গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। আগে সাধারণত ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো। এবার ঘোষণা করা হয়েছে এক বছরের লক্ষ্যকে সামনে রেখে।
আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতি। এ দুটো নীতির সমন্বয়ই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়। আমরা দেখছি, বেশ কয়েক বছর ধরে সরকার সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি বা বাজেট প্রণয়ন করে আসছে। এবারের বাজেটটাও সম্প্রসারণমুখী। সেক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় ও ঘাটতিও বাড়বে। ঘাটতি পূরণে সরকারকে স্বভাবতই ঋণ করতে হবে। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ করে থাকে। বাজেটের সঙ্গে মুদ্রানীতি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে, সেটিই বিবেচনার প্রথম বিষয়।
প্রথমেই আমাদের এর প্রেক্ষাপট খেয়াল রাখা দরকার। কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আমদানি বেড়েছে বেশ। রফতানি সন্তোষজনক। রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা স্থবির। ফলে লেনদেনের ভারসাম্যে চলতি হিসাবে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার খুব দ্রুত বাড়ছে। সব মিলিয়ে এবারের মুদ্রানীতির লক্ষ্য নির্ধারণ ও চলকগুলোর পুনর্বিন্যাস ছিল চ্যালেঞ্জিং।
এবারের মুদ্রানীতি এক বছরের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে মুদ্রানীতি এক বছরেরই হতে হবে। আর্থিক খাত দ্রুত পরিবর্তনশীল। এদিক থেকে এক বছরের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বরং ছয় মাসের মুদ্রানীতি হলে ভালো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রানীতিরও পরিবর্তন ও লক্ষ্যগুলো নতুন করে বিন্যান্সের প্রয়োজন হতে পারে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রতিটি দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরি পলিসি রিভিউ কমিটি আছে। তারা নিয়মিত আলোচনায় বসেন। কিছুদিন পরপর মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করেন এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সময়ে সময়ে সেটি পরিবর্তনও করা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুটো বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টাকার মান ধরে রাখা। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাজারে টাকার সরবরাহ হ্রাসের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য বাড়ানো হয়েছে নীতিহার হিসেবে বিবেচিত রেপোর সুদহার। দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে রেপোর সুদহার ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে আমদানি বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোয়। এজন্য নতুন নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। বিলাসপণ্য, বিদেশী ফল ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির লাগাম টানতে এলসি মার্জিন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে মুদ্রানীতিতে। কাজেই মুদ্রানীতি কিছুটা সংকোচনমূলক।
এদিকে ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৪ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৩৬ শতাংশ। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফীতি রোধ করতে হলে সরবরাহের দিকে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে। এখন মূল্যস্ফীতির সমস্যাটা সরবরাহভিত্তিক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়েছে। ফলে জ্বালানি থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। দেশে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ছে। এ সমস্যা শুধু যে চাহিদা বা জোগানের নয়, এখানে বাজার কারসাজিও হচ্ছে। সেই বিবেচনায় বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে রাখা ঠিক হয়নি। এতে বরং উল্টো প্রভাব পড়বে। ব্যক্তি খাতের ঋণ কমালে কর্মসংস্থানে তার বিরূপ অভিঘাত পড়বে। কারণ ব্যক্তি খাতই কর্মসংস্থান তৈরি করে বেশি। ব্যক্তি খাতে ঋণ কমলে মানুষের আয়ও কমবে। ফলে উৎপাদনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বা প্রকৃত খাতের কর্মকাণ্ড কমে যাবে। হয়তো অংকের হিসাবে বিভিন্ন মূল্য সংযোজন হবে, তবে সেটি অর্থনীতিতে কোনো প্রণোদনা তৈরি করবে না। বড় বিষয় হলো এটি মূল্যস্ফীতি রোধে কোনো ভূমিকাই রাখবে না। সেবা রফতানি হয়তো বাড়বে, পরিবহন খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এগুলো টাকার অংকে বাড়বে, অর্থাৎ নমিনাল জিডিপি বাড়বে, কিন্তু সেটা মূল্যস্ফীতি রোধ করতে পারবে না। মানুষের জীবনমান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, আবশ্যকীয় সেবা আইটেমগুলোর সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মুদ্রানীতির মূল ভঙ্গিটা যেটা ধরা হয়েছে সেটা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অর্থনীতি যদি স্বাভাবিকভাবে চলে তাহলে ভালো বিষয়গুলোকে উৎসাহিত করা দরকার। বাধা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ওপরে হলেও আমানতের সুদের হার কেন ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে রয়ে যাবে? বিনিময় হার এখনো স্থিতিশীল হয়নি। এক্ষেত্রে আবারো বলছি, সুদহার ও মুদ্রার বিনিময় হার বেঁধে দেয়া বা স্থির রাখা ঠিক হবে না। ঋণের সুদের হার কেন ৯ শতাংশ হবে। সেটি বরং ১০, ১১, ১২ শতাংশ করা হোক। যারা খুব উৎপাদনশীল তারা ঋণ নেবে। আর যারা একেবারে অদক্ষ তারা ঋণ নেবে না বা নিতে চাইবে না। অথচ একটা কৃত্রিম সুদের হার রেখে দেয়া হয়েছে। সেটা দিয়ে সংকট মোকাবেলা করা যাবে না।
এবারের মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, নিট বহিঃসম্পদ কমবে। এটা ঠিক আছে। কারণ চূড়ান্তভাবে বহিঃসম্পদের ওপর চাপ পড়ছেই। বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়বে। অভ্যন্তরীণ সম্পদটা কীভাবে বাড়বে, তার দিকনির্দেশনা মুদ্রানীতিতে নেই। অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ কিছুটা বাড়বে। সরকারি-বেসরকারি ঋণ ধরলে নিঃসন্দেহে এটি বাড়বে। আরেকটা বিষয় হলো, এবার ব্যাপক মুদ্রা (এম-২) সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সিলিংয়ের সমষ্টির তুলনায় কম। রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধিও ধরা হয়েছে কম। এটা যেহেতু হাই পাওয়ার্ড মানি, চূড়ান্তভাবে এতে ব্যাপক মুদ্রা বাড়বে। এটা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে। মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো প্রথমত অর্জনযোগ্য নয় আর দ্বিতীয়ত খুব কাজের নয়। এখন উচিত ছিল কভিডের অভিঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া। ঘুরে দাঁড়ানোর মূল শক্তি হলো এসএমই। বড় শিল্পগুলো আছে। সেগুলোয় রফতানি বাড়ছে। কিন্তু প্রধান বিষয় হলো কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর উন্নয়ন। সেগুলোই দেশের প্রকৃত খাত। এখানে কর্মসংস্থান বেশি হয়। এসব দিকে বাড়তি দৃষ্টি দেয়া দরকার ছিল। মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন নেই।
বিশ্বের সবাই বলছে, শেয়ারবাজারে শেয়ারমূল্য বাড়ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সম্পদের মূল্য বাড়ছে, বন্ডে সম্পদ বাড়ছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সম্পদ মূল্য বাড়ছে—সেটা কাজের কথা নয়। এগুলো মানুষের জীবনযাত্রার জন্য খুব বেশি সহায়ক নয়। তারা টেকনোলজি ডেভেলপ করছে, সেখানে অনেক ভ্যালু অ্যাডিশন হচ্ছে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের জীবনের দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না। খাদ্য সরবরাহ কিংবা নন-ফুড সার্ভিস, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষায় তেমন উন্নতি হচ্ছে না। তার মানে অন্য দেশ যে রকম মুদ্রানীতি নিয়েছে বাংলাদেশের মুদ্রানীতিতে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। এটা মোটেই ঠিক হয়নি। বিদেশের উদাহরণ দেয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ তাদের পলিসি রেট বাড়িয়েছে। অন্যান্য দেশও বাড়িয়েছে। কারণ তাদের মূল্যস্ফীতি অনেক। উপরন্তু সেখানে পলিসি রেটের সংবেদনশীলতা অনেক বেশি। দেশগুলোয় পলিসি রেট অল্প একটু বাড়ালেই ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলে, বাংলাদেশে তেমন হয় না। এখানে ৪০-৫০ শতাংশ লোক এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে। বেশির ভাগই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা ব্যবহার করে। এটা পলিসি রেট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রিভার্স রেপো রেট, ব্যাংক রেট, রিফাইন্যান্সিং রেট প্রভৃতি বিষয় আমাদের দেশে খুব বেশি কার্যকর প্রভাব রাখে না।
সরকারের ব্যয়ের একটা বড় অংশ আসে ঋণ থেকে। বন্ডে ইল্ড রেট ধরা হয়েছে ৭-৮ শতাংশ। এতে অনেকেই বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। এত ইল্ড রেট পেলে ব্যাংকাররা ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ দিতে উৎসাহী হবেন না। আরেকটি খাত হলো সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজ বন্ড। সেগুলোর সঙ্গে পলিসি রেটের কী সম্পর্ক আছে সেটি বোধগম্য নয়। উন্নত দেশগুলোর জন্য পলিসি রেটগুলো আপেক্ষিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্যও ততটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপটে শুধু পলিসি রেটকে মুদ্রানীতির একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
আমাদের একটা বিষয় লক্ষ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা শুধু মুদ্রানীতি কিংবা টাকার মূল্য নির্ধারণ করা নয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা হলো ব্যাংকার্স ব্যাংক। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে সরকারেরও ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই ভূমিকার প্রকাশ ঘটেনি। ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে তুলনা করলে তারা এটা করবে না, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও এটা করবে না। ওইসব দেশে ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি আছে যারা এসব কাজ করে থাকে। এ অর্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা আরো ব্যাপক। শুধু আর্থিক টার্গেট নির্ধারণ নয়, বহুমাত্রিক মুদ্রানীতি নিতে হবে। শুধু পলিসি রেট নয়, ব্যাংকের রেগুলেশন, সুপারভিশন, ডিফল্ট লোন, প্রভিশনিং পলিসি এগুলোর ওপর জোর দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কারণ গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ে আস্থাভাজন ও পরীক্ষিত ঋণগ্রহীতারা বড় ঋণ নিতে পারে, জামানত দিতে পারে, সম্পর্ক যাদের সঙ্গে ভালো ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে চাইবে। ছোটদের কাছে কেন যাবে তারা? দেখা গেছে, সংকোচনমূলক নীতি হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাত বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হয়। আমাদের অর্থনীতির বিরাট অংশ অনানুষ্ঠানিক। অতএব বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত তাদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ হলো অগতানুগতিক টার্গেট সেটিং এবং গতানুগতিক ইনস্ট্রুমেন্টের বাইরে যাওয়া। এখানে দরকার কাঠামোগত সংস্কার। কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। এটা কি ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন? তার মানে কি ব্যাংকগুলো ভালো করছে? ঠিকমতো প্রভিশনিং করা হলে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা থাকে না। দ্বিতীয়ত, বাজার নিয়ন্ত্রণ। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করে, বাজারে যারা পণ্যের জোগান দেয় মূল্যস্ফীতি তারা আরো বাড়িয়ে দেয়। বাজার কারসাজি করছে কারা? ব্যবসায়ীরা। যতই মুদ্রানীতি করা হোক, পলিসি রেট নিয়ন্ত্রণ করা হোক কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি রোধ হবে না। বাজার নিয়ন্ত্রণের সময় এসেছে। সরকারকেই বড় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বের অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, বড় করপোরেশনকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনোক্রমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
এখন ডলারের বাজারে ম্যানিপুলেশন হচ্ছে। হরেদরে একটা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির হার আমাদের প্রধান ট্রেডিং পার্টনার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা ও বিশ্লেষণ করে ঠিক করা উচিত। মুদ্রানীতিতে বলা উচিত ছিল, আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখেছি। সে ধরনের কিছু বলা হয়নি। সরকার ব্যাংকঋণ করে চলেছে। ভবিষ্যতে তার প্রভাবটা কী পড়বে, সেটা ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না, যা কাম্য নয়।
আরেকটা সংগতিপূর্ণ বিষয় হলো ইডিএফ ফান্ড। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে যে টাকা দিচ্ছে সেটি কি ফেরত এসেছে? সেটি ফেরত আসছে না। এ পরিমাণ অর্থ রিজার্ভ থেকে বাদ দিলে প্রকৃত রিজার্ভ আরো কমে যাবে। আইএমএফ ইঙ্গিত দিয়েছে, আমাদের রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলার নয়। এখানে মুদ্রানীতির একটা অবস্থান থাকা দরকার ছিল, রফতানি বিলের প্রত্যাবর্তন সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, ইডিএফ ফান্ডের টাকা ফেরত আসছে কিনা ইত্যাদি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করা উচিত ছিল। অর্থ ফেরত না এলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তারও উল্লেখ নেই মুদ্রানীতিতে।
এবারের মুদ্রানীতিতে কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কিছু তথ্য দেয়া হয়েছে। সার্বিক পর্যালোচনায়, এ নীতি বড় ব্যবসাবান্ধব, ছোট ব্যবসাবান্ধব নয়। এমনকি মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও খুব একটা সহায়ক হবে না। এখন দরকার প্রকৃত উৎপাদন বাড়ানো। খাদ্য, ওষুধ, অত্যাবশ্যকীয় সেবা খাতের উৎপাদন ও অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করা। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ রকম কৌশল ও দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত।
ড. সালেহ্উদ্দিন আহমেদ: সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়










