গত ছয় বছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া দিয়েছে সরকার। এসব কেন্দ্র পূর্ণসক্ষমতা দূরে থাক, ৩০ শতাংশও চালানো সম্ভব হয়নি। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে অর্থ দিয়েছে বিপিডিবি। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রয়োজন নেই এমন ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বর্তমানে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু আছে ১৬টি, যার মোট সক্ষমতা ১ হাজার ১০৯ মেগাওয়াট। দেরিতে নেয়া হলেও সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। এক্ষেত্রে সুপারিশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সক্রিয়তা দেখাতে হবে। অতীতে এমন অনেক ভালো সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখেনি যথাযথ পদরেখা না থাকায়। এবার যেন সেটি না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটির তদারকি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় ও ব্যয়সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র যথাসময়ে উৎপাদনে আসা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
একথা সত্য, বেসরকারি খাতকে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎ সংকটের স্বল্পমেয়াদি সমাধান করেছে। কথা ছিল, ব্যয়সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে এগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র সময়মতো উৎপাদনে না আসায় ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা কম থাকার পরও সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এ অর্থের অপচয় রোধ করতে হলে ব্যয়বহুল ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার বিকল্প নেই। আগামীতে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবে এবং এখন তা পুনর্নবায়ন না করাই হবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
চাহিদায় প্রবৃদ্ধি না থাকলেও নতুন নতুন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোয় দেশে এখন সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহূত থাকছে। আবার এর মধ্যে রয়েছে তেলের মতো উচ্চমূল্যের জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রও। ফলে এসব কেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে যেমন বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তেমনি চাহিদা না থাকায় উৎপাদন ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। ভর্তুকির কারণে আর্থিক বোঝা কমাতে এবং গ্রাহকের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান নীতিতে পরিবর্তন আনা আবশ্যক। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। আগামীতে কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক যেসব কেন্দ্র আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার সময় ক্যাপাসিটি চার্জ বাদ দেয়ার পাশাপাশি অদক্ষ ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দ্রুত বন্ধ করে দেয়া প্রয়োজন।
দেশে যে হারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সে হারে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে আগের ব্যবস্থা দিয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে সরবরাহে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। লোডশেডিং চলছেই। এটা শহরের চেয়ে গ্রামেই বেশি। অথচ বিদ্যুতের মোট গ্রাহকের ৭৫ শতাংশ আইবির অধীনেই। কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া ছাড়াও শিল্পের চরম ক্ষতি হচ্ছে। বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শিল্প মালিকরা নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতে প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। এতে গ্রিডের অনেক বিদ্যুৎ অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। এ নিয়ে এখন সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সরকার দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, শিল্পে এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে সংকট সামাল দেয়া সহজ হতো। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দেশব্যাপী দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলো শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। উৎপাদন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারার কারণে সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেকোনো পণ্যের উৎপাদন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বাজারজাত ব্যবস্থা করা জরুরি। তবুও দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেই শুধু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কিন্তু সরবরাহের দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি মোটেও।
আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে সরকারেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আপত্কালীন চাহিদা পূরণে সরকার তড়িঘড়ি করে জ্বালানিভিত্তিক ব্যয়বহুল রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলেও তা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা যা আশঙ্কা করেছিলেন তা-ই হয়েছে। তখন বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, বেসরকারি খাতের এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে বিদ্যমান সরকারি যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালে লোকসান কম হতো। দেরিতে হলেও সরকার নতুন করে তেলভিত্তিক এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিদ্যুতের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় শক্তির উৎপাদন সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ায় করার পরিকল্পনার বিকল্প নেই। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যুতের ক্রমাগত চাহিদা বাড়বে, এটা অবশ্যম্ভাবী। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষি খাতসহ শিল্প-কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এদিক বিবেচনা করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাশ্রয়ী ও বিকল্প চিন্তা করতে হবে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধানতম শক্তি প্রাকৃতিক গ্যাস। এই গ্যাসের মজুদও দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা বিদ্যুতের বিকল্প উপায়ের ওপর তাগিদ দিয়েছেন। দেশে এরই মধ্যে সোলার এনার্জি বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি ধীরে হলেও শুরু হয়েছে। এ খাতকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এগিয়ে নেয়া দরকার। এটি পরিবেশবান্ধবও। বায়ুচালিত উইন্ডমিলের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।
সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। গ্রামকে শহরে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ প্রতিশ্রুতি পূরণে অবশ্যম্ভাবীভাবেই বিদ্যুতের প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ছাড়া গ্রামকে শহরে পরিণত করা যাবে না। কাজেই সরকারকে অধিক পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সাশ্রয়ী ও বিকল্প পদ্ধতিতে কীভাবে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি কিংবা আমদানি করে খুব বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাশ্রয়ী প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি ও বিদেশী উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে। সর্বোপরি ২০ বছরের কম মেয়াদ রয়েছে এমন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র অনুমোদন থেকে বিরত থাকতে হবে। যেহেতু বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য রিটার্ন পাচ্ছে, তাই এ খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন।









