পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন দেখতে হয় সড়কে মৃত্যুর মিছিল। সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ভয়াবহ মাত্রায়। সড়ক এতটাই বিপজ্জনক যে নিরাপদে ঘরে ফেরাটাই এখন ভাগ্যে। পরিসংখ্যান থেকে এর একটা চিত্র বুঝতে পারি। ওয়ার্ল্ড হেলথ র্যাংকিং অনুসারে, সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। সরকারি হিসাবে গত এক  বছরে সড়কপথে মৃত্যু বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর দেশে গড়ে প্রতিদিন ট্রাফিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৮ জন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার তিন গুণ বেশি।

পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় সড়ক নিরাপত্তার জায়গায় বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে আছে। সড়ক দুর্ঘটনা একটা রীতি হয়ে গেছে। সড়ক মানে এখন মৃত্যু, মরণফাঁদ আর অনিরাপদ যাত্রা। এ যাত্রায় ধনী-গরিব-নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ কারো রেহাই মিলছে না। সড়কের এই অব্যাহত নৈরাজ্য থামছে না বলেই সমাজের মানুষ এখন আরো বেশি মাত্রায় মানসিক ট্রমার মধ্যে জীবন যাপন করছে, নিরাপত্তার প্রশ্ন এখন দারিদ্র্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। সবার মনে সড়কপথ নিয়ে যে ট্রমা কাজ করছে তার কারণ নিচের কিছু ঘটনা থেকে বোঝা যায়।     

সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনা হলো, ৯ ফেব্রুয়ারি বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় নিমেষেই পিকআপ ভ্যানে চাপা পড়ে মারা যান কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হাসিনাপাড়া গ্রামের একই পরিবারের পাঁচ ভাই। সংবাদমাধ্যমে জানতে পারলাম, তাদের একমাত্র বেঁচে যাওয়া ভাইটিও মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তে ২২ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তাদের মা মানু রানী শোকে বাকরুদ্ধ, যে শোকের ভাষা ও মাত্রা বুঝতে আমরা অক্ষম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঁচ বিধবা স্ত্রীর শোক, অনিশ্চিত সাদা কাপড়ের জীবন। সড়কের অবস্থা কতটা ভয়ংকর হলে এ পরিণতি হতে পারে? এর পরেই ঘটে আরেকটি ঘটনা। চট্টগ্রামে ফটিকছড়ি সড়কে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেতে ড্রাইভার দ্রুততার সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করলে মুহূর্তেই দুই স্কুলগামী ছাত্রী চাপা পড়ে মারা যায়। এর পরে ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ইটভাটার মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের চাপায় মারা যায় ছোট্ট শিশু রাসেল। জানা যায়, ড্রাইভার রাসেলের বাবার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। এ ঘটনাগুলোর প্রত্যেকটিতে ভিন্ন কারণ রয়েছে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, পুলিশের হাত থেকে রক্ষার তাগিদ, অপেশাদারকে ড্রাইভিংয়ের সুযোগ দেয়া, মাদকাসক্ত হয়ে ড্রাইভিং, ক্ষোভ মেটাতে পরিকল্পিত হত্যা এবং লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর কারণ রয়েছে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা বা সড়কে হত্যায়। এসব কারণের সবকিছুই বাহ্যিক অথবা মূল কারণের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যদিও অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) জানিয়েছে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্যই চালকরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে মাঠে নামে কিন্তু চালকদের দৌরাত্ম্য আগের মতোই রয়ে গেছে। চালকদের এ দৌরাত্ম্যের লাগাম কেন  টেনে  ধরা যাচ্ছে না, সেটাই জানা দরকার।

মূলত পরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত বিপর্যয়ের কারণে ড্রাইভিং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। পরিবহন সেক্টরে যে মাত্রায় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চলছে, তা থেকে উল্লিখিত সমস্যাবলি সৃষ্টি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে পাশ কাটিয়ে ড্রাইভার নিয়োগ দেয়া হয়। মালিকশ্রেণীর অতিমুনাফার স্বার্থেই ড্রাইভার স্বল্প বেতনে নিয়োগ দেয়া হয় অনেকটা ইনফরমাল পদ্ধতিতে। এদিকে ঘুষ লেনদেনের অলিখিত নীরব প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ গাড়ির লাইসেন্সকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। লাইসেন্সের এ জটিলতা আছে বলেই পুলিশের সঙ্গে ড্রাইভারদের অযাচিত লেনদেন হয়, ফলে ড্রাইভার গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বেপরোয়া ও উন্মত্ত হয়ে গাড়ি চালাতে ভয় পান না। ঘুষ লেনদেনের এ প্রথা বন্ধ না করলে সড়কপথে হত্যা বাড়তেই থাকবে।   

ঘুষ লেনদেন বন্ধ বা কমানো হলেই আমূল পরিবর্তন আসবে তাও বলা যাবে না। সড়কপথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দরকার পরিবহন সেক্টরের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আইনি সংস্কার, আইন প্রয়োগের বিধিবদ্ধ নীতিমালা ও জবাবদিহিতার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। পরিবহন সেক্টরকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দক্ষ ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ড্রাইভার নিয়োগ দেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। ড্রাইভারের প্রাতিষ্ঠানিক পোশাক ও আইডি কার্ড থাকবে। ড্রাইভিংকে ফরমাল পেশার মূল্য দিতে হবে ফরমাল নিয়োগদানের মধ্য দিয়ে। ড্রাইভারদের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাদের চাকরি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ও শ্রমঘণ্টার মধ্যে সীমিত করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ আধুনিক ও সার্টিফিকেটভিত্তিক করতে হবে। পরিবহন সেক্টরের ব্যবস্থাপনা মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় করতে হবে। পরিবহন সেক্টরকে কোম্পানিতে পরিণত করে পরিবহন মালিক ধারণাকে পাল্টে দিতে হবে। কোম্পানিতে রূপান্তর করে আইনি বিধিমালা নবায়ন করতে হবে।  

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উন্নীত করতে সড়ক আইনের বিধিমালায় আরো সংস্কার ও আধুনিকীকরণ জরুরি। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের  ৬ (২, ক) ধারায় বলা আছে, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রার্থীর ন্যূনতম বয়স যথাক্রমে ১২ ও ২১ বছর। আবার ৬ (২, খ)-তে বলা আছে ড্রাইভারকে অন্তত অষ্টম শ্রেণী পাস হতে হবে। নতুন আইনে মহাসড়কের পাবলিক গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পেশাদারিত্বকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম এইচএসসি পরীক্ষায় পাস রাখার পাশাপাশি বয়স ও অভিজ্ঞতার পরিসর বাড়াতে হবে। আইনে উল্লেখ থাকতে হবে হেলপার ড্রাইভিংয়ে যুক্ত হলে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুর্ঘটনার দায়ে শাস্তির বিষয়টি স্পষ্ট করা। আইনের ১০৫ ধারায় বলা হয়, ড্রাইভারের বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে কেউ আহত বা নিহত হলে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। আহত বা প্রাণহানিকে এক করে দেখা, এমনকি বেপরোয়া বা অবহেলাকে এক করে দেখা সমুচিত নয়। এক্ষেত্রে কোন কারণে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর কোন কারণে সাময়িক কারাদণ্ড তার স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা অত্যাবশ্যক।

আইনের ৫২ ও ৫৩ ধারায় লেখা আছে, দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে উত্তরাধিকারীকে আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ক্ষতিপূরণের মাত্রা ও পরিমাণ সুনির্দিষ্ট না থাকায় পরিবহন মালিক দুর্ঘটনার বিষয়কে হালকা করে নেন। এক্ষেত্রে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ আদায়ের নীতিমালা নবায়ন ও বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। তাছাড়া মাদকাসক্ত ড্রাইভারকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পরিবহনের গতি মানা হচ্ছে কিনা তা অফিশিয়াল মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। গতিবিধি লঙ্ঘন করলেই পরিবহনের কোড নাম্বার চিহ্নিত করে জরিমানা আদায় করতে হবে। সেই জরিমানা আদায় অফিশিয়ালি করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করলে সড়কপথে পুলিশের কার্যক্রম কমে যাবে, হয়রানিও কমে যাবে।     

পরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করে বার্ষিক প্রতিবেদন করতে হবে। মালিকশ্রেণীর প্রভাব কমাতে পরিবহন কোম্পানির ব্যবস্থাপকদের ক্ষমতা বাড়াতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাপকদের আইনি কোডের আওতায় কাজ করতে বাধ্য করতে হবে। পরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যেন যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, আর কোম্পানির স্বার্থও রক্ষিত হয়। আমরা চাই অতিদ্রুত আমূল সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।  

 

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা