পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক ২০১৪ সালে দেশে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৬২৬টি, ২০১৫ সালে ঘটে ৭৫২টি, ২০১৬ সালে ৬৫৯টি, ২০১৭ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৮১৮টি, ২০১৮ সালে এরূপ ঘটনার সংখ্যা ছিল ৭৩২টি, ২০১৯ সালে সেটি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৪১৩টি। সংখ্যাত্বক এই তথ্যই প্রমাণ দেয় দেশে ধর্ষণের ঘটনা কতটা ব্যাপকভাবে বেড়ে চলেছে। পাঁচ বছরের শিশু থেকে ৭২ বছরের বৃদ্ধাও শিকার হয়েছেন ধর্ষণের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন ধর্ষণের এই ক্রমবর্ধমান ঘটনা। এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই আসতে পারে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি না হওয়াই ধর্ষণের মত ঘটনা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। 

একথা খুবই সত্য যে দেশে যতগুলি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা-ছোয়ার বাইরে থাকে। একদিকে ধর্ষকের উপযুক্ত শাস্তি হয় না অপরদিকে ভুক্তভোগী ধর্ষণের শিকার হয়ে যে ক্ষতির সম্মুখীন হয় তার বিচার চাইতে গিয়ে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রথমত, ধর্ষণের শিকার হয়ে কেউ বিচারের আশ্রয় নিতে গেলেই আসামিপক্ষ থেকে আসে নানান ধরনের হুমকি, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের শিকার নারী ধর্ষিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সমাজ তাকে সহজভাবে গ্রহণ করে না। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর থেকে তার বাকী জীবন চলে এক দুর্বিসহ অবস্থার মধ্যদিয়ে। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদি ধর্ষণের খরবটি চেপে রেখে কোনভাবে বিয়েটা সম্পূর্ণ হয়েও যায় বিবাহিত জীবনে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তার জীবনে নেমে আসে এক অমানিশার অন্ধকার। 

তৃতীয়ত, বিচারের আশ্রয় যদি নিয়েও থাকে সেই বিচার কার্য যে প্রক্রিয়ায় চলে তা ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করলেও ধর্ষিতাকে সম্মুখীন করে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির। বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে ধর্ষক ও ধর্ষিতার মেডিকেল পরীক্ষা, ডিএনএ টেস্ট, থানায় রির্পোটিং এসব যেন ধর্ষণের শিকার নারীর জীবন ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। বিচার প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত আইনের অনত্যম একটি প্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট হচ্ছে- আইন প্রমাণসাপেক্ষ। ধর্ষণের শিকার নারীকে বিভিন্ন সাক্ষী, আলামত, যুক্তি, রিপোর্ট, কাগজ-পত্র ইত্যাদি দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বিচার কার্যে বিশেষ করে ধর্ষণের অপরাধে বিচার কার্যে প্রয়োগকৃত একটি আইন Evidence Act এর ধারা ১৫৫ এর উপধারা ৪ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। উক্ত ধারার বিধান হচ্ছে ‘when a man is prosecuted for rape or an attempt to ravish, it may be shown that the prosecutrix was of generally immoral character.”  ইভিডেন্স এ্যাক্ট-এর এই ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবেদন তৈরিকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত নারীকে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ সৃষ্টি হয় যেন তার চারিত্রিক দোষেই এই অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে। এ সকল অবস্থার কারণে ধর্ষণের শিকার নারী বিচার পেতে  অনাগ্রহি হয় যার ফলশ্রুতিতে অপরাধী শাস্তির বাইরে থেকে যায়।

ধর্ষণের এই ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একদিকে যেমন রয়েছে উপযুক্ত শাস্তির অভাব তেমনি অপরদিকে রয়েছে দেশে সংস্কৃতিক ভাবধারর পরিবর্তন। সত্তর, আশি এমনকি নব্বই দশকের দিকে ফিরে তাকালে লক্ষ্য করা যাবে দেশের গ্রাম, গঞ্জ বা শহরে উঠতি বয়সের যুবকদের জীবন কাটত লেখা-পড়া, আড্ডা, অবসর সময়ে নাটক, থিয়েটার, খেলাধুলা ইত্যাদির মাধ্যমে। পরিবারের কাছে বিনোদনের অন্যতম একটি মাধ্যম ছিল চলচ্চিত্র বা সিনেমা। কালের বিবর্তনে বন্ধুদের সেই আড্ডা, গ্রামে, পাড়া- মহল্লায় নিজ উদ্যোগে নাটক, থিয়েটারের আয়োজন, খেলাধুলা, বনভোজন সবই যেন বিলুপ্তির পথে। পরিবারের সকল সদস্য এমনকি পাড়া-মহল্লার অনেকে মিলে এক সময় সামাজিক, ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল সিনেমা উপভোগ করত, যে সিনেমা উপভোগ করেই পরিবারের মধ্যে, পাড়া-মহল্লার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে গড়ে উঠত আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, বন্ধুসুলভ আচরণ সে চলচ্চিত্র বা সিনেমা আজ প্রায় অবলুপ্ত। বর্তমানে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী সবার কাছেই বিনোদন বা অবসর সময় কাটানোর একটিই মাধ্যম- সেটি হচ্ছে হাতের মুঠোয় একটি মোবাইল ফোন। দেশের অর্থনৈতিক সহ সকল প্রকার উন্নয়নের লক্ষ্যে তথ্য-প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ইত্যাদির ব্যবহার ব্যাপক ভাবে বেড়ে চলেছে। ইন্টারনেটের এই পর্যাপ্ততার সুবাদেই একদিকে যেমন পাচ্ছে বিশ্বের যে কোন প্রান্তের যেকোন প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত তেমনি পেয়ে যাচ্ছে অশালিন চিত্র, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি। এ সকল অশালিন চিত্র, অডিও, ভিডিও পর্যবেক্ষণ করে উত্তেজিত হচ্ছে যুবক ছেলেদের দেহ-মন যা ধর্ষণের মত অপকর্ম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করছে। 

ধর্ষণের মত এই অপকর্মকে রোধকল্পে অতিসম্প্রতি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্তুদন্ড রেখে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ দেশে ধর্ষণের মত ঘটনা কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে অবশ্যই আশা করা যায়। তবে মৃত্যুদণ্ডের এই বিধানের অনেক অপব্যবহার হওয়া সম্ভব সেটি যেন না হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। বিচার প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করা এবং ধর্ষণের শিকার নারীর আত্ম-সম্মানে কোন আঘাত না আসে সেটিকে লক্ষ্য রেখে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে অতি সম্প্রতিকালের ধর্ষণের মামলায় দেওয়া রায়ে বিজ্ঞ উচ্চ আদালত শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা নয় সাক্ষ্যের ওপর জোর দিয়েছেন যা ধর্ষিতাকে অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে বলে আশা করা যায়। ইন্টারনেটের সুযোগে যুবক ছেলেরা যেন বিপথগামী না হতে পারে সেদিকে পরিবারের গার্জিয়ানদের দৃষ্টি রাখতে হবে। সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ধর্ষণ রোধে আইনের পাশাপাশি জনগনকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে অশালীন শব্দ বা দৃশ্য অবলোকনে ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করা যায় কিনা সে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।

মো. শাহাদাৎ হোসেন, এফসিএ
সাবেক সহ সভাপতি- আইসিএবি
সিনিয়র পার্টনার-ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স
sha.hossain@gmail.com