দেশে জ্বালানির চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান ক্রমে বাড়ছে। এ ব্যবধান ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জ্বালানির সংস্থান না হওয়ায় বাড়ছে আমদানিনির্ভরতাও। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা কয়লা খনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ, মানুষ, জলবায়ু, মাটি-পানি-বায়ু প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকার আলোচ্য জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের পাঁচটি কয়লা খনিতে ৭ হাজার ৮০৩ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। দেশে যে কয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু কিংবা নির্মাণাধীন রয়েছে, সেগুলো দীর্ঘ সময় মজুদকৃত কয়লা দিয়েই চালানো যাবে। অথচ এসব কয়লা উত্তোলনে দীর্ঘদিন সরকারের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া ছাড়া অন্য কোনো খনি থেকে কয়লা তোলেনি সরকার। ২০০৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। যদিও তা দিয়ে খনির পাশেই স্থাপিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। অবশিষ্ট এলাকা থেকে কয়লা উত্তোলনে সরকার এতদিন কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেয়নি। এর পেছনে অবশ্য কিছু কারণও রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আয়তনও ছোট। আবার কয়লা খনিগুলোর অধিকাংশের অবস্থান দুই ও তিন ফসলি জমিতে। ফলে কয়লা উত্তোলন করতে গিয়ে সরকারকে কৃষির ক্ষতি, বিপুল মানুষের স্থানান্তর ও পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। যখনই কয়লা উত্তোলন থেকে প্রাপ্ত উপযোগ এসব ক্ষতি ও ব্যয় থেকে বেশি হবে, তখনই কেবল কয়লা উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। বিশ্বের অনেক দেশের কয়লা খনিগুলো জনবসতি থেকে বেশ দূরে এবং সেখানে জমির কোনো অভাব নেই। ফলে কয়লা উত্তোলনে তাদের বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশে কয়লার মজুদের বড় অংশের অবস্থান ঘনবসতিপূর্ণ বা কৃষিজমিতে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, কয়েকটি কয়লা খনিতে প্রাথমিক জরিপ ও গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। সরকারকে এগুলো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কয়লা খনি উন্নয়নে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বাংলাদেশে একমাত্র বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। খনি উন্নয়নের আগে মানুষের স্থানান্তর, কর্মসংস্থান, পরিবেশ রক্ষা থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার কোনোটিই পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। বড়পুকুরিয়া এলাকায় কয়লার অ্যাশের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বিপুল এলাকা সাদা আস্তরণে ঢেকে থাকছে। এর প্রভাবে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের অসুখের প্রাদুর্ভাবও বাড়ছে। খনি এলাকার জমি থেকে যাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তাদের কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের যথাযথ ব্যবস্থাও করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় উন্নয়নের যে গল্প শোনানো হয়েছিল তাও বাস্তব রূপ লাভ করেনি। জমির উর্বরতাশক্তি হারিয়ে পতিত ভূমিতে পরিণত হচ্ছে অঞ্চলটি। মাটি দেবে যাওয়া থেকে শুরু করে বাড়িঘরে ফাটল দেখা যাচ্ছে। দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। খনি এলাকায় এর প্রভাবে কী ধরনের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এ পর্যন্ত জ্বালানি মন্ত্রণালয় কোনো গবেষণা করেনি। বর্তমানের ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির খনি উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণ করা হবে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এতে ওই অঞ্চলে কৃষিজমি, কৃষক-খেতমজুরের জীবন-জীবিকা, খাদ্য পরিস্থিতি ও দারিদ্র্যের ওপর কেমন প্রভাব প্রভাব পড়বে, তা আমলে নেয়ার কথা শোনা যায় না। তাছাড়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কয়লার জোগানও আসছে না বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে। চুরি ও দুর্নীতি তো রয়েছেই। ফলে আগামীতে যেসব কয়লা খানি উন্নয়ন করা হবে সেগুলোর পরিণতি যে একই হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
জ্বালানি নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনায় ‘খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিজমি সংরক্ষণ’ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা ও তাদের দারিদ্র্য পরিস্থিতি আমলে নিয়েই কয়লা উন্নয়নে মনোনিবেশ করা দরকার। বড়পুকুরিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের এসব বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারে না। কোনো এলাকার জমি দেবে যাওয়ার পর সরকার অ্যাডহক ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেয়, যা কোনো টেকসই সমাধান নয়। এক সময়ের ফসলি জমি এখন এক মিটার পানির নিচে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অবহেলায় সৃষ্ট খনি থেকে কয়লা উৎপাদনের মাশুল কৃষককে দিতে হচ্ছে। একমাত্র জীবিকার উৎস ফসলি জমি হারিয়ে ও ঘরবাড়ির ফাটলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক মানুষ দিশেহারা। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘খানাভিত্তিক আয়-ব্যয়-দারিদ্র্য’ বিষয়ক ২০১৬ সালের জাতীয় জরিপের ফলাফলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায়। এ জরিপে দারিদ্র্য নিরসন নিয়ে যেমন আশাব্যঞ্জক তথ্য আছে, তেমনি কয়লা অঞ্চলের কথা বিবেচনা করলে হতাশাজনক তথ্যও রয়েছে। বাংলাদেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমলেও কয়লা খনি অঞ্চলে এ সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। ওই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দিনাজপুর জেলায় (যেখানে বেশির ভাগ কয়লাখনি অবস্থিত) দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা শতকরা ৩৫ ভাগ বা তার বেশি। অথচ জাতীয় পর্যায়ে দরিদ্র ও হতদরিদ্রের শতকরা হার যথাক্রমে ২৪.৩ ও ১২.৯। সারা দেশে ২০০৬-২০১০ সময়কালে দারিদ্র্যের হার কমলেও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে (রংপুর-দিনাজপুর এলাকা) বেড়েছে। স্থানীয় কয়লা উন্নয়ন সম্পর্কে আরো সতর্কভাবে ভাবতে হবে। এমনকি ‘উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি’ ব্যবহার করার আগে খনিতে বিনিয়োগ, উৎপাদিত কয়লার পরিমাণ, কৃষিজমি, কৃষক-খেতমজুরের জীবন-জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাবসহ প্রতিটি বিষয়ই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, পরিবেশের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষ ও পরিবেশের লাভ-ক্ষতির নিরিখেই কয়লা তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি দেশ এক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন দ্রুত বর্ধনশীল। তার প্রচুর শক্তি ও জ্বালানি সম্পদ প্রয়োজন। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতেও রয়েছে দেশটি। ফলে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। পদক্ষেপ নেয়ার আগে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু কয়লানীতি। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হলো অতীতে উদ্যোগ নেয়ার পরও কোনো সরকারই কয়লা নীতি চূড়ান্ত করার কাজটা এগিয়ে নেয়নি। খসড়া নীতির ওপর পর্যালোচনা পর্ষদ করা হয়েছে কয়েকবার এবং পরিষদের দেয়া সুপারিশগুলোও বাস্তবায়ন করা হয়নি। বর্তমান সরকার কয়লা নীতি আবার পর্যালোচনা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। খসড়া নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারকে (আইআইএফসি)। ২০০৬ সালে সংস্থাটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে খসড়া কয়লা নীতি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে কয়লা নীতি চূড়ান্ত করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু গত দেড় দশকে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি। জ্বালানি সচিবকে প্রধান করে একটা পর্যালোচনা পর্ষদ এরই মধ্যে রয়েছে। বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে করা ‘কয়লা নীতি-২০০৮’ পর্যালোচনা করে নীতিটা চূড়ান্ত করবে এ পর্ষদ। এখনো পর্যন্ত কয়লা নীতির কোনো অগ্রগতি নেই, যা জ্বালানি খাত উন্নয়নে বড় প্রতিবন্ধক।
কয়লা উত্তোলন পুরোটাই একটি পরিবেশ দূষণকারী প্রক্রিয়া। উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লা উত্তোলন নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় যে এটা মাটি, পানি এবং পরিবেশ, বাতাস, শস্যের ভয়াবহ ক্ষতি করে। আবার গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে উত্তোলন করা হলেও সেটাও সেখানকার পরিবেশ, পানি, ফসলের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সেখান থেকে কয়লা উত্তোলনপূর্বক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে আরেক দফায় বায়ু ও পানিদূষণ সংঘটিত হয়। সেদিক থেকে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিভিত্তিক একটি দেশের কয়লা খনি উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত কঠিন। সরকার যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করুক না কেন, তাতে মানুষ ও প্রকৃতি-পরিবেশ যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।










