সারাদেশে যেন ধর্ষণের ‘মহোৎসব’ শুরু হয়েছে। মিডিয়ার কল্যাণে প্রতিদিনই দেশের কোন না কোন জায়গা থেকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের এক বা একাধিক খবর আসছে। কোন কোন ঘটনা এতটাই বীভৎস যে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ছে সর্বস্তরের জনতা। তা, হঠাৎ এমনভাবে এসব অপরাধ বেড়ে গেল কেন? আসলেই কি ঘটনা বেড়ে গেছে নাকি মিডিয়ায় বেশি আসছে? একটি সময় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া দু'টোই সংখ্যায় সীমিত ছিল। তাছাড়া, এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ অতি সহজে যে কোন ঘটনা মুহূর্তেই ভার্চুয়াল জগতে শেয়ার করতে পারছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে, অডিও-ভিজুয়াল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার। এখন মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন। ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণ কোন ব্যাপারই নয়। তবে, অনেকেই মনে করছেন, আসলেই এ ধরনের অপরাধ বেড়েছে।
হালের ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আপনি মোটা দাগে এগুলোকে দু'টি ভাগে ভাগ করতে পারেন। এক, কিছু বখাটে টাইপের কিশোর-তরুণ কিংবা পেশাদার অপরাধী রাস্তা-ঘাটে, গণপরিবহনে, এমনকি কখনোবা বাসাবাড়িতে হামলা চালিয়ে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গামী কিশোরী-তরুণী, কর্মজীবী নারী কিংবা গৃহবধূদের শ্লীলতাহানি করছে। অভিযোগ আছে, এ ধরনের অপরাধীদের অনেকেই সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া পেয়ে থাকে, ফলে অনেক সময় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করে। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলেও এরা কিছু দিন পর কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে নতুন উদ্যমে অপরাধকর্মে প্রবৃত্ত হয়। এছাড়া মামলা হলেও তা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে ভিকটিমের মধ্যে সবসময় একরকম নিরাপত্তাহীনতার বোধ কাজ করে। এটি তাকে মামলা-মোকদ্দমার পথে যেতে নিরুৎসাহিত করে।
কাজেই, এ ধরনের অপরাধ রুখতে হলে সবার আগে যেটা দরকার, তা হল সন্ত্রাসীরা যেন প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতা না পায় তা নিশ্চিত করা। মনে রাখা দরকার, দেশের মোট জনসংখ্যার খুবই ছোট্ট একটি অংশ এধরনের অপরাধ কর্মে লিপ্ত। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া না পেলে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হলে এসব অপরাধী লুকোনোর জন্য ইঁদুরের গর্তও খুঁজে পাবে না। এসব অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আইনজীবী সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সূযোগ আছে। সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনার মতো আইনজীবীরা যদি 'নিশ্চিত অপরাধী'দের পক্ষে মামলা না লড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এসব অপরাধী গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এই দ্বিবিধ কৌশল যুগপৎ প্রয়োগ করা গেলে অপরাধীদের মনোবল ভেঙে পড়বে। তারা বুঝতে পারবে, তাদের কেউ রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে না। এ অবস্থায় সমাজের বৃহত্তর শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠীও তাদের দমনে সাহসিকতার সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। অন্যথায়, যত কঠোর আইনই করা হোক না কেন, অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। অপরাধ বাড়বে, মামলার জটও বাড়বে। নিরীহ জনগণকে এ অমানিশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আকাশের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।
দ্বিতীয় প্রকারের ধর্ষণকান্ড প্রধানত উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের আবেগঘন মেলা-মেশার ফলশ্রুতিতে ঘটে। এ বয়েসী ছেলে মেয়েদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ কাজ করে। অনেকেই জুটি বাঁধে এবং একত্রে ঘুরে বেড়ায়। ক্ষেত্রবিশেষে এ সম্পর্ক এমন পর্যায়ে গড়ায়, যা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত মেয়েরা অনেক বেশি রক্ষণশীল। কাজেই বেশিরভাগ মেয়েই এ ধরনের সম্পর্কে জড়াতে চায় না। কিন্তু কিছু ছেলে এমনভাবে মেয়েদের (বিশেষ করে যদি সুদর্শনা হয়) বিরক্ত করে যে, তারা এক পর্যায়ে ‘হ্যাঁ’ বলতে বাধ্য হয়। কিছু ছেলে-পুলে আবার রাজনৈতিক বা অন্যবিধভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় রীতিমতো শক্তি প্রয়োগ করে। এসব সম্পর্ক অনেক সময় টেকে না। কোন একটা পক্ষ নিজ বিবেচনায় কিংবা গার্ডিয়ানের চাপে ছিটকে পড়ে বা পড়তে চায়। গোলটা বাঁধে তখনই। অন্য পক্ষ নিজেকে প্রতারিত বোধ করে, আবেগ দেখিয়ে কিংবা এখানে ওখানে নালিশ করে সম্পর্কটা মেরামত করার মরিয়া প্রয়াস চালায়। কখনও হয়তো সফলতা আসে, আবার অনেক সময় সহিংস পরিণতির মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে।
এদেশে সমাজ এখনও ছেলে মেয়েদের সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ের মেলামেশাকে স্বীকৃতি দেয়নি। নিকট ভবিষ্যতে এরকম সম্পর্কের স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে। তাহলে, আমাদের করণীয় কি হবে তা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখার সময় এসেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহুল প্রচলিত একটি মৌলনীতি হল, Prevention is better than cure. অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে শ্রেয়। ছেলেমেয়েরা মেলামেশার ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে যাবে, আর আমরা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখব, পরে কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে পাড়া মাথায় তুলব, থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারি করব -এটা কোন গ্রহণযোগ্য পলিসি হতে পারে না।
একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেলে পরে অনেকেই ছেলে-মেয়ের, বিশেষ করে মেয়ের, চরিত্র নিয়ে কটু-কাটব্য করে, ছি ছি করে তাদের দায় সারেন, বাবা-মায়ের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করেন। কেন? সমাজের কি কোন দায়িত্ব নেই। সবকিছু কি মা-বাবার গোচরে ঘটে? স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়ে কি করে বেড়াচ্ছে, তা সর্বক্ষণ মনিটর করা কি বাবা-মায়ের পক্ষে সম্ভব? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কি কেবল পাঠদান ও পরীক্ষা নেয়া? ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করা, তাদের আচার আচরণ মনিটর করা ও প্রয়োজনে তাদের শোধরানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়া কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? বাবা-মা ত ছেলে-মেয়েগূলোকে মানুষ করার জন্য শিক্ষকদের হাতেই তুলে দেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোন বখে যাওয়া ছেলে-মেয়েকে শোধরাতে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে গার্ডিয়ানদের কল করবে, তাদের কাছে ছেলেমেয়েদের সমস্যাগুলো তুলে ধরবে। ছেলেমেয়েদের এ ধরণের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। নচেৎ, নৈতিক অবক্ষয়ের এ ধারা চলতেই থাকবে।
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
লেখক: অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি










